শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৫:৪৩

স্বস্তি-অস্বস্তির দোলাচলে বাজেট

Published : 2017-06-08 21:28:00
ড. জাহাঙ্গীর আলম: ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য সংসদে নয়া বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এটি তার ১১তম বাজেট। বর্তমান সরকারের আমলে তার দেওয়া বাজেটের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট বাজেটের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। ৭ বছর পর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ২০৮.১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকায়। এ সময় বাজেটের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে ১৪.০৭ শতাংশ। অনুন্নয়ন খাতের তুলনায় উন্নয়ন খাতের বাজেট বৃদ্ধির হার ছিল বেশি। আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের আকার হয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। গত বছরের মূল বাজেটের তুলনায় তা হচ্ছে ১৭.৫ শতাংশ বেশি। এটি একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট। দেশের মানুষের দারিদ্র্য মোচন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেটই আমাদের কাম্য। এ বাজেটের আকার হচ্ছে জিডিপির ১৮ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারি ব্যয় ছিল জিডিপির ১৪ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১৩.৫ শতাংশ। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মূল বাজেটের পরিমাণ যা ছিল, পরে তা থেকে ৭ শতাংশ হ্রাস করে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ১৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এটি জিডিপির প্রায় ১৬.১৫ শতাংশ। একটি দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বাজেটের আকার আরও সম্প্রসারিত হওয়া দরকার। অদূর ভবিষ্যতে তা জিডিপির ২০ থেকে ২২ শতাংশে উন্নীত করা উচিত।
গত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭.২ শতাংশ। সরকার বলছে, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। প্রাথমিক হিসেবে অর্জনের পরিমাণ লক্ষমাত্রার চেয়ে বেশি। দেশে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভালোভাবে এগিয়ে যাওয়ায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটা নিশ্চিত। তবে অনেকে মনে করেন, এ লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি সংস্থা আইএমএফের মতে এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬.৯ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও ধারণা করছে ৬.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের। অপরদিকে বিশ্বব্যাংক এবার ৬.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পূর্বাভাস দিয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার জন্য এ প্রবৃদ্ধির হার যথেষ্ট নয়। দেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা অনুসারে এখন বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হওয়া উচিত ৮ থেকে ১০ শতাংশ। ১৯৯৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এদেশে প্রতিবছর গড়ে ৫.৬৯ শতাংশ হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা ছিল সর্বোচ্চ ৭.১১ শতাংশ এবং ১৯৯৪ সালে ছিল সর্বনিম্ন ৪.০৮ শতাংশ।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বাজেটের আকার হচ্ছে বিশাল থেকে বিশালতর। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বিনিয়োগও তেমন বাড়ছে না। অপরদিকে মানুষের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। হ্রাস পাচ্ছে সরকারি খরচের গুণগত মান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেটের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি এবং তা মূল্যস্ফীতির অনুপাতে নিরন্তর বাড়িয়ে যাওয়া, অনেক মেগা প্রকল্প গ্রহণ এবং ব্যাংকিং খাতে ঘাটতি মেটানোর জন্য অনুদান অব্যাহত রাখা। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় আরও বৃদ্ধি করা হবে। নিঃসন্দেহে তিনি সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা খাতে খরচ বৃদ্ধির প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন। তবে এ কথাটি যে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে বলেছেন তাতে সন্দেহ হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে দেশে দেশে সরকারের আকার ছোট করা হচ্ছে, খরচ সীমিত করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমাদের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য বিপরীত স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার শামিল। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র প্রায় ২২ লাখ। তার বাইরে আছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ বেসরকারি কর্মচারী। তাদের অনেকেই মাস শেষে নিয়মিত বেতন পান না। মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমে গেছে। আর সাধারণ মানুষের অবস্থা তো তাদের চেয়ে খারাপ। অপরদিকে মেঘা প্রকল্পের জন্য যে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে তার ব্যয়-কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মেঘা প্রকল্পের তুলনায় আমাদের মেঘা প্রকল্পের ব্যয় কার্যকারিতা কম। তাছাড়া ব্যাংকিং খাতে সীমাহীন জালিয়াতি ও দুর্নীতিজনিত ঘাটতি মেটানোর জন্য চলতি ও প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ পুনর্ভরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ দুর্বৃত্তায়ন হ্রাস করার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। উপরন্তু অর্থমন্ত্রী এ দুর্বৃত্তায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, ‘ব্যাংকে চুরি সব দেশেই হয়’। তার এ বক্তব্য দুর্বৃত্তায়নকে উস্কে দেওয়ারই নামান্তর।
প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যম্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৫.৫ শতাংশ। বাস্তবে এটা আরও বেশি হবে। এবার খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার দ্রুত বাড়ছে। পরোক্ষ কর ও ভ্যাটের চাপে অদূর ভবিষ্যতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া আগামী বাজেটে প্রত্যক্ষ করের হার অপরিবর্তিত রেখে মূল্য সংযোজন করের মাত্রা বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা সামাজিক ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। বাজেট মূল্য সংযোজন কর আহরণের ওপর অবলীলাক্রমে অতিমাত্রায় নির্ভর করা হয়েছে যা ধনি-দরিদ্র সকলের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য। এ কারণে সরকারি আয়ের মূল উত্স হওয়া উচিত প্রত্যক্ষ কর, যা প্রযোজ্য হয় প্রগতিশীল হারে। এটা মূল্যস্ফীতিরও সহায়ক নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে সরকারি আয়ের মূল উত্স হচ্ছে প্রত্যক্ষ কর। আমাদেরও এখন যাত্রা শুরু হয়েছে মধ্য আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের দিকে। এ সময় ভ্যাট হার বেশি না বাড়িয়ে প্রত্যক্ষ করের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করা উচিত।
বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খাতওয়ারি বরাদ্দ। উত্পাদনশীল খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে নতুন কমসংস্থান বৃদ্ধি পায়। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং তা দারিদ্র্য মোচনে সহায়ক হয়। কৃষি একটি প্রধান উত্পাদনশীল খাত। বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন ২০০৮ অনুসারে কৃষির উত্পাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্যের হার ০.৫ শতাংশ হ্রাস পায়। অর্থনীতির অন্যান্য খাতে উত্পাদন বৃদ্ধির তুলনায় কৃষি খাতে উত্পাদন বৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচনে দ্বিগুণ কার্যকর। কারণ কৃষি খাতে উত্পাদন বৃদ্ধি পেলে খাদ্য ও পুষ্টির সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। তাতে খাদ্যপণ্যের মূল্যে স্থিতিশীলতা আসে। ফলে খাদ্য ভোগ বেড়ে যায় সাধারণ মানুষের। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে খাদ্যশস্যের উত্পাদন বেড়েছে ৩.১ শতাংশ হারে। এ সময় দেশের দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে বছরে গড়ে ১.৪ শতাংশ হারে। তাতেও প্রতীয়মান হয়, কৃষির উত্পাদন বৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের একটি সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃষি খাত তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। যে হারে মোট বাজেট বৃদ্ধি পাচ্ছে কৃষি বাজেটের প্রবৃদ্ধি সে হারে হচ্ছে না। ২০১০-১১ সাল থেকে ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ মোট বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬১.৯৮ শতাংশ। পক্ষান্তেরে সার্বিক কৃষি খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৯৯.০৩ শতাংশ। শস্য খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল আরও কম। উন্নয়ন এবং অনুন্নয়ন উভয় খাতেই তা দৃশ্যমান। তাতে ভাটা পড়েছে সকল কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিতে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুসারে ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫৫ শতাংশ। শস্য খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.৫৭ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ১.৭৯ ও ০.৮৮ শতাংশে। তাতে ধারণা করা যায়, বাজেট বরাদ্দ হ্রাসের সঙ্গে সার্বিক কৃষি খাতের বিশেষ করে শস্য খাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে। এবার অর্থাত্ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছে ১.