রবিবার ২১ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০৪:৩৪

পরিবেশ সংরক্ষণে ছাদ বাগান

Published : 2017-06-07 22:37:00
বশিরুল ইসলাম: সাম্প্রতিককালে মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মোরা, সিডর, আইলার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যার প্রকোপ, মরুকরণ এসব আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিণামের কথা। এজন্য এসব বিষয় নিয়ে দ্রুত ভাবতে হবে। পৃথিবীকে আমরা আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তুলতে পারি। এই বার্তাকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে জাগিয়ে তুলতে হবে পরিবেশ সচেতনতা।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় পরিবেশের ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশে নিজস্ব যে ধারণক্ষমতা রয়েছে আমরা এর বেশি চাপ প্রয়োগ করার কারণে দিনে দিনে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দালানে দালানে পুরো নগর এখন ঠাসাঠাসি। আলো-বাতাস চলাচলের সব পথ বন্ধ।
ফলে পরিবেশের ক্ষতি হয়ে মানুষের মারাত্মক রোগ-ব্যাধি হচ্ছে ও অকালে মৃত্যুবরণ করছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, হিমপ্রবাহে বরফ গলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা পৃথিবীই এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯০০ সালের চেয়ে বর্তমানে ১২ গুণ বেশি কার্বন-ডাই-আক্সইড নিঃসরণ হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে শহরাঞ্চলের তাপমাত্রা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় অধিক বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শহরে তাপদ্বীপ সৃষ্টি করছে।
নগরায়ণের নামে আমরা বনাঞ্চল কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছি, যার ফলে পশুপাখির অভয়ারণ্য এই পৃথিবীর জায়গা ছোট হয়ে যাচ্ছে। বাসস্থান আর অন্যান্য কাজে ব্যবহারের ফলে বহু ফসলি জমি, গাছপালা হারিয়ে যাচ্ছে। যার পরিণাম আমরা ভেবে দেখি না। ফলে জীববৈচিত্র্য আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। প্রতিনিয়তই বিলুপ্ত হচ্ছে কোনো না কোনো প্রজাতি। কমছে মানুষের সুষ্ঠু জীবনধারনের সুযোগ-সুবিধা। গাছ লাগানো বা বাগানকরণের মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়ন সম্ভব।
আমরা গ্রামাঞ্চলে সাধারণত বিভিন্ন স্থানে বাগান করে থাকি। যেমন বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার পাশে, মাঠে ও অন্যান্য জায়গায়। কিন্তু শহর এলাকায় এই ধরনের বাগান করার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ছাদে বাগান করে এর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। বহির্বিশ্বেও মানুষ অনেক আগে থেকেই ছাদে বাগান করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে অপরিকল্পিতভাবে অল্প সংখ্যক ছাদ বাগান করা হলেও তা ব্যাপকতা লাভ করেনি। ছাদে বাগান করে শহরে গাছপালা প্রবর্ধনের মাধ্যমে জীবের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।
ছাদের বাগান বাতাসের গুণাগুণ উন্নয়ন করে, কারণ গাছপালা হচ্ছে পরিবেশের বিষাক্ত উপাদানের প্রাকৃতিক ছাঁকনি। গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারক উপাদান যেমন পার্টিকুলেট মেটার গাছের পাতায়, কাণ্ডে ও শাখায় লেগে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে সেচ ও বৃষ্টির পানির মাধ্যম মাটিতে চলে যায়, যার ফলে বায়ুর তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এছাড়া গাছপালা গ্রীষ্মকালে তাপ শোষণ ও শীতকালে তাপ বর্জন করে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এক গবেষণায় দেখা যায়, ছাদের বাগান বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ১.৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হ্রাস করতে পারে, যা শীতলীকরণ চাহিদার জন্য বিদ্যুত্ খরচ কমায় এবং ছাদ বাগানে ছাদের তাপমাত্রা ও ছাদ বাগানবিহীন ছাদের তাপমাত্রার পার্থক্য ৭.৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। ছাদে বাগান বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, শহুরে কৃষির সম্প্রসারণ তথা ফুল, ফল ও শাকসবজির চাহিদা পূরণ, আয়ের উত্স ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এটি সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা, গবেষণা এবং খাদ্য উত্পাদনের মাধ্যম শহুরে কৃষির একটি মডেল হতে পারে।
ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ বিশ্বের অন্যান্য মেগাসিটির তুলনায় অনেক বেশি। যার কারণ অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত নগরায়ণ ও যানবাহন, জলাধার ও গাছপালা  হ্রাস পাওয়া। এছাড়া বিল্ডিংয়ের তাপ বিকিরণ, অতিরিক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ, অপরিকল্পিত শিল্প স্থাপনা, উদ্বায়ী যৌগ বৃদ্ধির ফলে এই সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরও রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি, বাসাবাড়ি অফিসে এসি, কলকারখানা ও ইটভাটার। এর মাধ্যমে ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন (সিএফসি) গ্যাসেরও আধিক্য দেখা দিয়েছে। সিএফসি গ্যাস ওজোন স্তরকে ধ্বংস করে দেওয়ার পাশাপাশি বাতাস উত্তপ্ত করে তোলে। এ কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। এছাড়া পোশাক কারখানাগুলো থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে তোলে। ঢাকা শহরের গাছপালার পরিমাণ ১৯৮৯ সালে ছিল ২৭ শতাংশ, ১৯৯৯ সালে ১৬ শতাংশ আর ২০০৯ সালে মাত্র ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯  সালে  বেড়ে  হয়েছে  ২৪-৩০ ডিগ্রি সে.। ২০১৭ সালে বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে ঢাকা শহরে শ্যামলিমার এক ভয়াবহ ছবি দেখা যায়। যেখানে ঢাকা শহরে ৬০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে ফাঁকা ছাদ, যা শহরে তাপদ্বীপ প্রভাব সৃষ্টিতে অনেকাংশে দায়ী। তেহরানে পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, যদি শহরে সব ছাদে ছাদ বাগান করা হয় তবে তা তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে।
ঢাকা বিশ্বের অন্যতম একটি জনবহুল শহর হওয়া গাছ লাগানোর জায়গার অভাব রয়েছে। তাই ঢাকা শহরের বাড়ির ছাদ উপযুক্ত জায়গা যেখানে বাগানকরণের মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ বাতাস, বাস্তুসংস্থানের উন্নয়ন, খাদ্য, ওষুধের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা সম্ভব। পক্ষান্তরে ঢাকা শহরে ছাদে বাগান করার চর্চা কম; কারণ মানুষের সচেতনতার অভাব, সীমিত দক্ষতা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাব, বাগানের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্কের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা।
আমরা দিন দিন গাছপালা কেটে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছি। কিন্তু এই গাছের পরিবর্তে আর একটি নতুন গাছ আমরা লাগাই না। এই অনীহার কারণে আমরা প্রকৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধ্বংস করছি, তা কি আমরা জানি? গাছই আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং প্রকৃতির কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এখন আমরা প্রতিনিয়ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড উত্পাদন করছি, কিন্তু অক্সিজেন উত্পাদনের ক্ষেত্র ধ্বংস করছি। ভেবে দেখেছি কি, এর পরিণাম কী হবে?
ঢাকা শহরে ব্যাপকভাবে ছাদ বাগানের প্রসার করা যায়। তবে এটি কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য বায়ুদূষণকারী উপাদানের মাত্রা কমিয়ে শহরে তাপদ্বীপ প্রভাব ও পরিবেশ দূষণ কমাবে। এছাড়াও এর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। তাই আসুন, আমরা আমাদের পরিবেশকে বাঁচাই এবং নিজেদেরকেও বাঁচাই।

লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
mbashirpro1986@gmail.com