রবিবার ২১ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৬:১৩

তামাকের ব্যবহার উন্নয়নের পথে বাধা

Published : 2017-05-30 22:11:00
আজ ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের ন্যায় বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে পালিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় Tobacco-A Threat to Development অর্থাত্ তামাক উন্নয়য়ের পথে হুমকিস্বরূপ। তামাকের ব্যবহারে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ছাড়াও আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে বিধায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি প্রতিহত করা ছাড়াও আর্থসামাজিক অবস্থা ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। তামাক উত্পাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভেঙে কৃষি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব। তামাকের উত্পাদনে কীটনাশক ও সার ব্যবহার করার ফলে পানি বিষাক্ত হয় ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তামাকের উত্পাদনে ৪.৩ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রয়োজন হয়, যার ফলে বিশ্বে প্রতি বছর ২ হতে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বনায়ন সঙ্কুচিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকে বলতে গেলে তামাকের কারণে ক্যানসার, হার্টের বিভিন্ন রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট ও পায়ে পচন এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক, জর্দা ও সাদাপাতা ব্যবহারের ফলে খাদ্যনালীতে ক্যানসারসহ নানা শারীরিক জটিলতা সম্পর্কে এখন আর কারও অজানা নয়। বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার সম্পর্কে বলতে গেলে এখানে ধূমপায়ীর হার ৪৩ শতাংশ। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী মহিলার হার ২৮ শতাংশ এবং পুরুষ ২৬ শতাংশ।  সিগারেট ব্যবহারকারী পুরুষ ৪৫ শতাংশ এবং মহিলা ১.৫ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকের কারণে প্রায় এক লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ৩ থেকে ৪ লাখ লোক তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে অসুখ ও অক্ষমতাজনিত কুফল ভোগ করে।
বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে তামাকের কারণে প্রতি বছর ৬০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে ৬ লাখ পরোক্ষ ধূমপানের কারণে মৃত্যুবরণ করে। তামাকের ব্যবহার অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি বছর এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৮০ লাখ, যার ৮০ শতাংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তামাকে ৫০টির বেশি পদার্থ ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এসব কারণে তামাকের ব্যবহার প্রতিরোধ করা জরুরি। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এবারে প্রতিপাদ্য বিষয় তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী প্রচারণা এবং প্রমোশনাল কার্যক্রম বন্ধ করে একটি রোগমুক্ত সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে গিয়ে প্রায় সময় অভাবের মধ্যে দিন যাপন করতে হয়। গরিব ধূমপায়ীর আয়ের অংশ তামাকের ব্যবহারে খরচ করার কারণে খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। পাশাপাশি তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ থাকে বিধায় চিকিত্সা খরচ তাদের জন্য একটি বাড়তি বোঝা এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণে পরিবারের আয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। যেহেতু তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একক কৌশল পুরোপুরি কার্যকর নহে, তাই সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বেশি হারে কর আরোপের বিষয়টিও কার্যকর রাখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তামাকের ওপর ১০ শতাংশ করারোপ করা হলে উন্নত দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ৪ শতাংশ হ্রাস পায়। অপরদিকে মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার হ্রাস প্রায় ৮ শতাংশ। অতএব তামাকের ওপর বেশি হারে করারোপ করা গেলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেশি উপকৃত হবে, যা পরবর্তী সময়ে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হবে।
তামাক কোম্পানিগুলো বেশ কৌশলী। তারা জনগণের শুভাকাঙ্ক্ষী রূপ ধারণ করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, হেলথ ক্যাম্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। এসব কর্মসূচির আসল উদ্দেশ্য হল তামাকের বাজার ও বিক্রয় বাড়ানো। সচিত্র সতর্কবাণী ও কর আরোপের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর এসব কর্মসূচি প্রতিহত করা গেলে তামাকবিরোধী আন্দোলন সুফল বয়ে আনবে।