৭২ শতাংশ। এ হার বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এ প্রবৃদ্ধির হার হিসাব করা হয়েছে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের উত্পাদনের ওপর ভিত্তি করে। ওই পরিসংখ্যানে সাম্প্রতিক বোরো ধানের ক্ষতি বিবেচনা করা যায়নি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, এবার বোরো চালের উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০-১২ লাখ টন কম হবে। তাতে শস্য খাতের প্রবৃদ্ধি হবে ঋণাত্মক। ফলে বর্তমান প্রক্ষেপণ থেকে হ্রাস পাবে সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি। এমনি এক প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাবটি দিয়েছেন তাতে ফসল কৃষি খাতের প্রকৃত বরাদ্দ (ভর্তুকি বাদ দিয়ে) বেড়েছে ৫.১ শতাংশ। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির হার ৫.৩৯ শতাংশ আমলে নিলে ফসল কৃষি খাতের বরাদ্দ ০.২৯ শতাংশ কমে গেছে। বৃহত্তর কৃষি খাতের বরাদ্দ এবার ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও মূল বাজেট বৃদ্ধির হার ১৭.৫ শতাংশ থেকে তা অনেক কম। সবচেয়ে চাতুরতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে কৃষি ভর্তুকির ক্ষেত্রে। গত চার বছর ধরে সরকার কৃষি ভর্তুকির জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু খরচ করছে মাত্র প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। মূল বাজেট কৃষি ভর্তুকির টাকা কমানো হচ্ছে না সম্ভবত এই ভেবে যে, পাছে কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে না যায়। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা নীরবে কেটে দেওয়া হচ্ছে। ফলে যে হারে মূল বাজেট বাড়ছে, প্রায় একই হারে কমছে প্রকৃত কৃষি ভর্তুকি। এটা কৃষির জন্য বড় ক্ষতি। দেশের কৃষকদের সঙ্গে এটা অবহেলারই নামান্তর। এটা প্রতারণা।
ব্যাংকের আমানতের ওপর সরাসরি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবে খুশি নয় সাধারণ মানুষ। বর্তমানে আমানতের ওপর সুদের হার গড়ে ৫.১৩ শতাংশ। অথচ মূল্যস্ফীতির হার হচ্ছে ৫.৩৯ শতাংশ। পৃথিবীর কোনো দেশে মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে আমানতের সুদের হার নিচে নয়। অথচ বাংলাদেশের ক্ষুদে আমানতকারীরা তা সইয়ে যাচ্ছেন। তার ওপর আছে সুদের ওপর কর। তদুপরি বাড়ছে আবগারি শুল্ক। বাড়ছে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব কর্তন। সার্ভিস চার্জ। সবকিছু মিলে ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখা মানে আসলটাই একটু একটু করে হারানো। এটা মানুষের সঞ্চয় প্রবণতাকে নিরুত্সাহিত করবে। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়াতেও মানুষের আপত্তি আছে। নতুন আইনে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হলে উত্পাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় বাড়বে। অবশ্য অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রায় ১ হাজার ৪৩টি পণ্যে ভ্যাট অব্যহতি দেওয়ায় তা মূল্যস্ফীতি ঘটাবে না। দেশের ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন, এবার করপোরেট কর হার কমানো হবে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তা করেননি। অনেকে মনে করেন, করপোরেট কর হার কম হলে দেশে বিনিয়োগ উত্সাহিত হয়। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা চলছে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য করপোরেট কর হার নামিয়ে আনা উচিত ছিল। সর্বোপরি প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৩১.৮ শতাংশ। তা আদায়ের বিষয়টি প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারণ গত বাজেটের ১৫.৩ শতাংশ রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধিও এবার অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস, প্রবাসী আয় হ্রাস, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হারে নিশ্চলতা, বিদেশে অর্থ পাচার এবং ব্যাংকিং খাতে দুর্বৃত্তায়ন বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এগুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ এ বাজেটে নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। তদুপরি বিশাল অঙ্কের এ বাজেটের অর্থসংস্থানের জন্য অর্থমন্ত্রী মরিয়া হয়ে সাধারণ মানুষের আমানত ও আয়ের ওপর অতিমাত্রায় চেপে বসেছেন। অথচ তিনি বলছেন, এটা তার জীবনের সেরা বাজেট। অবশ্যই সর্ববৃহত্ একটি বাজেট দিয়ে তিনি যেমন সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তার ব্যয় সঙ্কুলানের কৌশল নিয়ে অনেকেই আবার অসন্তোষও প্রকাশ করছেন। এই স্বস্তি-অস্বস্তির মাঝে মুখ খলেছেন প্রধানমন্ত্রী। গত রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহত্ বাজেট আমরা দিয়েছি। বাজেট পার্লামেন্টে আলোচনা হবে। হয়তো কিছু সমস্যা থাকতে পারে, নিশ্চয়ই আমরা তা দেখব, সমাধান করব। তার এই আশ্বাস সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ও প্রেরণা জোগাবে। হতাশা কাটবে তাদের। প্রস্তাবিত নয়া বাজেটটি প্রকৃত অর্থেই ত্রুটিমুক্ত হোক, এটি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করুক ও কর্মসংস্থানে সহায়ক হোক, বাজেটের প্রতিটি টাকা সত্যিকারভাবেই জনকল্যাণে নিয়োজিত হোক-এই আমাদের প্রত্যাশা। 

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক