বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ১০:০৫

অপরাধের আখড়া রেইন ট্রি হোটেল

Published : 2017-05-14 23:32:00
নিজস্ব প্রতিবেদক: আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার হোসেনের ছেলে সাফাত ছিল রেইন ট্রি হোটেলের চেয়ারম্যান ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুণের ছেলে মিহিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা একসঙ্গে পড়াশোনাও করেছে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। মিহির হোটেলের মহাব্যবস্থাপক হওয়ার সুবাদে প্রায়ই মিহিরের মাধ্যমে সাফাত বিভিন্ন অপকর্মের আস্তানা বানিয়েছিল রেইন ট্রি হোটেলকে। গত ৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে হোটেলটি উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু তার আগেই ২৮ মার্চ রুম দুটি বুকিং দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, উদ্বোধনের আগে থেকেই সেখানে চলত মদ, বিয়ার ও জুয়ার আসর। আনাগোনা ছিল সুন্দরী তরুণীদেরও। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব কারণে আন্তর্জাতিকমানের ওই হোটেলটি হয়ে ওঠে অপরাধের আখড়া।
এদিকে রেইন ট্রি হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনার পরই সমালোচনার ঝড় ওঠে দেশব্যাপী। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছে, হোটেলটিতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ছিল। ঘটনার পর তারা সব সরিয়ে ফেলেছে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ফুটেজগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।  
অপরদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে গত শনিবার ওই হোটেলটিতে অভিযান চালানোর পর সেখানে মদ বা কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য নেই বলে জানায় অভিযানে থাকা কর্মকর্তারা। গতকাল আকস্মিক অভিযান চালিয়ে হোটেল থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, বিয়ার ও মানি লন্ডারিং এবং কালোবাজারির অস্তিত্ব পায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা।    
অভিযান শেষে গতকাল দুপুরে শুল্ক গোয়েন্দার যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে অপারেশন্স কাজ শুরু করেছে দ্য রেইন ট্রি হোটেল। কিন্তু হোটেলটি ভ্যাট দেওয়া শুরু করে মার্চ থেকে। ফেব্রুয়ারি মাসের আট লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে রেইন ট্রি।
তিনি বলেন, বিদেশি মদ, ড্রিঙ্কস, লিকার ও বিয়ার এই হোটেলে পাওয়া গেছে। জব্দকৃত পণ্যগুলো আমদানিযোগ্য। কিন্তু তারা সরাসরি আমদানি করেনি। সঠিকভাবে ভ্যাট দিয়ে তারা আমদানি করেনি। অন্য কারও কাছ থেকে অথবা অন্য মাধ্যমে তারা ভ্যাট ছাড়া ক্রয় করেছে। আমদানির ক্ষেত্রে এলসি করতে হয়। কিন্তু তাদের এলসির কোনো ডকুমেন্ট আমরা পাইনি। আপাতত এসব স্মাগলিংয়ের পণ্য বলে প্রতীয়মান। এজন্য রেইন ট্রি হোটেলের বিরুদ্ধে তিনটি আইনে তিনটি মামলা হচ্ছে। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে-মানি লন্ডারিং, কালোবাজারি এবং শুল্ক ফাঁকি।
মোহাম্মদ শফিউর রহমান আরও বলেন, আমরা কিছু ডকুমেন্ট জব্দ করেছি। তাতে দেখা গেছে, এখানে তারা প্রচুর পরিমাণ বিয়ার বিক্রি করে। কিন্তু তাদের কোনো বার নেই। বারের ডিক্লেয়ার নেই। কোনো পণ্য বিক্রি করতে হলে রাজস্ব কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। পণ্যের মূল্য তালিকা তৈরি করতে হবে এবং তা নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে পারবে। ফেব্রুয়ারি মাসে শুধু আট লাখ টাকা ভ্যাট তারা ফাঁকি দিয়েছে। হিসাব করলে আরও বেশি হবে। প্রাথমিকভাবে এসব ডকুমেন্ট সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। এসব ডকুমেন্ট আমরা পরীক্ষা করে দেখব।
এখানে অ্যাভিয়েন ব্র্যান্ডের সফট ড্রিঙ্কস ৫০০ মিলি ৩০০ টাকায় বিক্রি করছে তারা। এগুলো ফ্রান্স থেকে আসে। এসব আমদানি ছাড়া দেশে আসার সুযোগ নেই। কিন্তু তারা আমদানির কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। কারা এসব তাদের সাপ্লাই করছে, যারা সাপ্লাই করছে তারা সঠিক নিয়মে আমদানি করছে কি না তা আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখব।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, দেশে ব্যবসা করতে হলে ভ্যাটের আওতায় থাকতে হবে। যেহেতু তারা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে সে জন্য তাদের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা হবে।
যেসব পণ্য এখানে পাওয়া গেছে সেসব আমদানিযোগ্য। কিন্তু তারা চোরাচালানের মাধ্যমে এখানে এলসি ছাড়া নিয়ে এসেছে। বিকল্প পথে ক্রয় করায় তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে।
হোটেল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার দাবি করেছে, হোটেলে কোনো মদ বিক্রি হয় না, বার নেই, বারের লাইসেন্স নেই-এমন প্রশ্নের উত্তরে মোহাম্মদ শফিউর রহমান বলেন, আমরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করব। তারা কী ধরনের ডকুমেন্ট পেয়েছে তা শুনব। এরপর বার না থাকা সত্ত্বেও মদ বিক্রির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল দুপুরে হোটেলটিতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। কিন্তু কোনো মাদক না পেলেও গুলশান জোনের পরিদর্শক জানান, মদ মেলেনি তবে অভিযোগ থাকায় নজরদারি অব্যাহত থাকবে। এরপর গতকাল আকস্মিক অভিযান চালায় কাস্টম, শুল্ক গোয়েন্দা ও র্যাব-১ সদস্যরা।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে রেইন ট্রি হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে তাদের মধ্যে একজন আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার হোসেনের ছেলে সাফাত আহমেদ।

আরও খবর