সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, বিকাল ০৪:৩৩

মা যাদের দৃষ্টির অন্তরালে কেমন তাদের মা দিবস?

Published : 2017-05-14 17:49:00, Updated : 2017-05-14 18:05:26
শারীফ অনির্বাণ : ‘মা কথাটি ছোট অতি কিন্তু যেন ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই’। হ্যাঁ! মা কথাটি লিখতে কিংবা উচ্চারণ করতে যতটুকু সময় লাগে তার চেয়ে কোটি গুণ বেশি আদরের-ভালোবাসার নাম এটি।

বিশ্ব মা দিবস আজ। প্রতিবছর মে মাসের ২য় রোববারকে বিশ্বব্যাপী মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি অনুযায়ী মায়েদেরকে নিয়ে নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঘটা করে পালিত হয় দিবসটি।

বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বগ্রামের সদস্য হিসেবে তাই বাংলাদেশেও দিবসটির ছোঁয়া লাগতে দেখা যায়। শহর, নগর কিংবা মফস্বলে সন্তানেরা তাদের মায়ের জন্য বিশেষভাবে এই দিনটি পালন করে থাকে। মায়ের জন্য বিভিন্ন রঙের-ঢঙের সারপ্রাইজ দেয়া থেকে শুরু করে সারাটা দিন মা কে খুশি করার জন্য সন্তানদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা লেগে যায় বিশেষ এই দিনটিকে ঘিরে। কিন্তু ‘মা’ নামের এই আবদার কিংবা আশ্রয়ের জায়গাটি যাদের দৃষ্টি সীমানার অনেক দূরে কেমন কাটে তাদের মা দিবস? এই নিয়ে কথা হয়েছিলো কয়েকজনের সাথে।

মাহমুদা ফারজানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়ালেখার তাগিদেই গ্রাম ছাড়তে হয়েছে বেশ ক’বছর হলো। তারও ঢের আগে যখন বয়স সবে ১৬’র কোটায়, তখন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরজনমে পাড়ি জমান মা। তার পর থেকে বলতে গেলে মা ছাড়াই বড় হচ্ছে সে। তাই ‘মা দিবস’ তার কাছে বিশেষ কোন অর্থবোধক নয়।

মা ছাড়া পৃথিবীটা কেমন জানতে চাইলে ফারজানা জানান, ‘ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে সব কিছুই হয়তো স্বাভাবিকভাবেই চলে প্রতিনিয়ত। তবে পারিপার্শ্বিক ব্যস্ততার চাপে মনটা যখন ক্লান্ত-বিষন্ন থাকে, যখন খুব ইচ্ছে করে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিক, কেউ বলুক আমার মেয়ে, তখন মায়ের কথা মনে পড়ে ভীষণ কষ্ট হয়।

সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন কাউকে তার মায়ের সাথে কথা বলতে দেখি। ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে তখন। কাউকে বলতে পারিনা। চলতে পথে কোন সমস্যায় পড়লে মাকে সবচে বেশি মিস করি, মা থাকলে হয়তো তার সাথে শেয়ার করতে পারতাম, স্বান্তনা পেতাম, সমাধান খুঁজে দেওয়ার একটা মানুষ থাকতো। কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসছিলো তার।

চোখের পানি লুকিয়ে শেষ কথাটি বললেন ফারজানা, ‘আসলে মা না থাকা মানে আদর করার মানুষটা নাই, এর থেকে তীব্রতর কষ্টের কোন কিছু সন্তানের জন্য আর হতে পারেনা’।

নিরব হাসান। ২৫ বছর বয়সী শারিরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যুবক। মা দিবস উপলক্ষে কি পরিকল্পনা জানতে চাইলে জানালেন, ‘মাকে হারিয়েছি অনেকদিন হয়ে গেল। মা দিবস কবে তাই মনে রাখার দরকার পড়েনা। মা যখন ছিল তখন ছায়াসঙ্গী ছিল মা। জন্ম থেকেই আমার একটা হাত ও একটা পা অকেজো হওয়ায় সমাজের প্রতিটি জায়গায় ছিলাম অবহেলিত।

সবাই যেখানে আমাকে করুণার চোখে দেখতে সেখানে মায়ের কাছে ঠিক ই আমি রাজপুত্তুর ছিলাম। আমার জামা-কাপড় পড়া থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়া, স্কুলে পাঠানো সকল কাজেই আদর-যত্মের অভাব ছিলনা আমার। সকল কাজে মা ছিল আমার একমাত্র অবলম্বন। কোন কোন রাতে বাসায় ফিরতে দেরি হলে মা না ঘুমিয়ে খাবার সাজিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করত। তারপর একদিন আমার মায়া ত্যাগ করে হুট করেই মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

