বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ১২:০০

অর্জনগুলো ধরে রাখতে সতর্ক থাকতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

Published : 2017-02-23 00:01:00

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালি জাতির যখন যা কিছু অর্জন তা অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে, সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের অর্জন করতে হয়েছে। কাজেই সেই অর্জনকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। তিনি বলেন, কোনোভাবেই যেন অর্জনগুলোকে কেউ আবার ভবিষ্যতে নস্যাত্ করতে না পারে, এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
গতকাল সকালে চলতি বছরের একুশে পদকপ্রাপ্তদের মাঝে পদক বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এই আহ্বান জানান তিনি। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় 
আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালের একুশে পদক বিজয়ী ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে এই পদক তুলে দেন।
ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা (সংগীত, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য, নাটক ও নৃত্য), সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজসেবা, ভাষা ও সাহিত্যে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। পুরস্কার হিসেবে একটি সনদপত্র, স্বর্ণপদক এবং দুই লাখ টাকার চেক বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
সংস্কৃৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেন খান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম পদক বিতরণ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং পদক বিজয়ীদের সাইটেশন পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, বিচারপতিবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ, পদস্থ সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পদক বিজয়ীরা হচ্ছেন-‘অপরাজেয় বাংলার’ ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী এবং দৈনিক জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়, অধ্যাপক ড. শরিফা খাতুন, শিল্পকলায় (সংগীত) সুষমা দাস, ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম (বংশীবাদক, শাস্ত্রীয় সংগীত), জুলহাস উদ্দিন আহমেদ (স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী), শিল্পকলায় (চলচ্চিত্র) তানভীর মোকাম্মেল (লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা), শিল্পকলায় (নাট্যশিল্পী) সারা যাকের, গবেষণায় সৈয়দ আকরম হোসেন, শিক্ষায় প্রফেসর ইমেরিটাস আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও লেখক), সাংবাদিকতায় আবুল মোমেন, সমাজসেবায় অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান (আইপিজিএমআরকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী), ভাষা ও সাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়া (ছড়াকার), শিল্পকলায় (নৃত্য) শামীম আরা নীপা এবং শিল্পকলায় (সংগীত) রহমতউল্লাহ আল মাহমুদ সেলিম ওরফে মাহমুদ সেলিম (গণসংগীত শিল্পী, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতিবাদকারী) এবং ভাষা ও সাহিত্যে (মরণোত্তর) কবি ওমর আলী।
বিজয়ী সবাই প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে পদক গ্রহণ করেন। মরণোত্তর কবি ওমর আলীর পক্ষে তার ছেলে মো. রফি মনোয়ার আলী প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে পদক গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী একুশে পদক বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, কথায় আছে, যে দেশে গুণীর কদর নেই, সেদেশে গুণীর জন্ম হয় না। তিনি বলেন, তার সরকার গুণিজনদের তাদের প্রাপ্য সম্মান প্রদানের বিষয়ে আন্তরিক।
প্রধানমন্ত্রী ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস করতে তার সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে উল্লেখ করেন এবং সম্প্রতি একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে পাকিস্তানের জনৈক জুনায়েদ আহমেদের বই প্রকাশ এবং সেই বই বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানোর ধৃষ্টতার তীব্র নিন্দা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি লক্ষ করছি, পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। তারা কিছুদিন আগে একটি পুস্তক বের করে তাতে উল্লেখ করেছে, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যা শুরু করেছিল তাতে এদেশীয়  যেসব আল বদর, আল শামস, রাজাকার যোগ দিয়েছিল সেসব গণহত্যার ছবিতে মিথ্যা ক্যাপশন এঁটে দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে এসব হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানি বাহিনীর নয়, মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠন করেছে বলে তারা তা প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন যে অপপ্রচার তারা (পাকিস্তানি গোষ্ঠী) করে যাচ্ছে তা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই ২৫ মার্চকে আমাদের গণহত্যা দিবস হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এর স্বীকৃতির জন্য আমাদের প্রচার চালাতে হবে।
বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামী ইতিহাসে অমর একুশে এক উজ্জ্বল এবং মহান সংযোজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একুশের পথ বেয়েই আমরা পৌঁছেছি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মোহনায়।
মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় সব গণআন্দোলনের পতাকাবাহী সংগঠন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ, তমুদ্দীন মজলিস এবং আরও কয়েকটি ছাত্র সংগঠন মিলে সর্বদলীয় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করে ধর্মঘট ডাকা হয় এবং সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ জনগণকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য দেশব্যাপী প্রচারাভিযান শুরু করে।
স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ভাষার দাবিতে একটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। পরে মিছিল নিয়ে নেতৃবৃন্দ খাজা নাজিমউদ্দিনের কাছে দাবিনামা পেশ করেন। কিন্তু ওই দিনই পুলিশ এক দল ছাত্রের ওপর লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। প্রতিবাদে ছাত্ররা পরের দিন সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করেন।
১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু আবারও গ্রেফতার হন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই মাসের শেষে তিনি মুক্তি পান। ১৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ ঢাকায় ভুখা মিছিল বের করে। মিছিল থেকে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুসহ অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই আবারও ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।
এ সময় বঙ্গবন্ধু বন্দি অবস্থায় চিকিত্সার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, হাসপাতালের কেবিনে প্রায়ই তিনি ছাত্রলীগের তত্কালীন সভাপতি নঈমুদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজসহ ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করে আন্দালনের দিকনির্দেশনা দিতেন। এসব বৈঠক হতো মধ্যরাতের পর। এরকম এক বৈঠকেই ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১৯৭ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘... পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির সেই বিয়োগান্তক ঘটনা রাতারাতি আমাদের মনন, চিন্তা-চেতনায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। ... আমরা যারা পাকিস্তানি শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠেছি, আমাদের কাছে একুশে ছিল এক অন্যরকম শক্তি, প্রেরণা, উদ্দীপনার উত্স।
’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশি প্রয়াত রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামের সহযোগিতায় তার সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রদানের বৃত্তান্তও তুলে ধরেন। - See more at: http://www.shokalerkhobor24.com/details.php?id=61832#sthash.84kTnF6Q.dpuf