তামাকবিরোধী কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে। সরকারের কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনও সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এদেশে তামাকবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হল ২০০৫ সালে প্রণীত আইনের সংশোধনী, যা ২০১৩ সালের এপ্রিলে হয়েছে এবং সংশোধনীর পর ২০১৫ সালে বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সংশোধনী আইনে জরিমানার হার ৫০ থেকে বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা, ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পদার্থ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় আনা, সিগারেটের প্যাকেটে সতর্কবাণী ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রাখাসহ নানা কল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং এসব গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলসহ (NTCC) বিভিন্ন ধূমপানবিরোধী সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন গবেষণা, সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রকাশনা ও তামাক ও তামাকজাত পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও আইনের বাস্তবায়নসহ জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের বিবিধ কাজ উল্লেখযোগ্য।
আইনের আওতায় যেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ : পাবলিক প্লেসসমূহ : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিশুপার্ক, সরকারি অফিস, আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত অফিস, বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবন, আদালত, বিমানবন্দর ভবন, সমুদ্রবন্দর ভবন, নৌবন্দর ভবন, রেলওয়ে স্টেশন ভবন, বাস টার্মিনাল ভবন, ফেরি, প্রেক্ষাগৃহ, আচ্ছাদিত প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণি ভবন, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য কোনো স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা সময় সময় ঘোষিত অন্য যেকোনো বা সকল স্থান। পাবলিক পরিবহন : মোটরগাড়ি, বাস, রেলগাড়ি, ট্রাম, জাহাজ, লঞ্চ, যান্ত্রিক সকল প্রকার জনযানবাহন, উড়োজাহাজ এবং সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্দিষ্টকৃত বা ঘোষিত যেকোনো যান। সকলে সক্রিয় হলে আইনের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে।
তামাক ও ধূমপান বর্জনের উপকারিতা অনেক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, যারা তিরিশ বছর বয়সের আগেই ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে পারে তারা ধূমপানের কারণে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। মোট কথা, একজন ধূমপায়ী যত বেশি ধূমপান করুক, ধূমপানের কারণে স্বাস্থ্যে এর যতই প্রতিক্রিয়া ঘটুক এবং তার যতই বয়স হোক না কেন, ধূমপান বর্জন করার ফলে তার স্বাস্থ্য ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিসমূহ অনেকাংশে কমে আসবে। অর্থত্ বয়সের যেকোনো পর্যায়ে ধূমপান বর্জন করলে এর উপকারিতা পাওয়া যায়। (তথ্যসূত্র : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা/বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস-১৯৯৯)। ধূমপান বর্জন করার ফলে স্বাস্থ্যের উন্নতি, খাবারের রুচি বৃদ্ধি, উন্নত ঘ্রাণশক্তি, অর্থ অপচয় রোধ, অধিকতর আত্মবিশ্বাস এবং পরিষ্কার শ্বাস-প্রশ্বাস ইত্যাদি উপকারিতা লাভ করতে পারেন। ধূমপান বন্ধের ফলে পিতা-মাতাগণ তাদের সন্তানদের জন্য ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। এছাড়া নিজের ধূমপানের কারণে অন্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে বিরত থাকা যায়। ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায় এবং তামাকের যে আসক্তি তা থেকে মুক্ত থাকা যায়।
তামাক বর্জনের অর্থনৈতিক সুফলও কম নয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন ঝুঁকি ছাড়াও তামাক অর্থনীতিতে বিরাট অপচয় ঘটায়। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার একটি বিরাট প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। ধূমপান বর্জনের ফলে যেমন সিগারেট ক্রয়ের খরচটি বেঁচে গেলে তা দিয়ে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা, শিক্ষার খরচসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হয়।
পরিবেশের দিক থেকে বিবেচনায় তামাকমুক্ত সমাজ স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ। উন্নত, স্বাস্থ্য ও সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে তামাকমুক্ত সমাজ গড়া প্রয়োজন। ১৯৯৮ সালে টঝ ঝঁত্মবড়হ বেহবত্ধষ’ং জবঢ়ড়ত্ঃ এ বলা হয় যে, সিগারেট এবং তামাকের বিভিন্ন ব্যবহার আসক্তি সৃষ্টি করে। শারীরিক ও ব্যবহারগত আচরণ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তামাক আসক্তি হেরোইন এবং কোকেন আসক্তির মতোই। হেরোইন এবং কোকেনের মতোই তামাকের নিকোটিন মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। মনোক্রিয়াশীল মাদকের মান নির্ণয় করে দেখা গেছে যে হেরোইন, কোকেন, অ্যালকোহল, কেফিন এবং গাঁজার চেয়ে নিকোটিনের প্রভাব অনেক বেশি। মানবদেহে নিকোটিন প্রধানত উত্তেজক হিসেবে ক্রিয়াশীল থাকে। নিকোটিন ব্যবহারের চরম ফলাফল হিসেবে দেখা যায় এতে হূত্স্পন্দন বেড়ে যায়, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালীর সঙ্কোচন ঘটে। নিকোটিন ব্যবহারের ফলে রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার দরুন অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং রক্তে চর্বিযুক্ত অ্যাসিড, গোকোস এবং অন্যান্য হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ধমনি শক্ত হয়ে যায় এবং রক্ত জমাট বেঁধে উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের উপসর্গ দেখা দেয়। নিকোটিনের সবচেয়ে মারাত্মক ফলাফল হল এর ওপর উবঢ়বহফবহপু অর্থাত্ নির্ভরশীল হয়ে পড়া। একবার কেউ ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে দৈহিক ও মানসিকভাবে এ বদঅভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে।  