যদিও বর্তমানে আমার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে, কিন্তু তারপরেও মা তো মা ই। তার অভাব কি আর কেউ পূরণ করতে পারে? সত্যি বলতে কি মা ছিল আমার ছায়া। এখন মাকে হারিয়ে হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে কিন্তু আমার প্রতি মানুষের স্বার্থ কিংবা করুণার মাঝে মায়ের সেই নি:স্বার্থ ভালোবাসা খুঁজে ফিরি সারাক্ষণ-প্রতিনিয়ত’।

গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে কাজ করেন কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। পড়ালেখার তাগিদেই অনেক বছর আগে গ্রাম ছাড়তে হয়েছে, মায়ের আঁচল ছাড়তে হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার উদারতায় যদিও মা এখনও জিবিত আছেন কিন্তু সে তো দৃষ্টি সীমানার অনেক দূরে। প্রযুক্তির কল্যাণে হয়তো মুঠোফোনযোগে কথা হয় তার সাথে।

কিন্তু প্রাত্যহিক ব্যস্ততার মাঝে মনখুলে কথা বলা কিংবা খোঁজখবর করা সম্ভব হয়না সব সময়। কিন্তু যতই কাজের মধ্যে থাকি মায়ের জন্য শূণ্যতা তো ঠিক ই অনুভূত হয়। বিশেষ করে যখন বাসায় ভালো কিছু রান্না হয়, কিংবা কোন কিছু নিয়ে ভীষণ মন খারাপ থাকে অথবা অসুস্থ হলে তখন মায়ের কথা সবচে বেশি মনে পড়ে। ছোটবেলায় আমার প্রতি মায়ের অসম্ভব সব ত্যাগের কথা মনে পড়ে ভেতরটা কেমন হুঁ হুঁ করে উঠে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। একটু পরেই হয়তো অনেকেই ভুলে যাবে মা দিবসের কথা। কিন্তু রুবেল হয়তো এত সহজে ভুলতে পারবেনা মা না থাকার কষ্টের কথা। ৩০ বছর বয়সী রুবেল রিক্সার নগরীতে একজন দক্ষ রিক্সাচালক। প্রতিদিন তার রিক্সায় কত শত মায়েরা ওঠে, কিন্তু নিজের মাকেই শুধু রিক্সায় চড়ানো হয়না তার।

কয়েক বছর হলো তার মা দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু বিদায় নিলেই কি আর একেবারে ছুটি পাওয়া যায়? কাজের মাঝে সর্বক্ষণ মনে পড়ে মায়ের কথা। সকাল বেলা ঘুমা থেকে উঠে খাবার খাইয়ে দেয়া, বাড়ির সকল কাজ সেরে আবার দুপুরবেলা সময়মত খাবার সামনে দেয়া, খেলতে গিয়ে গ্রামের পুকুরে কাঁদা মাটিতে একাকার হয়ে এসে মায়ের আদরভরা চোখ রাঙানির পরে যত্ন করে গোসল করিয়ে দেয়া; ভীষণ আনমনা করে দেয় রুবেলকে। অভাবের কারণে মায়ের জন্য অনেক কিছুই করা হয়নি সেই দু:খে চোখ ভিজে আসে তার।

মা দিবস নিয়ে অনুভূতি জানতে চাইলে রিক্সাচালক রুবেল আক্ষেপ নিয়ে জানায়, ‘মায়ের প্রতি ভালোবাসার জন্য কি আর দিবস লাগে? মা যে কি অমূল্য সম্পদ, যাদের মা বেঁচে আছে তাদের অনেকেই হয়তো এখন ঠিকমত বুঝতে পারেননা।

খবরে শোনা যায়, সন্তানের হাতে মায়ের মৃত্যু কিংবা বউ এর হাতে নির্যাতিত মা, সন্তান নিশ্চুপ। তখন ভীষণ অসহ্য লাগে, মায়ের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

অন্যকে খুশি করার জন্য আমরা কত কি ই তো করি কিন্তু মায়ের জন্য কি আমাদের একটুও সময় হয়না? একটুও কি দরদ-মায়া জাগেনা? তাদের জন্য কি আমরা ভালো কিছু করতে পারিনা? আমাদের বিবেক কি জাগ্রত হতে পারে না একটি বারের জন্যও?