মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ১০:১৮

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ

Published : 2017-06-09 22:00:00
রেজাউল করিম খোকন: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি বাড়াতে আঞ্চলিক বাণিজ্য বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে প্রায় সময়েই। অনেক বাধা-বিপত্তির কারণে মাঝেমধ্যে আমাদের রফতানি বাণিজ্য হোঁচট খাচ্ছে। তেমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে উপকৃত হবে বাংলাদেশ। বাণিজ্যের হাত ধরে এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটতে পারে। ভারতের শুধু ত্রিপুরাতেই বছরে ৫০০ কোটি রুপির পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ রফতানির মাত্রা আরও বাড়াতে পারে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় এসব রাজ্যে পণ্য পরিবহনেও বিদ্যমান ব্যবস্থা অনেকটা অনুকূল। যে কারণে এসব রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্য অনেকটা বজায় রাখা সম্ভব।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, গত বছর অর্থাত্ ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে মিয়ানমারে। এর মধ্যে রয়েছে বিবিধ পণ্য। যার মধ্যে তৈরি পোশাকসামগ্রী, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধপত্র প্রভৃতি রয়েছে। বর্তমানে নানা জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। অথচ বাণিজ্য সহজীকরণ করা হলে এই রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। মিয়ানমারে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেখানে অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে দারুণ গতির সঞ্চার হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে এখন বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণের সুবর্ণ সময় যাচ্ছে বলা যায়। মিয়ানমারের ওষুধবাজার মূলত আমদানিনির্ভর। প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের ওষুধের বিরাট বাজার রয়েছে সেখানে। তারা প্রধানত থাইল্যান্ড, চীন থেকে ওষুধ আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। সেখানে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানির দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে এখন উন্নতমানের ইলেকট্রনিক সামগ্রী প্রস্তুত হচ্ছে। মিয়ানমারে যার বিরাট চাহিদা রয়েছে। ইলেকট্রনিক সামগ্রী সেখানে রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশ ভালো পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারে।
এক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী মিয়ানমারের বাণিজ্যিক লেনদেন বেশ চাঙ্গা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লেনদেন ক্রমেই হ্রাস পেয়েছে। একসময়ে মিয়ানমারের সারা বিশ্ব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তারপরেও মিয়ানমারের সঙ্গে কিছু কিছু পণ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে বৈধ বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকদিন কোনোভাবে চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এর বাইরেও অবৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু পণ্য মিয়ানমারে যাচ্ছে। আবার একইভাবে মিয়ানমার থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আসছে মাত্র কয়েক বছর আগেও প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ছয়গুণ। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক বছরের ব্যবধানে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি পুষিয়ে গত অর্থবছরে মিয়ানমারে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ বেড়েছে। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হলে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও অনেক বেশি সম্প্রসারিত করা সম্ভব। পাশাপাশি অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিনেও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি না পাওয়ার অন্যতম কারণ হল, দুই দেশের মধ্যে নৌ-ট্রানজিট না থাকা। বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কানেক্টিভিটি বা সংযোগ ঘটানোকেই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে নৌ-প্রটোকল এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়ীরা চাইলেও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আগামী ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ মিয়ানমারে রফতানির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে আরও আগেই। মিয়ানমারে বাংলাদেশ থেকে পণ্য লেনদেনের জন্য ঋণপত্র বা এলসি খুলতে চাইলেও কোনো ব্যবসায়ী তা পারেন না, কোনো ব্যাংকে সেই সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের সঙ্গে তাদের চুক্তি নেই। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে বর্তমানে পণ্য রফতানির জন্য ব্যবহূত রুট হচ্ছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন। সমুদ্রপথে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে কমপক্ষে পাঁচ দিন। আর যদি বাংলাদেশের টেকনাফের পার্শ্ববর্তী বন্দর সিটওয়ে বা সাবেক আকিয়াব অঞ্চলে কোনো পণ্য পাঠাতে হয় সে ক্ষেত্রে ইয়াঙ্গুন থেকে সড়কপথে আরও ৩২ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হয়। অথচ দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে নৌ-প্রটোকল চুক্তি হয়ে গেলে ছয় থেকে আট দিনের এই দূরত্ব নেমে আসবে আট ঘণ্টায়। দুই দেশের মধ্যে নৌ প্রটোকল চুক্তি হলে স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যাপকভাবে প্রসার ঘটবে। চট্টগ্রামের সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দর, টেকনাফ এবং উত্তরাঞ্চলের দুটিসহ পাঁচটি নৌবন্দরের সঙ্গে মিয়ানমারের সিটওয়ে বন্দর হয়ে এক হাজার টনের জাহাজ চলাচল করবে। স্বল্প দূরত্বের কারণে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাও এই সুযোগ লুফে নেবেন।
