মঙ্গলবার ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭, রাত ০২:১২

বেড়ে উঠছি, বড় হইনি

Published : 2017-06-12 21:50:00
আসিফ ইমতিয়াজ: সমগ্র জাতি এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বৈশ্বিক সাফল্যে বুক চাপড়ে গর্ব করে থাকে। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে যে সাফল্যযাত্রার শুরু হয়েছে, তা এখনও জোরেশোরে বর্তমান রয়েছে। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির এবারের আসরে ইতোমধ্যে সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। বাঘের গর্জন শুনছে বিশ্ব। তবু কিছু কথা থেকে যায়।
ক্রিকেট শুধুই একটি খেলা নয়, একটি জীবনাচার। শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ, ভদ্রতার মিশেল ছাড়া যেমন ক্রিকেটবিশ্বে সফল এবং স্মরণীয় হওয়া যায় না, ঠিক তেমনি এই গুণগুলো ছাড়া ব্যক্তিজীবনেও বরেণ্য হওয়া যায় না। ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট সমর্থকদের আচরণের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় সে দেশের জাতীয় সংস্কৃতি। ক্রিকেট মাঠে ক্রিকেটারদের এবং ক্রিকেট আলোচনায় সমর্থকদের আচরণের পরিমিতিবোধ দ্বারা একটি দেশের জাতীয় শিষ্টাচারের ধারণা পাওয়া সম্ভব।
মাঠে আমরা বড় দল হয়ে উঠছি ঠিকই; কিন্তু মাঠের বাইরে কত বড় হতে পেরেছি তা তর্কযোগ্য। আজকের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজ একদম দর্পণের মতো। ভদ্রতা এবং শিষ্টাচারের লিটমাস টেস্টের জন্য খুব উপযুক্ত পরীক্ষাগার হচ্ছে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যতই এই মাধ্যমকে আমরা গুরুত্ব কম দিই বা হালকা করে দেখি না কেন, এই মাধ্যমে ব্যক্তির কাজকর্মকে তার মনোজগতের প্রতিভূ হিসেবে বিবেচনা করাই যায়।
সাকিব আল হাসানের পারিবারিক ছবিগুলোতে তার স্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে অথবা তার স্ত্রী কেন পর্দা করে না, বোরকা পরে না ইত্যাদি উদ্ভট কথা বলে যে শ্রেণি নিজেদের ইসলাম-পছন্দ অথবা বিরাট ভদ্রলোক বলে পরিচয় দিতে চায়, তারা আসলে মগজবিহীন চামড়ার কাঠামো ছাড়া কিছুই নয়। ইসলামের তাগিদ বা দাওয়াতের অনেক পদ্ধতি আছে। যদি সাকিব আল হাসান এবং তার পরিবারের সদস্যদের ইসলামের প্রকৃত দীক্ষায় দীক্ষিত করার ইচ্ছা কারও এতই তীব্র হয়, সে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে পারে। কারও ফেসবুক পেইজে এভাবে অসংলগ্ন কথা লিখে তাকে হেদায়েত করা যায় না। উল্টো শান্তির ধর্ম, মহান ধর্ম ইসলামের ব্যাপারে জনমনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। ঈদে একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে কোনো এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলে, যেখানে আলোচনায় সস্ত্রীক অংশ নেবেন সাকিব। তারই ছোট্ট একটি খণ্ড এখন ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক এসব মন্তব্যের ব্যাপারে সাকিবের মতামত জানতে চাইলে হতাশ হাসিতে সাকিব প্রশ্ন করেছিলেন ‘আমরা এমন কেন?’
