মঙ্গলবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, রাত ১০:২৮

বিশ্ব পরিবার দিবস: পরিবার মানুষের প্রথম শিক্ষালয়

Published : 2017-05-14 22:26:00, Updated : 2017-05-15 09:41:32, Count : 319
মোহাম্মদ আবু নোমান: পরিবার মানবসমাজের মৌল ভিত্তি। পারিবারিক জীবন বিবর্জিত মানবসভ্যতা কল্পনা করা যায় না। প্রত্যেক মানুষের জন্য পারিবারিক জীবন তার অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি ইত্যাদি পারিবারিক সুস্থতা ও দৃঢ়তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভরশীল। যদি পারিবারিক জীবন অসুস্থ ও নড়বড়ে হয়, তাতে ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দেয়। তাহলে সমাজ জীবনে নানা অশান্তি ও উপদ্রব সৃষ্টি হতে বাধ্য। পরিবারই হচ্ছে কল্যাণকর সমাজের ভিত্তি। সুতরাং আদর্শ সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত আদর্শ পরিবার গঠন।
পাশ্চাত্ত্য সমাজ বস্তুবাদের প্রভাবে পরিবার প্রথাকে উপেক্ষা করছে। ফলে বন্ধনহীন, আদর-স্নেহ, মায়া-মমতাবঞ্চিত শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী তথা আপামর জনতা অবৈধ যৌনাচারসহ নানাবিধ অন্যায়-অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। ডিএনএ টেস্ট করে সন্তানের পিতা শনাক্ত করতে হচ্ছে। পাশ্চাত্ত্যের মতো এ অবস্থা আমাদের দেশে এখনও হয়নি সব ধর্মের ধর্মীয় অনুশাসন ও পারিবারিক প্রথার কারণে। কিন্তু কিছু দেশি-বিদেশি এনজিও, এজেন্ট পাশ্চাত্ত্য অবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে ধর্ম ও পরিবার প্রথাকে ভেঙে দেওয়ার জন্য গোপনে ও প্রকাশ্যে কাজ করে যাচ্ছে বহুদিন ধরে। আর এ কাজে সহায়তা করছে কিছু প্রচার মাধ্যম ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী।
পরিবারকে বলা হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। রাষ্ট্রের সামাজিক উন্নয়নে পরিবারের ভূমিকা ও দায়িত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারই একজন মানুষের সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন কিছু নিয়মনীতি আছে, তেমনি পারিবারিকও একটি সংবিধান থাকা দরকার। যেমন পরিবারের সবার সঙ্গে সদ্ভাব গড়ে তোলা, সাংসারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মিথ্যে না বলা, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘরে ফেরা, নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করা, মানবিক মূল্যবোধগুলোর চর্চার মাধ্যমে অন্তরকে বিকশিত করা প্রভৃতি।
আধুনিক সমাজে পরস্পরের মিল-মহব্বত সংবলিত যৌথ পরিবার ও পূর্বেকার সেই মানবিক বন্ধনের রূপটি ক্রমশ হারিয়ে গিয়ে বাড়ছে একক পরিবার। পরিবার মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। কাজের প্রয়োজনে হোক আর ইচ্ছে করেই হোক, মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে পারিবারিক শিক্ষা এবং আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। সেই পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পৃথিবীব্যাপী ১৫ মে পালিত হয় আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস।
প্রতিটি শিশুর শিক্ষা-দীক্ষার প্রথম বিদ্যাপীঠ পরিবার। শিশুরা সামাজিক আচার-আচরণ, পরিবারের সবার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, হাসি-আনন্দ, দুঃখ ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে দৃঢ় মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার গুণাবলি শিখে থাকে। যে কারণে পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রতিটি মা-বাবাই সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, সন্তানদেরও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শেখান। দেখা যায়, যে সকল পরিবার সন্তানের প্রতি উদাসীন, যারা সন্তানের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না, তাদের অধিকাংশ যুবক-যুবতী ও সন্তানরা উচ্ছৃঙ্খল, অনৈতিক জীবনযাপন করাসহ সমাজে নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ‘ধনী শ্রেণি’ ও ‘দরিদ্র বস্তিবাসী’। ধনী শ্রেণি বৈধ-অবৈধ পন্থায় টাকা রোজগার এবং ভোগ-বিলাসেই মত্ত থাকে বেশির ভাগ সময়। সন্তানের চাহিবামাত্র টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড়, দামি মোবাইল, গাড়ি ইত্যাদি কিনে দিয়েই খালাস। অন্ধ স্নেহে সন্তানের কোনো ভুলত্রুটি মা-বাবার চোখে ধরা পড়ে না। অভিভাবকগণ এসব ব্যাপারে আগের মতো সচেতন নন, তারা কেবল অর্থের পেছনে ছুটছেন। সন্তানকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাই একমাত্র বা প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।
