সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৬:৩৪

সরকারের ‘অতি গোপনীয়’ তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে!

Published : 2017-05-31 23:22:00
রবিউল ইসলাম: সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দেওয়া ‘অতি গোপনীয়’ বিভিন্ন তথ্য গোপন থাকছে না। সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এই গোপনীয়তা রক্ষা করছে না। এই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের চিঠি দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাসহ (এনএসআই) বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাকার্যে নিয়োজিত থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। রাষ্ট্রপরিচালনার বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বিষয়ে এসব গোয়েন্দা সংস্থা গোপনীয় প্রতিবেদন দিয়ে থাকে। মাঠ পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন দফতরের কর্মকাণ্ড নিয়েও এসব গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দিয়ে থাকে। কিন্তু ইদানীং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের সম্পর্কে দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য জেনে যাচ্ছেন। এমনকি মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া চিঠিতেও অনেক সময় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত সূত্র অথবা ছায়ালিপি প্রেরণ করা হয়। এতে করে মাঠ প্রশাসনে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে।
গত ১৫ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে যেকোনো গোয়েন্দা সংস্থার গোপনীয় প্রতিবেদন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করে যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণ করতে বলেছেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালকের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, গোপনীয় প্রতিবেদন সিলগালা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে এবং উক্ত তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারও কাছে যাতে প্রকাশিত না হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে গোপনীয়তা রক্ষিত হচ্ছে না।  
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা সকালের খবরকে বলেন, এরকম কিছু ঘটনা ঘটছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি জেলার মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে কিছু আপত্তিকর তথ্য দেওয়া হয়। এই তথ্যের বিষয়ে সেই কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়। তাতে গোয়েন্দা সংস্থার নাম উল্লেখ করা হয়। পরে সেই কর্মকর্তা ওই জেলার সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন এবং দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়, যা মাঠ প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া অনেক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে চিঠি চালাচালি ও গুরুত্ব না দেওয়ায় তা সংশ্লিষ্টরাও জেনে যাচ্ছেন। এমনকি যাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেওয়া হয়, তারাও জেনে যাচ্ছেন। এই নিয়ে অনেকে গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।
সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদেনের গুরুত্ব বুঝে কয়েক কর্মকর্তার বিষয়টি জানার কথা। কিন্তু অনেকেই এসব তথ্য জেনে যাচ্ছেন।
জনপ্রশাসনের আরেক কর্মকর্তা একটি উদাহরণ দেন এই প্রতিবেদকের কাছে। তিনি জানান, জনপ্রশাসন যুগ্ম সচিব পদে চাকরি করেন আবদুল মালেক (ছদ্মনাম)। পদোন্নতির জন্য নিজের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন আগেই ঠিক করে রেখেছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনও যাতে তার অনুকূলে আসে তার জন্য আগে থেকেই খোঁজ নিচ্ছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজনের সঙ্গেই যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু তাতে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। তার নামে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তাতে পদোন্নতি হবে না। এই প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জেনে গেছেন মালেক। তিনি গোয়েন্দা সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করেছেন। বিষয়টি সেদিনই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। তার বিরুদ্ধে ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান। অথচ এই গোয়েন্দা প্রতিবেদন জনপ্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ২-৩ কর্মকর্তা ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়। এভাবেই সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার অনেক গোপন প্রতিবেদন প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে।

আরও খবর