নিজ দেশের খাঁটি রতনগুলোকেই যখন আমরা ছাড়ি না, তখন অন্য ক্রিকেটখেলুড়ে জাতির ব্যাপারে আমাদের মনোভাবের ব্যাখ্যা আর না করলেও চলে। বেশির ভাগ ক্রিকেট দলের প্রতিই আমাদের মনোভাব চরমভাবাপন্ন। বিশেষ করে বলতেই হয় ক্রিকেট মাঠে আমাদের ভারতবিদ্বেষের কথা। জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা প্রাপ্তির লগ্ন থেকেই একশ্রেণির মানুষ ভারতের বিরোধিতা শুধু করেই আসছে না, ভারতবিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিল এবং রয়েছে প্রজন্মান্তরে। ক্রিকেটে ভারত বিরোধিতার অবশ্য কিছু কারণও রয়েছে। বীরেন্দর শেবাগ এবং নভজ্যোত সিং সিধুর এখানে বিশাল বড় দায়। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগ দিয়ে ভারতের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলছিল বাংলাদেশ। এই সময় ভারতীয় চ্যানেল স্টার স্পোর্টসে হিন্দিতে ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন দেশটির পক্ষে দুটি ট্রিপল সেঞ্চুরির মালিক শেবাগ। এই সময় মন্তব্য করতে গিয়ে শেবাগ বলেন, ‘ছেলের বিপক্ষে খেলার আগে নাতির বিপক্ষে খেলছে ভারত।’ গত ৪ জুন এজবাস্টনে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলেছিল ভারত। শেবাগ তার কথায় পাকিস্তানকে ছেলে ও বাংলাদেশকে ভারতের নাতি বলে উল্লেখ করেন। বেশ কয়েকটি ভারতীয় গণমাধ্যম ফলাও করে সংবাদটি প্রচার করেছে। এর আগেও বাংলাদেশ সম্পর্কে কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য করেন শেবাগ। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে শেবাগ বলেন, ‘বাংলাদেশ সাধারণ মানের একটি দল। ওরা কোনোভাবেই আমাদের ২০টি উইকেট নিতে পারবে না।’ নভজ্যোত সিং সিধুও বেশ কয়েকবার বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিয়েছেন।
এ সকল মন্তব্য হজম করা কঠিন। তবে এ-ও মনে রাখতে হবে যে আমরা এখনও প্রতিষ্ঠিত শক্তি নই, হওয়ার পথে রয়েছি। চলার পথে এসব উটকো কথা অনেকেই বলতে পারে, তা ধর্তব্যে আনা চলে না। সাফল্য দিয়ে, ম্যাচ জয় দিয়েই এ ধরনের অকালতত্ত্ব জ্ঞানী পণ্ডিতের মোলায়েম আক্রমণ করতে হয়। ঠিক এই কাজটিই করে চলেছে মাঠের বাংলাদেশ। কিন্তু তেতে আছে মাঠের বাইরের বাংলাদেশ।
নিত্যনতুন ট্রল, মিম ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা আক্রমণ করছি বিশেষ করে ভারতকে, অন্য দেশও বাদ যাচ্ছে না। যাচ্ছেতাই গালিবর্ষণ, অক্ষম আস্ফাালনে শুধু ভার্চুয়াল জগতের পরিবেশটাই নষ্ট হয়, আখেরে কোনো লাভ হয় না। ভারত দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তাদের অহমিকা যদিও কাম্য নয়, তবুও থাকতেই পারে। তাদের কথার জবাবে উত্তেজিত হয়ে গাল পাড়লে আমরা তাদের থেকে উন্নত কীভাবে হলাম? জবাব দিতে হবে খেলায়, মুখে নয়। মুখ চালিয়ে কাউকে পরাভূত করা যায় না। বিনয় দিয়ে, সভ্য আচরণ দিয়ে জয় করে নিতে হয়।
নৈপুণ্য বা দক্ষতায় বাংলাদেশের ক্রিকেট যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি ক্রিকেট সংস্কৃতিতেও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ভারতের সমর্থকদের বেয়াদব বলি আর পাকিস্তানি সমর্থকদের বেয়াদব বলি, আমাদের নিজেদের আচরণ যদি তাদের থেকে ভিন্ন না হয় তাহলে তো ওই বেয়াদব সমর্থকদের আদব নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আমরা হারাব। কোনো বৈশ্বিক শিরোপা না জিতেই আমাদের গলার হুঙ্কারের যে তেজ, শিরোপা জেতার পরে তো তাহলে আমাদের বড়াইয়ে টিকে থাকা দায় হয়ে যেতে পারে বাকি দেশগুলোর। যে যতটা সহ্য করতে পারে, আল্লাহ তাকে ততটাই দেন।
সকল দেশের রানী আমাদের এই জন্মভূমি। রাজপুত্রের মতো আচরণ তো আশা করাই যায় আমাদের কাছ থেকে। তাই না?
লেখক : শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়