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ধূমপান গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যগত ক্ষতিসাধন করে। মায়ের ধূমপান গর্ভাবস্থায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে শিশুর গড়পড়তা ওজন ২০০ গ্রাম কমে যেতে পারে এবং কম ওজনের শিশু জম্মদানের ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দেয়। তাছাড়া গবেষণায় আরও দেখা যায়, মায়ের ধূমপানের ফলে উচ্চ হারে ভ্রূণ ও সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যু ঘটে। ধূমপানের ফলে  ঝঁফফবহ ওহভধহঃ উবধঃয ঝুহফত্ড়সব-ঝউঝ অর্থাত্ হঠাত্ শিশু মৃত্যুর লক্ষণের সম্ভাবনা দেখা যায়। শিশু জম্মানোর পর তার চার পাশে মা-বাবার নিয়মিত ধূমপান শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাস তন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে। তামাক বর্জনের উপকারিতার মধ্যে রয়েছে : হাত ও পায়ের তাপমাত্রা বেড়ে স্বাভাবিক হবে। রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে। হদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে এবং রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়। ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ৩০ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফুসফুসের কাজের ক্ষমতা স্বাভাবিক হয়। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ায় ঝুঁকি কমে আসবে। শরীরের কয়েকটি অঙ্গ যেমন-মূত্রথলি, বৃক্ক এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায়।
কীভাবে তামাক বর্জন করবেন-অনেক ধূমপায়ী আছেন, যাদের তামাক বর্জনে সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। তামাক নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্য বিধায় এটা ছাড়তে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। তামাক ও তামাকজাতীয় দ্রব্য বর্জনের ব্যাপারে চিকিত্সক বা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করুন। তবে নিজের সদিচ্ছা, মানসিক শক্তি এবং দৃঢ়তার মাধ্যমে তামাক বর্জন করা যায়-১. নিজেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নিজের ইচ্ছাশক্তিকে দৃঢ় করুন, ইচ্ছাশক্তি বাড়ান এবং তামাকজাত দ্রব্য ছাড়ার জন্য একটি তারিখ ঠিক করুন। মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যেকোনো সময় তামাক ছাড়া যায়। ক্যালেন্ডারে একটি তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে রাখুন এবং সে দিন-ক্ষণ থেকে বর্জন শুরু করুন; ২. পাারিপার্শ্বিক পরিবেশ যেমন বাড়ি, অফিস এবং গাড়িতে কোনো প্রকার তামাকজাত দ্রব্য রাখা যাবে না। তামাক গ্রহণকারী ব্যক্তিদের আশপাশে না যাওয়া ভালো; ৩. প্রেরণা ও সহযোগিতা যেমন আপনার পরিবার-পরিজন, বন্ধু এবং সহকর্মীদের বলুন তারা যেন প্রতিনিয়ত তামাক ও তামাকজাতীয় দ্রব্য ছাড়ার ব্যাপারে আপনাকে উত্সাহিত করেন; ৪. গ্রুপভিত্তিক পদক্ষেপ-তামাক ছাড়ার ব্যাপারে দলগত পদক্ষেপ অনেক কার্যকর। এক্ষেত্রে গ্রুপভিত্তিক কার্যক্রম উত্সাহ ও প্রেরণা জোগায়; ৫. প্রয়োজনে ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ  নিতে হবে; ৬. নতুন নতুন কৌশল-ধূমপানের ইচ্ছা হলে সে সময় মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নিতে হবে। কারও সঙ্গে কথা বলা, হাঁটা, চলাফেরার মাধ্যমে এটা সম্ভব; ৭. তামাক বর্জনের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমানোর জন্য ব্যায়াম করা, খেলাধুলা করা, বই পড়া এবং নামাজ, দোয়া, ধ্যান এবং ধর্মীয় কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করুন। এতে মানসিক অস্থিরতা কমে আসবে এবং তামাক ও ধূমপান বর্জনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে; ৮. প্রচুর পানি ও বিশুদ্ধ তরল খাবার গ্রহণ করুন; ৯. প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তামাক বর্জনের প্রথম কিছুদিন বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন- মাথাব্যথা, বিষণ্নতা, ক্লান্তি, হতাশা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিরক্তি, ঘুম না আসা, ক্ষুধামন্দা, অস্থিরতা ইত্যাদি। তবে এ সমস্যাগুলো দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করে এবং ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে তামাক ও ধূমপান বর্জন করে সুস্থ-সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করা যায়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ এ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অন্যান্য বিষয়সহ স্বাস্থ্য খাতকে সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ২০৪০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ থেকে তামাক শতভাগ নির্মূল করার আশা ব্যক্ত করা হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে তামাকের ব্যবহার বন্ধ করা গেলে তামাকমুক্ত সমাজ গড়ার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণ জরুরি।
লেখক : নির্বাহী সচিব, আধূনিক (আমরা ধূমপান নিবারণ করি)