পরিবার এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে ভবিষ্যত্ জীবনের পথনির্দেশনা গড়ে ওঠে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে পরিবারবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। তাই সমাজ সৃষ্টিতে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মা-বাবা, ভাই-বোন, শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে বসবাস করছে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ। একজনের সুখে অন্যজনও সুখী, একজনের দুঃখে কাঁদছে অন্যজন। নিবিড় বন্ধন রয়েছে পরিবারের মধ্যে। একে অপরকে নানাভাবে সাহায্য করে। পরিবারের মধ্যে এই যে বন্ধন, যা আমাদের দেশে খুবই নিবিড়। শহর আর গ্রামের চিত্রটা একটু এদিক-ওদিক হলেও ভালোবাসার বন্ধন কিন্তু সব পরিবারেই অটুট। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী সবার সঙ্গে সবার আত্মার সম্পর্ক। পরিবারে একজন অসুস্থ হলে উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে সবাই। খুশির খবরে সবাই খুশি। এই তো আমাদের পরিবার।
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, দাদা-দাদি নিয়েই আমাদের পরিবার। মানুষ যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে বাস করার কারণেই হয়তো পরিবারের সংজ্ঞা এভাবে করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। শুধু মা-বাবা আর সন্তান মিলেই হচ্ছে পরিবার। অথচ সমাজ জীবনে বৃহত্তর বা যৌথ পরিবারের ভূমিকা ব্যাপক।
সন্তানের সঙ্গে গ্যাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। অতিরিক্ত স্নেহ, মাত্রাতিরিক্ত বকাঝকা, মান-অভিমান না করে সন্তান কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে অর্থাত্ বন্ধু সার্কেল কেমন এর খোঁজখবর রাখা। ইদানীং বন্ধুরাই বেশি ক্ষতি করে থাকে, এর ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। পোশাক-আশাক, চিন্তা-চেতনায় যেন ইসলামী সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হয় সে বিষয়ে সবিশেষ লক্ষ রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার অবশ্য কর্তব্য। সন্তানের জীবন গঠনের কোনো পর্যায়ে বাবা-মায়ের দায়িত্বে অবহেলার কারণে যদি সে পথচ্যুত হয়ে যায় তাহলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই মা-বাবাকে এর দায়িত্ব বহন করতে হবে।
বিশেষ করে বর্তমানে স্যাটেলাইটের যুগে অপসংস্কৃতির সয়লাবে আমাদের পারিবারিক জীবন হুমকির মুখে পতিত। স্যাটেলাইটে প্রদর্শিত উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা আমাদের সমাজ জীবনকে কলুষিত করে তুলছে। আমাদের পোশাক-আশাকেও এসেছে উলঙ্গপনার ছাপ। ভ্যালেন্টাইন ডে, বয়ফ্রেন্ড ও গার্লফ্রেন্ডের সংস্কৃতি এখন আমাদের দেশেও চালু হতে শুরু করেছে। আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে পরিবার থেকেই সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, সত্যবাদিতা, পরস্পরের শ্রদ্ধাবোধ, আদব-কায়দা তথা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
আমরা যদি পরিবারকে বৃৃহত্ অর্থে বিবেচনা করি, তাহলে পৃথিবী একটা পরিবার। যে পরিবারের একজন সদস্য আমাদের বাংলাদেশ। বিশ্ব পরিবারকেও আমাদের প্রয়োজন হবে। সব পরিবারের পারস্পরিক সহযোগিতায়ই আমরা পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে পারব।
আজ আমরা শুধু উপার্জনমুখী বিদ্যা শিখতে আগ্রহী বেশি। মানবতামুখী বিদ্যা শিখতে আমাদের কোনো তত্পরতাই লক্ষ করা যায় না। আন্তর্জাতিক পরিবার দিবসে বিশ্বের প্রতিটি পরিবারের বন্ধন দৃঢ় হোক এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সকল পরিবার সুখী হোক, সেই প্রত্যাশাই কামনা।
লেখক : শিক্ষক
abunoman72@ymail.com