মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ১০:১১

পাহাড়ের আহাজারি কে থামাবে?

Published : 2017-06-14 22:22:00, Updated : 2017-06-15 09:53:32
পাভেল পার্থ: বাংলাদেশে নিদারুণভাবে একটির পর একটি পাহাড় বিপর্যয় হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি আজও। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট বাণিজ্য, করপোরেট কৃষি ও তথাকথিত উন্নয়নের নামে একটির পর একটি পাহাড় প্রশ্নহীনভাবে খুন করা হয়। অথচ দেশে মুমূর্ষু পাহাড়ের আহাজারি থামানোর জন্য কোনো কার্যকর আইন নেই, নেই পাহাড়ের প্রতি একটুকরো দরদ। ১৫ জুন ২০১০ ভোরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হয়। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার টুইন্যা পাহাড় ধসে পাঁচজন মারা যায়। ২০০৮ সালের ৬ জুলাইও এখানে পাহাড় ধসে চারজন মারা যায়। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণকাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছে তখন। এবারও পাহাড় ধসে বন্ধ রাস্তা ঠিক করতে গিয়ে সেনাসদস্যের মৃত্যু ঘটেছে। তার মানে বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের আরও বেশি পাহাড় ও পাহাড়ের বিপদ সম্পর্কে সজাগ থাকা জরুরি। পাহাড় বাস্তুসংস্থান ও প্রতিবেশ বিষয়ে আরও জানাশোনা জরুরি। ১১ জুন ২০০৭ অবিরাম বর্ষণে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকার লেবুবাগান, কুসুমবাগ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহত হয় ১৩০-এরও বেশি পরিবেশ-উদ্বাস্তু মানুষ। যাদের অধিকাংশই নদীভাঙনসহ নানান দুর্যোগে উদ্বাস্তু হয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বসতি গেড়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসের পরও পাহাড় রক্ষায় কোনো কার্যকরী উদ্যোগ তৈরি না হওয়াতে এবারও পাহাড়ের পর পাহাড়ের কঙ্কাল ধসে পড়েছে। কোনো পাহাড়ের ঢাল ৪৫ ডিগ্রি বেশি হলেই তাতে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোথাও কোথাও পাহাড় কেটে ৯০ ডিগ্রি করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ি এলাকায় যে ভূমিধস হয়েছিল তার বিস্তার এত ভয়াবহ ছিল না।
২.
আবারও পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে পাহাড়ে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড়ি বিপর্যয় না ঘটলেও ২০০৭ সালে নিদারুণ পাহাড় ধসে নিহত হয় ১২৭ জন। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড় ধসে নিহত হয় ৬ জন, ২০১৪ সালে ১, ২০১৩ সালে ২, ২০১২ সালে ২৮, ২০১১ সালে ১৭, ২০১০ ও ২০০৯ সালে ৩ এবং ২০০৮ সালে ১৪ জন। এর আগে কখনই পাহাড় ধসে কোনো নৃগোষ্ঠীর জীবন ও বসত নিশ্চিহ্ন হতে দেখা যায়নি। কিন্তু ২০১৭ সালের জুনের পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে চাকমা ও বান্দরবানে খিয়াং নৃগোষ্ঠীর মৃত্যু ঘটেছে। ২০১৭ সালের ১২ জুন মধ্যরাত থেকে ১৩ জুন ভোরে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রায় ১৩৭ জন মানুষ নিহত হয়েছে। বেসামরিক জনগণের পাশাপাশি কয়েকজন সেনাসদস্যেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছে। ২০০৬ সাল থেকে পাহাড়ধস এবং এর প্রতিকার নিয়ে লিখেছি নানা সময়। প্রশ্ন তুলেছি নানাভাবে। কিন্তু রাষ্ট্র এসব লেখা ও প্রস্তাব গুরুত্ব দেয়নি। তাই পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিল বর্ষাকালে ঘটেই চলেছে। পাহাড়ধসের অন্যতম কারণ পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবনের বসবাস। ঐতিহাসিকভাবে যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাহাড়ের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা পাহাড়কে দেখে একটা জায়গা হিসেবে। যেখানে বসবাস করা যায়, চাষবাস করা যায়, পোল্ট্রি ফার্ম করা যায়, মাদ্রাসা ঘর তোলা যায়, হোটেল-রেস্টুরেন্ট করা যায় বা একটি নিরাপত্তা চৌকি বসানো যায়। পাহাড় যাদের কাছে জীবন্ত সত্তা নয়, তারাই বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় কেটেছে, সর্বনাশ করেছে। আর এ কারণেই বর্ষাকালের অবিরত বর্ষণে পাহাড় ধসে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের এসব পাহাড়শ্রেণির মাটির গঠন ও বুননের বৈশিষ্ট্য এমনই যে এসব পাহাড় এলোপাতাড়ি কাটা হলে এবং পাহাড়ের উপরিভাগের বৃক্ষ আচ্ছাদন সরে গেলে বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে এসব পাহাড় ধসে পড়বে। এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটছে না, উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাহাড়-টিলা ধসে বাংলাদেশের ওপর পড়ছে। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই পশ্চিম খাসি এলাকার কালাপাহাড় ধসে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্তরক্ষী ক্যাম্পসহ আশেপাশের ধানজমিন ও বসতবাড়ি সব পাহাড়ি বালির নিচে চাপা পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়েও একই ঘটনা ঘটছে, এলোপাতাড়ি পাহাড় কেটে কয়লা, চুনাপাথর তোলা হচ্ছে। ফাঁপা পাহাড় বৃষ্টির পানিতে ধসে পড়ছে ভাটির বাংলাদেশের হাওরে। এ বছর হাওরের তলিয়ে যাওয়ার এটিই বড় কারণ ছিল।
৩.
চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের সবক’টি পাহাড়ি এলাকা কাটা হয়েছে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে; যারা কখনই পাহাড়ের আদিবাসী নন, পাহাড় যাদের কাছে কেবল ব্যবসার বস্তু, জীবনযাপনের কোনো অংশ নয়। দেশে ইমারত নির্মাণ আইনে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা আছে। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় বিপর্যয়ের পর পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ১৭ জুন ২০০৭-এর প্রথম দিনের অভিযানে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ১৯টি মামলা হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) জানায়, ১৯৯৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত পাহাড় কাটা সংক্রান্ত ২৮টি মামলার ক্ষেত্রে ১৮টিতে সাজা হয়। কিন্তু তারপর পাহাড়কে জীবন দিয়ে আগলে রাখার কোনো পাহাড়বান্ধব প্রক্রিয়া এখনও রাষ্ট্র শুরু করেনি। বরং ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনের চাইনো হাইড্রো করপোরেশনের কাছ থেকে পাহাড় কাটার প্রস্তাব পাওয়ায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে পাহাড় কাটার অনুমতি চেয়েছে। কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগের আওতায় টেকনাফ উপজেলার জাহাজপুরা সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে পাকা সড়ক নির্মাণের জন্য প্রায় ৩৬টি প্রবীণ গর্জন বৃক্ষের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদফতর। কোনো ধরনের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাব যাচাই ও মূল্যায়ন ছাড়াই পাহাড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে সেনা স্থাপনা, বহিরাগত উদ্বাস্তু মানুষের বসতি, জমি ভরাট বা নির্মাণকাজে পাহাড় কেটেই মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে সারাদেশে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় পাহাড়ের স্থানীয় বন ও বৃক্ষ প্রজাতিকে গুরুত্ব না দিয়ে লাগানো হয়েছে সেগুন, একাশিয়া, রাবার, ম্যাঞ্জিয়ামের মতো আগ্রাসী প্রজাতি। এসব গাছের শিকড় পাহাড়ের মাটির বুনট ও উপরিস্তরের মাটিকে ধরে রাখতে পারে না। ফলে দিনে দিনে একেকটি পাহাড় নিজের শরীরে নানান আঘাত সয়ে মুমূর্ষু হয়ে ধসে পড়ছে অল্প বর্ষণেই। আমরা যদি উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ধসের অভিজ্ঞতাকে সামনে আনি তবে দেখা যাবে সেখানকার মেঘালয় পাহাড়ে প্রাকৃতিক বনভূমি উজাড় এবং পাহাড়ে করপোরেট কয়লা-পাথর-ইউরেনিয়াম খনির কারণে সেখানকার পাহাড় ফাঁপা হয়ে সমানে ধসে পড়ছে। যার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাংলাদেশের হাওর-ভাটি এলাকার মানুষকেও। ২০ জুলাই ২০০৮ তারিখে মেঘালয় রাজ্যের কালাপাহাড় ধসে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তের ৫০০ একর শস্যজমি বিলীন করে দেয়।
৪.
হয়তোবা বাংলাদেশের গরিষ্ঠভাগ মানুষ ঐতিহাসিকভাবে পাহাড়ের বাসিন্দা না হওয়াতে মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি পাহাড়ের সঙ্গে। কিন্তু দেশের অনেক নৃগোষ্ঠী পাহাড়ি জনগণ পাহাড়ের নামকরণের সঙ্গে স্থানীয় প্রাণবৈচিত্র্য, পাহাড়ের প্রতিবেশ, জাতিগত সংস্কৃতি এবং কোনো সামাজিক স্মৃতিময় ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমেক্রী-প্রাংসা ইউনিয়নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়গুলোর অবস্থান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়টির যে নামটি সর্বাধিক পরিচিতি পেয়েছে তহজিংডং নামে তা মারমা ভাষার শব্দ। মারমা ভাষায় ত-জিং-টং মানে সবুজ পাহাড়, বম এবং মিজো নদের ভাষাতে এর নাম চিং চির ময় ক্লাং, বাঙালিরা একবার এর নাম দিয়েছিল ‘বিজয়’। ক্যাক-ক্রো-টং (ক্রেওক্রাডং) পাহাড়টির নামও মারমা ভাষার, মানে হল পাহাড়ের শীর্ষদেশ। বম ও মিজো ভাষাতে এর নাম ক্রেওক্রক্লাং। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়সমূহের যে তালিকা তৈরি করে তাতে দেখা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি রেঞ্জের ২৯টি পাহাড়ের ভেতর ৫টি রেঞ্জের ৯টি পাহাড়ের নামই পাংখোয়া ভাষার। রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার একটি পাহাড়ের নাম থাংনাং। থাংনাং নামের এক পাহাড়ি পোকার নামে পাংখোয়ারা এই পাহাড়ের নাম রেখেছেন। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক উপত্যকার বড় পাহাড়ের নাম সাজেক থলাং, পাংখোয়া ভাষায় এর অর্থ অপূর্ব সুন্দর পাহাড়। সোয়ান-লু, দুমলুং, লুংজিয়াক, বোয়ারলুই, রালআউ, রাইনখ্যাং, লুলেই, সাইচাল, চিপুই, চাংপাল এই রকমের নানান নামে স্থানীয় পাহাড়কে পাংখোয়ারা চিহ্নিত করেন। আবার হাতির নামেও গড়ে উঠেছে অনেক পাহাড়ি এলাকা। শেরপুরের ডালু কোচেরা নানান পাহাড়ি টিলার নাম রেখেছেন হাতীবান্ধা, হাতীপাগার। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের মেনকীফান্দা পাহাড়ের কাছে একটি টিলার নাম মংমাগেত্তাক। পাহাড়ের টিলার রাস্তায় একবার এক হাতির গলা আটকে গেলে স্থানীয় মান্দি আদিবাসীরা এই পাহাড়ের এমন নাম রাখেন। রাঙামাটির পাংখোয়া আদিবাসীরা একটি পাহাড়ের নাম দিয়েছেন সাইরেং, এককালে ঐখানে হাতি শিকার হতো বলে। বাংলাদেশের সর্বাধিক পরিচিত পাহাড়ের ভেতর চিম্বুক, সীতাকুণ্ড, ক্রেওক্রাডং, তহিজংডং-এর মতো নানান পাহাড় টিলার নামই গড়ে উঠেছে স্থানীয় অধিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতিকে ঘিরে। পর্যটন বাণিজ্যের কারণে পরিচিত বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের নাম হয়েছে এই এলাকার আদি বাসিন্দা চিম বক ম্রোর নাম থেকে। কিন্তু স্থানীয় ম্রো আদিবাসীরা চিম্বুক পাহাড়কে ইয়াং বং হুং নামেও ডাকেন। ম্রো ভাষায় হুং বা চুত মানে পাহাড়। যে পাহাড়ের নাম বাঙালিরা দিয়েছে সীতাপাহাড়, তারই ম্রো নাম তামখন্চুত। সুঙনামকিয়নচুত মানে দেবতা পাহাড়, টেংচুত, খংতমচুত, নাকি না কং হুং, উইপিয়াকানচুত এ রকম নানান ম্রো নাম আছে নানান পাহাড়ের। পাহাড়ের অধিবাসীরা পাহাড়কে দেখেন জীবনযাপনের অংশ হিসেবে। অনেক আদিবাসী জনগণ নিজেদের পাহাড়ের সন্তান মনে করেন। কেবল নামকরণই নয়, পাহাড়ি এলাকার জনগণের জীবনের পুরোটাই পাহাড়কে ঘিরে, পাহাড়কে