ওদিকে প্রতিবেশী দেশ নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ লেনদেন আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। নেপালে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রী রফতানি আয় বেড়েই চলেছে আর হ্রাস পাচ্ছে আমদানি। উভয় দেশের সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি, বিশেষ করে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধিসহ দূরদর্শী কিন্তু পদক্ষেপের ফলে নেপালের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এখন বাংলাদেশের অনুকূলে চলে এসেছে। নেপালে বাংলাদেশের উত্পাদিত বিভিন্ন ধরনের ভোগ্য পণ্য, খাদ্যদ্রব্য, শৌখিন, গৃহস্থালি পণ্য ও নির্মাণসামগ্রীর বিরাট চাহিদা রয়েছে। নেপাল অনেকদিন ধরেই আমদানিতে একচেটিয়া ভারত-নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নেপালে বাংলাদেশের রফতানি বাজার বিস্তৃতির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। এখানে সুযোগ রয়েছে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের। বিপুল চাহিদার তুলনায় নেপালে বাংলাদেশের রফতানি বাজার এখনও অনেকটা সীমিত রয়ে গেছে। প্রাকৃতিকভাবে বন্দর সুবিধাবঞ্চিত ভূমি পরিবেষ্টিত (ল্যান্ড লক্ড) দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারিত করতে পারে। বাংলাদেশ তার নিজের বন্দর ব্যবহার করে নেপালে অনেক পণ্য পুনঃরফতানি করতে পারে। গত বছর অর্থাত্ ২০১৬ সালে নেপালে বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ ৩৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা আয় করেছে। আর বাংলাদেশ নেপাল থেকে আমদানি করেছে ১০৭ কোটি ৭ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য সিরামিকসামগ্রী, ওষুধ, আসবাবপত্র, পোশাকসামগ্রী প্রভৃতি নেপালে রফতানি হচ্ছে। নেপাল থেকে আমদানি করা হচ্ছে ডাল, মশলাসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য। পর্যটন খাতের ব্যাপক প্রসার ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে নেপালের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ইদানীং বেশ বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রফতানি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দিয়েছে দেশটির পরিবর্তিত বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি। এখন নেপাল ভারত থেকে পণ্য আমদানি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। নেপালের আমদানিকৃত পণ্যের ৬৩ শতাংশই ভারত থেকে আসে। আর ১৭ শতাংশ আসে চীন থেকে। অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা হয় অবশিষ্ট ২০ ভাগ। এখন বাংলাদেশের পক্ষে যদি নেপালে অন্যান্য দেশের বাণিজ্যের ২০ শতাংশ এবং আমদানিতে সে দেশের ভারত নির্ভরতা হ্রাসকরণ নীতির সুফল পেতে হয় তাহলে রফতানি পণ্যের সংখ্যাগত ও পরিমাণগত আওতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ও নেপালের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে সময়োচিত, দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করাই এ মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সন্দেহ নেই। এজন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে কর্মপরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।
নেপাল, মিয়ানমার, ভুটান, ভারতের কয়েকটি সীমান্তবর্তী রাজ্য আমাদের নিকট প্রতিবেশী। দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে হলে প্রথমেই দরকার এসব দেশ এবং রাজ্যের সঙ্গে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে চার দেশীয় (ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান) প্রস্তাবিত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলে বাংলাদেশ থেকে এসব দেশে রফতানির পথ সুগম হবে এবং রফতানির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে পারে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়লে দুই দেশের টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।
প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসারের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের উত্পাদিত ও প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য, পানীয়, রাসায়নিক দ্রব্য, সিরামিকসামগ্রী, ওষুধ, আসবাবপত্র, স্টিল ও আয়রন-সামগ্রী, সাবান, মেলামাইন, প্লাস্টিকজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, টেরিটাওয়েল ও পোশাকসামগ্রী, খেলনা, পাটজাত দ্রব্য, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প পণ্য, বিভিন্ন শৌখিন দ্রব্য, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আইটি সামগ্রী ইত্যাদির বিরাট বাজার রয়েছে এসব দেশে। আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির নতুন সোপানে উন্নীত হতে পারে দ্রুত।
লেখক : ব্যাংকার