মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০৪:০৯

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

Published : 2017-06-06 22:37:00
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ: বর্জ্য পদার্থের আধুনিক ও নিরাপদ অপসারণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা বাংলাদেশের অন্যতম পরিবেশগত সমস্যা। রাজধানী ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা। এসব অবকাঠামোর জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বর্জ্য নিষ্কাশনের আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। ফলে অসংখ্য মানুষের বাসগৃহ থেকে প্রচুর পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য প্রতিদিন এখানে-সেখানে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। বর্তমানে রাজধানীতে কঠিন বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও সেকেলে। রাজধানী ঢাকার সকল বর্জ্য পদার্থকে রাস্তার পাশে এখানে-সেখানে স্তূপ করে রাখা হয় এবং তা পচে-গলে বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। বর্ষা মৌসুমে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ডাস্টবিন উপচে কঠিন বর্জ্য রাস্তার পার্শ্বস্থ ড্রেনে পড়ে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অচল করে দেয়। ঢাকায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি ক্রমশ জটিল রূপ ধারণ করছে। গাদাগাদি করে বসবাস করা অসংখ্য মানুষের বাসগৃহ থেকে বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য প্রতিনিয়ত এখানে-সেখানে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এছাড়া উন্মুক্ত স্থান থেকেও বিপুল পরিমাণ কঠিন ও তরল আবর্জনা প্রতিনিয়ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলছে। রান্নাঘরের পরিত্যক্ত আবর্জনা, হাটবাজারের পচনশীল শাকসবজি, কারখানার তৈলাক্ত পদার্থ, কসাইখানার রক্ত, ছাপাখানার রঙ, হাসপাতালের বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত না হওয়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয়ে উঠছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান সময়ে কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং আধুনিক জীবনযাপনে ব্যবহূত অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, প্যাকেটজাত খাবারের কৌটার ব্যবহার পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কঠিন ও তরল উভয় বর্জ্যের ক্ষেত্রেই রোগ বিস্তারকারী ব্যাকটেরিয়া ও বিষাক্ত ধাতব পদার্থসমূহ জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে চলেছে।
বাংলাদেশে কঠিন বর্জ্য পরিচালন ব্যবস্থা আজও মানুষের শ্রমনির্ভর। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ছোট-বড় শহরে এখনও মানুষ কঠিন ও আধা কঠিন আবর্জনা সংগ্রহ করে ডাস্টবিনে ফেলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বর্জ্যের তুলনায় ডাস্টবিনের সংখ্যাও কম। শুধু রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ ৩ হাজার টনের বেশি। মানুষের অজ্ঞতা ও অসাবধানতার কারণে ডাস্টবিনগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। ফলে বর্জ্য পদার্থ এখানে-সেখানে পড়ে থাকে, বাতাসসহ সার্বিক পরিবেশকে দূষিত করে। বর্ষা মৌসুমে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। কঠিন বর্জ্য পদার্থ রাস্তার পার্শ্বস্থ ড্রেনে পড়ে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাকে একেবারে অচল করে দেয়। এমনিতেই দেশের বেশির ভাগ স্থানে তরল বর্জ্য অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত স্যুয়ার এবং খোলা ড্রেন নেই। ফলে তরল আবর্জনা বা স্যুয়ারেজের নিরাপদ অপসারণ সম্ভব হয়ে ওঠে না। ড্রেন উপচে পড়া এবং রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তরল বর্জ্য পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি করে চলেছে। পানি ও বায়ুবাহিত নানা রোগ বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
একটি এলাকার কঠিন, আধা কঠিন ও তরল বর্জ্য আবর্জনাকে সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদ অপসারণ সুনিশ্চিত করাই হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা বর্জ্য পরিচালন (ধিংঃব সধহধমবসবহঃ)। বিভিন্ন উত্স থেকে উত্পন্ন আবর্জনা সংগ্রহ, স্থানান্তর, প্রক্রিয়াকরণ এবং চূড়ান্ত অপসারণ কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পাদন করাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য। আর বর্জ্য আবর্জনাকে সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করা হচ্ছে পরিবেশ সুরক্ষার অন্যতম প্রধান উপায়। এলাকার জনস্বাস্থ্য, কারিগরি এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সফল কার্যকারিতা নির্ভর করে। আঞ্চলিক পরিবেশ এবং এলাকার জনগণের প্রাত্যহিক জীবনযাপন পদ্ধতিও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করে তোলার বিকল্প নেই। যেকোনো এলাকায় কঠিন ও তরল বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হয়। কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের লক্ষ্যে প্রতিটি শহরে-বন্দরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাস্টবিন স্থাপন এবং হেভি-লোডার সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়ে। বর্জ্যকে নিরাপদ স্থানে অপসারণ করার জন্য শহরের দূরবর্তী কোনো স্থান নির্বাচন করে সেখানে বর্জ্যের স্বাস্থ্যসম্মত ট্রিটমেন্ট করা জরুরি। কঠিন বর্জ্যকে রিসাইক্লিং করার জন্য আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রকল্প হাতে নিতে হবে। তরল বর্জ্য যাতে পরিবেশ ঝুঁকির কারণ না হয় সেজন্য পর্যাপ্ত উন্নত ডিজাইনের স্যুয়ার ও উন্মুক্ত ড্রেন লাইন স্থাপনসহ স্যুয়ারেজ পরিশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।
পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমশক্তিকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। এমনিতে দেশের বেশির ভাগ স্থানে পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত স্যুয়ার এবং ড্রেন নেই। ফলে স্যুয়ারেজের নিরাপদ অপসারণ সম্ভব হয়ে ওঠে না। ড্রেন উপচিয়ে পড়া এবং রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তরল বর্জ্য প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য বিনষ্টের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরে খাল, নদীর মতো প্রাকৃতিক জলাধারগুলো শুকিয়ে গেছে অথবা অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। ফলে তরল বর্জ্যের অপসারণের স্বাভাবিক গতি সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের কঠিন বর্জ্যের চেয়ে তরল বর্জ্য অপসারণ বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও নাজুক। এখনও দেশের অনেক অঞ্চলে কোনো স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহারের ব্যবস্থা নেই। এসব জায়গায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে। গৃহস্থালি বর্জ্য নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তা ঘরবাড়ির আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটায়। এসব দূষিত তরল বর্জ্য কালক্রমে পুকুর, খাল অথবা নদীতে গিয়ে পড়ে এবং নদীদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে দূষিত ভূপৃষ্ঠস্থ পানির প্রভাবে সেখানকার ভূগর্ভস্থ পানিও ধীরে ধীরে দূষিত হতে থাকে। এসব পানি পান করে পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটে। শহরাঞ্চলের বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী বসবাসকারী এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে বসবাসকারী লক্ষ-কোটি মানুষের জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। রেললাইনের ধারে, বাস বা লঞ্চ টার্মিনালে, এমনকি ফুটপাতে স্থায়ীভাবে বাস করা মানুষেরা যেখানে রান্নাবান্না করে খায়, আশপাশেই মলমূত্র ত্যাগ করে। ফলে তা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। এসব ছিন্নমূল মানুষকে পুনর্বাসন করা ছাড়া সেখানকার পয়ঃনিষ্কাশন সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামের প্রতিটি অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিতকরণে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই। শহরে-বন্দরে সর্বত্র পর্যাপ্ত সংখ্যক সঠিক মাপের উন্মুক্ত ড্রেন ও ভূগর্ভস্থ স্যুয়ার নির্মাণ করতে হবে। ঘরবাড়িতে সেপটিক ট্যাঙ্ক ও হাউস ড্রেন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। এসব ড্রেনকে সঠিকভাবে মেইন স্যুয়ারের সঙ্গে সংযোগ দিতে হবে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য জনবল কাঠামো বিস্তৃত করতে হবে। বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি সহজে নিষ্কাশিত হওয়ার জন্য রাখতে হবে স্টর্ম-স্যুয়ার। কেন্দ্রীয়ভাবে পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ করে পরিশোধিত তরল বর্জ্য চূড়ান্ত অপসারণ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। দখল হয়ে যাওয়া নদী, খাল উদ্ধার করে তা পুনর্খননের ব্যবস্থা নিতে হবে। নদ-নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার আসল রূপ। কঠিন বর্জ্যকে রিসাইক্লিং করার জন্য আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রকল্প হাতে নিতে হবে। এসবের নিয়মিত মেরামত ও সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমশক্তিকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সক্রিয় রাখতে দেশের আপামর জনগণকে সচেতন করে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ব্যবহার করা যেতে পারে। পয়ঃনিষ্কাশনে জনগণের করণীয় সম্পর্কিত লিফলেট বিতরণ এবং নিয়মিত মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করলে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে পয়ঃনিষ্কাশন সংশ্লিষ্ট নতুন আইন প্রণয়ন করে তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথা ভাবা দরকার এবং পরিবেশ সুরক্ষায় আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কেননা আমাদের দেশে প্রচলিত আইন না মেনে চলার একটি প্রবণতা বরাবরই লক্ষ করা গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শহর, গ্রামকে পরিচ্ছন্ন, বসবাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব নগরীতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রত্যাশায় দেশবাসী।
লেখক : প্রকৌশলী