বুকে আগলে, পাহাড়কে চেনাজানার ভেতর দিয়েই বাহিত হয়। পাহাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো পাহাড়ি এলাকার আদিবাসীদের জীবন চলা অসম্ভব। ত্রিপুরা, মান্দি আদিবাসীরা পাহাড়ে জুম চাষের আগে পাহাড়ের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। ম্রোরা পাহাড়ের মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফসলের বীজ বুনেন। পাহাড়ের জুমে কুয়াতুইচা ধানটি ম্রোরা পয়লা বুনেন পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য যাতে স্থিতিশীল থাকে। মান্দি নৃগোষ্ঠী জুমে পয়লা দ্রেমব্রা জাগেদং ধানটি বুনেন যাতে বাঘের উপদ্রব জুমে না হয়। মৌলভীবাজারের খাসিয়ারা পাহাড়ি টিলা জমিতে পানজুমের সময় সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখেন পাহাড়ের যাতে কোনো কষ্ট না হয়। সিলেট অঞ্চলের চা বাগানের সাঁওতাল-মুণ্ডা-ওরাওঁ-খাড়িয়া-কন্দ-কোল নৃগোষ্ঠী চা শ্রমিকরা স্থানীয় পাহাড়ি টিলার অনেক জায়গা পবিত্র পাহাড় হিসেবে সংরক্ষণ করেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পাহাড় এবং মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড পাহাড়ের সঙ্গে যেমন হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি জড়িত আবার এসব পাহাড়ের অধিবাসী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এসব পাহাড়কে আগলে রাখেন নিজের জীবনেরই মতো।
৫.
পাহাড়ে বাইরে থেকে বসবাস করতে আসা বহিরাগত সকলেই পাহাড়কে দেখেছে মাটির স্তূপ বা ঢিবি হিসেবে, কখনও খনি হিসেবে আবার কখনও পর্যটন ব্যবসার স্পট হিসেবে। তাই পাহাড়ের পর পাহাড় কাটা হয়েছে। উধাও করা হয়েছে পাহাড়ের প্রাণবৈচিত্র্য, উচ্ছেদ করা হয়েছে পাহাড়ের যুগ-যুগান্তরের নৃগোষ্ঠীদের। দীর্ঘদিন থেকেই পাহাড় কাটা এবং পাহাড় বাণিজ্যের বিরুদ্ধে পাহাড়ি অধিবাসীদের পাশাপাশি গবেষক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকরা দাবি জানিয়ে এলেও সরকার এই বিষয়ে কোনো বিশ্বস্ত পাহাড়বান্ধব উদ্যোগ নেয়নি। আর তাই ধসে পড়ছে একটির পর একটি পাহাড়। সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। জরুরি পাহাড় রক্ষায় কঠোর আইনি উদ্যোগ গ্রহণ। যাতে দেশের একটুকরো পাহাড়ও কোনোভাবেই কোনো উন্নয়ন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাটা না হয়। আশা করি আর কোনো পাহাড় পাহাড়খেকো মানুষের দয়ামায়াহীন ভোগ্য বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হবে না। পাহাড় কেটে কেটে গড়ে উঠবে না আর কোনো পরিবেশ-উদ্বাস্তু মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ বসত। পাহাড়ি এলাকার আদি বাসিন্দাদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান, মানুষ বা আর কোনো প্রাণ উদ্বাস্তু হবে না তার আপন পাহাড় থেকে। কোনো পরিবেশ-উদ্বাস্তু মানুষও পাহাড়খেকোদের কাটা পাহাড়ে এসে লাশ হবে না আর। রাষ্ট্রের সকলের জন্যই নিশ্চিত হবে পাহাড়ের সম-অধিকারের বাস্তুসংস্থান। দেশের মুমূর্ষু পাহাড়ের আহাজারি থামানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আশা করি রাষ্ট্র অচিরেই পাহাড় ও পাহাড়ের মানুষকে বুকে আগলে হয়ে উঠবে প্রতিবেশ-ন্যায়পরায়ণ।
লেখক : গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ
animistbangla@yahoo.com