মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর, ২০১৭, সন্ধ্যা ০৭:৫৬

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আরও সাত লাখ দরিদ্র মানুষ

Published : 2017-05-19 23:24:00,
শাহ্জাহান সাজু: গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্জিত গতিশীলতা ধরে রাখতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা আরও বাড়ছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীর আওতায় আরও প্রায় ৭ লাখ দরিদ্রকে আনা হচ্ছে। বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারী, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বেদে, দরিদ্র মা ও কর্মজীবী মায়েদের মাসিক ভাতার পরিমাণ ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে দুটি উত্সব ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইজড ও জন্মগত হূদরোগী, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নসহ প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা বৃত্তির আওতা বাড়ানো হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আসছে বাজেটে এসব খাতে উপকারভোগীদের টাকার পরিমাণও বাড়ছে। ক্ষেত্রভেদে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বাড়ছে। বাজেটে উপকারভোগীর সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানী ভাতার পাশাপাশি বছরে দুটি উত্সব ভাতা পাবেন। এটি চলতি অর্থবছর থেকেই কার্যকর করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, এখন প্রায় ৬০ লাখ দরিদ্র লোককে জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আগামী বাজেটে এই সংখ্যা ৭ লাখ বাড়ানো হচ্ছে। বয়স্ক, বিধবা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন খাতে দরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাভোগী হবে ৬৭ লাখ। এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন ভাতাসহ নগদ অর্থ দেওয়ার সুবিধা দেবে আগামী বাজেটে। ভিজিডি ভাতাভোগীদের সঞ্চয়ের জন্য অর্থ দেওয়া হবে।
জানা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ২ লাখ অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাকে ভাতার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এজন্য চলতি বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। তবে দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি উত্সব ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্মানী ভাতার পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধারা ১০ হাজার করে বছরে দুটি উত্সব ভাতা পাবেন। এটি চলতি অর্থবছর থেকেই চালু করা হবে।
জানা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতার সুবিধা ভোগ করছেন ৩১ লাখ ৫০ হাজার জন। আসন্ন বাজেটে বয়স্ক ভাতা সুবিধাভোগীর সংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫ লাখে। একই সঙ্গে বাজেটে বয়স্ক ভাতার পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে জনপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে বয়স্ক ভাতার সুবিধা পাচ্ছেন। আগামী বাজেটে এর পরিমাণ ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হচ্ছে। বর্তমানে ১১ লাখ ৫০ হাজার বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এ সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার বাড়ানো হচ্ছে। অর্থাত্ বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা উপকারভোগীর সংখ্যা হবে ১২ লাখ ৬৫ হাজার। বর্তমানে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীরা মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছেন। আগামী অর্থবছরে এ ভাতার পরিমাণ ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হচ্ছে। দেশের অসচ্ছল প্রতিবন্ধী উপকারভোগীর সংখ্যা ১০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সাড়ে ৭ লাখ অসচ্ছল প্রতিবন্ধী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় রয়েছেন। এটি ৭৫ হাজার বাড়িয়ে ৮ লাখ ২৫ হাজার করা হচ্ছে। অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতাও ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির হার প্রাথমিক স্তরে ৫০০ টাকা, মাধ্যমিক স্তরে ৬০০, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৭০০ এবং উচ্চ স্তরে ১ হাজার ২০০ টাকাই রাখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে উপকারভোগীর সংখ্যা ৭০ হাজারের স্থলে ৮০ হাজার করা হচ্ছে। দেশের অবহেলিত হিজড়াদের (তৃতীয় লিঙ্গ) জীবনমান উন্নয়নে ৬ হাজার ৯৭০ থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার ৫৫০ জন করা হচ্ছে। হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিশেষ ভাতা বা বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরে বৃত্তি বা ভাতা বাড়ানোর জন্য বিদ্যমান বাজেটের বরাদ্দ ৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ কোটি ৩৫ লাখ করা হচ্ছে। বেদে ও অনগ্রসর শ্রেণির মাসিক ভাতা ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। ভাতা বাড়ার পাশাপাশি এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে এ খাতে ২০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৭ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
ক্যানসার, কিডনি ও লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্তদের আর্থিক কর্মসূচির বরাদ্দ ৫০ কোটি টাকা হচ্ছে। বর্তমানে এটি ৩০ কোটি টাকা রয়েছে। জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা সাহায্য পাবেন। চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে আসন্ন বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে না। এটি ১৫ কোটি টাকা-ই রাখা হচ্ছে। তবে খাদ্য সহায়তা দ্রব্য দেওয়ার পরিবর্তে উপকারভোগীদের সরাসরি জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা নগদ দেওয়া হবে।
দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃকালীন ভাতা ২০০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে আগামী বাজেটে। এটি ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপকারভোগীর সংখ্যা ৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ করা হচ্ছে। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মায়েদের মাসিক ভাতার পরিমাণ ২০০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ করা হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে ভিজিডি কার্যক্রমের ভাতা সংখ্যা পরিবর্তন হচ্ছে না। অর্থাত্ চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বাজেটেও এ সংখ্যা ১০ লাখ থাকবে। তবে জনপ্রতি মাসিক ৩০ কেজি চালের সঙ্গে প্রত্যেক উপকারভোগীকে ২০০ টাকা করে সঞ্চয়ের জন্য দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় উপকারভোগীদের একটি স্বচ্ছ, পূর্ণাঙ্গ এবং কার্যকর অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগও থাকছে। এজন্য উপকারভোগীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনডিআই) ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে প্রথমে একটি সুষ্ঠু তালিকা প্রণয়ন করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগীদের সহায়তা প্রদানে স্বচ্ছতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও খবর