বুধবার ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৭:১৭

সেন্টমার্টিনে অবৈধ সব স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

Published : 2017-03-17 00:37:00
মনতোষ বেদজ্ঞ, কক্সবাজার: প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে নির্মিত এবং নির্মাণাধীন আবাসিক হোটেলসহ সব অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের পক্ষে পর্যটন সেলের সহকারী কমিশনার এহেছানুল মুরাদ টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, টেকনাফ সহকারী কমিশনার (ভূমি), টেকনাফ থানার ওসি, পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে এ নির্দেশনা দেন।
লিখিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষায় কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক ইব্রাহিম খলিল মামুনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে একজন প্রতিনিধিসহ চার সরকারি কর্মকর্তাকে। জানা যায়, উপকূলীয় ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে পরিবেশ অধিদফতর
১৯৯৫ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুসারে (গেজেট প্রকাশ ২৯ জুন, ১৯৯৯) সঙ্কটাপন্ন ওই এলাকায় সরকারি অনুমোদন ব্যতীত সব ধরনের ভৌত নির্মাণকাজ, নির্মাণকাজে পাথর ও প্রবাল শিলার ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দায়ের করা এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে দ্বীপে পাকা স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ এবং নির্মিত সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। নির্দেশনা মতে, সেন্টমার্টিনে ছোট কিংবা বড় কোনো স্থাপনাই নির্মাণের সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও সেখানে গড়ে উঠছে একের পর এক স্থাপনা।
এরই মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) নামে কক্সবাজারের স্থানীয় একটি পরিবেশবাদী সংগঠন সেন্টমার্টিনের হোটেল-রিসোর্টের ওপর একটি জরিপ করে। সে জরিপে নির্মাণাধীনসহ ১০৬টি হোটেল-রিসোর্টের বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়। তারা কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে একটি আবেদন জমা দেয়। আবেদনে তারা জানায়, আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সেন্টমার্টিন প্রতিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে উঠছে হোটেল-মোটেলসহ নানা স্থাপনা। বেসরকারি স্থাপনার পাশাপাশি চলছে সরকারি স্থাপনার কাজ।
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির প্রধান নির্বাহী এম ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, সরেজমিন পরিদর্শন করে সেন্টমার্টিন দ্বীপের নির্মিত এবং নির্মাণাধীন আবাসিক হোটেলের একটি তালিকা সংযুক্ত করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে যে আবেদন জমা দিয়েছিলাম সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য এক জনপ্রতিনিধিসহ চার সরকারি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, তালিকাটি আমলে নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন করলে প্রতিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকা সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন বলেন, সেন্টমার্টিন নিয়ে আদালতের যে নির্দেশনা রয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি।
২০০৮ সালে পরিবেশ অধিদফতরের করা এক জরিপ অনুসারে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও সামুদ্রিক এলাকায় জীববৈচিত্র্য বিশ্বের মধ্যে বিরল। দ্বীপটিতে ১৫৪ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির স্থলজ গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল (১৯ প্রজাতির জীবাশ্ম, ৩৬ প্রজাতির শক্ত ও ১৩ প্রজাতির নরম প্রবাল), ১৯১ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১০ প্রজাতির কাঁকড়া, ছয় প্রজাতির প্রজাপতি, ২৩৪ প্রজাতির মাছ (৮৯ প্রজাতির মাছ প্রবালসংলগ্ন এলাকার), চার প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। দ্বীপে ৭৭ প্রজাতির স্থানীয় পাখি, ৩৩ প্রজাতির পাখিসহ মোট ১১০ প্রজাতির পাখি ও ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এছাড়া রয়েছে চুনাপাথর, জীবাশ্মযুক্ত বেলে পাথর, চুনাযুক্ত বেলে পাথর, খোলসযুক্ত চুনা পাথর, বালুচর ও ঝিনুক পাহাড়। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে স্পঞ্জ, পাথরী কাঁকড়া, সন্ন্যাসী কাঁকড়া, শঙ্খ শামুক, লবস্টার চিংড়ি ও ঝিনুক দেখা যায় এতে। দ্বীপে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ দেখা যায়। এর মধ্যে অ্যাঞ্জেল, সজারু, রাঙ্গা কৈ, সুই, প্রজাপতি, সারজন, রাস, বাইন, ভোল, লাল, নাক কোরাল, প্যারট ও উড়ুক্কু মাছ উল্লেখযোগ্য। গ্রিন ও অলিভ টার্টল প্রজাতির কাছিম প্রজননের অন্যতম স্থান সেন্টমার্টিন।