সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০২:৪৬

গাছ প্রকৃতির রক্ষাকবচ

Published : 2017-06-14 22:21:00
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে বনভূমি উজাড়, বন্য প্রাণীর বিলুপ্তিসহ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পকারখানার দূষণই দায়ী। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার কোনো অনুকূল পরিস্থিতি নেই। এখানে বনাঞ্চল, জলাধার ধ্বংস হয়ে গেছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের হিড়িক পড়েছে, শিল্পকারখানার দূষণ চলছে অবিরাম। বননির্ভর পশু-পাখি থাকবে কী করে! দেশে বর্তমানে মোট ভূমির পরিমাণ ১ কোটি ৪০ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে ১২ লাখ হেক্টর রয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৯০ সাল থেকে ১০ বছর মেয়াদে সংরক্ষিত বনে গাছ কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বৃক্ষ কর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বহুবার।
বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও একসময় বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। অবশ্য সময়ের প্রয়োজনেও মানুষ কিছু বনভূমি কেটে ফেলে আবাসস্থল তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে নতুন করে অধিক পরিমাণ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বহুকাল ধরে। উপরন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, অবিরাম চলছে নগর অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। মানুষের নিত্যনতুন চাহিদা মেটাতে তৈরি হতে থাকে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিল্পকারখানা। আর এসব করতে গিয়ে কেটে ফেলা প্রচুর পরিমাণ গাছপালা। ক্রমশ উজাড় হচ্ছে বনভূমি। প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার জন্য যেখানে দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ রয়েছে অনেক কম। অথচ বৃক্ষ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য।
এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হতে পারে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। কারণ বৃক্ষ নিধনসহ নানাবিধ কারণে জলবায়ুর আমূল পরিবর্তন হচ্ছে, ফলে বন্যা ও খরার প্রবণতা বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। উত্তাপ বৃদ্ধির ফলে হিমবাহের গলনে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি পাবে, পাশাপাশি পলি জমে সমুদ্রের তলদেশ ভরাট হয়ে যাবে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। এ বেড়ে যাওয়া ১ মিটার হলেই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মোট আয়তনের ১৫.৮ শতাংশ স্থলভাগ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ ভাগ ভূমি সাগর জলে তলিয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাসের কারণে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকে ভূমির উত্পাদনক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে সুস্বাদু পানীর প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে, দ্রুত বেড়ে চলছে লবণাক্ততা। ঋতুচক্র পরিবর্তনের কারণে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বাংলাদেশের অহঙ্কার তথা বিশ্বের প্রধান ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রায় ৫ হাজার প্রজাতির গাছের ১০৬টির অস্তিত্ব ইতোমধ্যে প্রায় বিলুপ্ত। ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি উত্পাদন ৩০ ভাগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। প্রাকৃতিক নিয়মেই উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়ে গঠিত যে জীববৈচিত্র্য তা একে অপরের সাহায্য নিয়ে যেমনি বেঁচে থাকে, তেমনি পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্মিলিতভাবে অবদান রাখে অসামান্য। তবু বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল, সমতল ভূমি এবং উপকূলীয় এলাকায় আজও রয়েছে বেশ কিছু বনাঞ্চল। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড় এলাকার বনে গর্জন, সেগুন, জারুল এবং গামারি জাতীয় বৃক্ষ পাওয়া যায়। দিনাজপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের বনাঞ্চলের নানা জাতের গাছপালাও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় অনেকটা সহায়তা করছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমে খুলনা ও পটুয়াখালী জুড়ে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন দীর্ঘকাল ধরে দেশের জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। প্রায়  ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বন দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে। এখানে প্রচুর  সুন্দরী,  গেওয়া ও কেওড়া গাছ ছাড়াও রয়েছে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ ও নানা প্রজাতির বানর, যা এক বিরল দৃষ্টান্ত। প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবনের বিপুল পরিমাণ গাছপালা ও পশুপাখির ভূমিকা অপরিসীম। কারণ উপকূলীয় বনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় বলে বাতাস আর্দ্র থাকে। বনভূমি যেকোনো উত্স থেকে আসা পানি প্রবাহের চাপ কমায় এবং ভূমিক্ষয় ও ভূমিধস থেকে দেশের মাটিকে রক্ষা করে। অধিকন্তু গাছপালা বায়ুমণ্ডলের উত্তাপ কমিয়ে দিয়ে বাতাসে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়। এমনকি বন যানবাহনের কালো ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বায়ুমণ্ডলকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। বনাঞ্চল, বিশেষ করে, ঝড়-ঝঞ্ঝা, সাইকেান, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের হাত  থেকে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ওপর স্মরণকালের মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়গুলো দেশের বিভিন্ন স্থানসহ উপকূলীয় এলাকার বিশাল একটি অংশ লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশে গাছপালা, পশুপাখিসহ মানুষের জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে দেশের অমূল্য সম্পদ সুন্দরবন উপকূলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকার বন বিনষ্ট হয়েছে। তবে সুন্দরবনের অবস্থানের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের বিশাল জনবসতি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। সুন্দরবনই ঝড়ের গতিবেগ রোধ করে ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষা করেছে। বাঁচিয়েছে উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য মানুষকে। এ সত্ত্বেও উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের কারণে ব্যাপক ফসলহানি, চিংড়ি প্রকল্প নষ্ট ও কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। প্রায় প্রতি বছর বাংলাদেশের উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাধাগ্রস্ত হয়েছে দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি।
গত ৫ জুন চলে গেল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে দেশের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করতে অধিকতর বনাঞ্চল সৃষ্টি করা অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে উপকূলীয় বনায়নেরও কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে ব্যক্তিগত এবং সরকারি উদ্যোগে বাড়ির আঙ্গিনা থেকে শুরু করে পতিত জমি, নদী ও রাস্তার পাশে প্রচুর গাছ লাগানো দরকার। দেশের অরক্ষিত বিশাল চরাঞ্চলসহ উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বনাঞ্চল সৃষ্টি করে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা জরুরি। সরকারি, বেসরকারি ও সমন্বিত উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন এবং রোপিত গাছপালার নিয়মিত পরিচর্যা দেশের বনজ সম্পদ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। উপকূলীয় বনভূমি সুরক্ষাসহ উপকূলীয় এলাকায় নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি জোরদার করা হলে তা ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে দেশকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। পুরনো বন সংরক্ষণ, নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করে দেশের বনভূমিকে আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে উন্নীত করা অবশ্যই সম্ভব। জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন শীর্ষক এক সম্মেলনে প্রতিটি দেশে বনাঞ্চল বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ন্যাশনাল ফরেস্ট্রি অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে বেশ আগে। তাতে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বনজ সম্পদ রক্ষা, বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ’ফরেস্ট্রি মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করাও হয়েছে। আগামীতে দেশের মোট ভূমির ২০ শতাংশ বনায়নের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে বৃক্ষহীন অথচ বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত ৭ লাখ ৫৮ হাজার একর জমিতে নতুন গাছ লাগানোর কথা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা জাতের বনজ ও ফলদ গাছের চারা বিক্রি হবে। শহরে গ্রামের নার্সারিগুলোতে কলম-চারা কিনতে পাওয়া যাবে। মানুষ কিনে গাছের চারা লাগাবেন। বাড়ির আঙ্গিনায়, ভবনের ছাদেও রকমারি গাছ লাগাতে দেখা যাবে। মানুষের মাঝে গাছ লাগানোর উত্সাহ লক্ষ করা গেছে। এ আগ্রহকে ধরে রাখতে হবে, বাড়াতে হবে গাছের সংখ্যা। বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক মানুষ যদি প্রতি বছর একটি করে হলেও গাছের চারা বা কলম রোপণ করেন তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই গাছপালা, লতাগুল্ম বেড়ে ভরে যাবে দেশ, বনে বনে পাখি গান ধরবে। শ্যামলে ছেয়ে যাবে অপরূপ বাংলার পথ-প্রান্তর। জীববৈচিত্র্যের অফুরন্ত সম্ভার নিয়ে আবার হেসে উঠবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
লেখক : গল্পকার