সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০২:৪১

আড়াই দশক ধরে জঙ্গি বিস্তার: বদলেছে সমর্থনের ভিত্তি

Published : 2017-05-13 23:39:00
লায়েকুজ্জামান: ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম সংক্ষেপে হুজি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিল মাওলানা রউফ, মুফতি হান্নানসহ কয়েকশ’ আফগান-ফেরত মুজাহিদ। এটিই বাংলাদেশের প্রথম ইসলামী জঙ্গি সংগঠন।
বর্তমানে যে জঙ্গিবাদ তার শেকড় প্রোথিত হয়েছিল আশির দশকে। ওই দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে অনেকে যায়। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এরাই সংগঠিত হয় হুজি নাম দিয়ে। সংগঠনের একটি কার্যালয় ভাড়া নেয় আগারগাঁও তালতলা এলাকায়। হুজি আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে যাত্রা শুরু। তারপর প্রায় আড়াই দশক ধরে দেশে চলছে জঙ্গি বিস্তার।
ক্যাডার চরিত্রে বদল : হুজির সমর্থনের ভিত্তি ছিল কওমি মাদ্রাসা। বাংলাদেশি যেসব ছাত্র ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করতে গিয়েছিল তাদের একটি বড় অংশকে নানা কৌশলে উচ্চ শিক্ষার কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানের করাচি মাদ্রাসায়। সেখান থেকে রিক্রুট করা হয় আফগান যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে এরা দেশ থেকে যাদের আফগান যুদ্ধে নিয়ে যায় তাদের প্রায় সকলেই ছিল কওমি মাদ্রাসার ছাত্র। ১৯৯৮ সালে গোপালগঞ্জে শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা পেতে রাখার ঘটনার সঙ্গে জড়িত মুফতি হান্নান, মাওলানা রউফ, মাওলানা কামালউদ্দিনসহ সকলেই ছিল কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় ধীরে ধীরে ক্যাডারদের শ্রেণি চরিত্রের বদল ঘটছে। কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের জায়গায় দেখা যাচ্ছে সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংরেজি মাধ্যমসহ বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা আধুনিক অনেক যুবক জঙ্গি সংগঠনের ক্যাডার হয়ে উঠছে। আগের দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জায়গায় আসতে থাকে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানরা।
২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় অংশ নেওয়া রোহান ইমতিয়াজ ছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বাবা ধনাঢ্য মানুষ আওয়ামী লীগের নেতা। মা সরকারি কলেজের শিক্ষিকা। স্কলাসটিকা থেকে পাস করা মোবাশ্বেরের বাবা উচ্চ পর্যায়ের চাকরিজীবী, মা কলেজ শিক্ষিকা। ঢাকার ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে পাস করা নিবরাস ইসলাম পড়ত মালয়েশিয়ায়, তার আগে পড়ত ঢাকার নর্থ-সাউথে।
২৫ জুলাই কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গি শেওজাদ রউফ অর্ক ছিল মার্কিন নাগরিক। পারিবারিকভাবে উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান অর্কের দাদা ব্রিগেডিয়ার রউফ একসময় ছিলেন সেনা গোয়েন্দাপ্রধান। এখানে নিহত আকিফুজ্জামান ছিল ঢাকার টার্কিশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র। সে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গর্ভনর মোনায়েম খানের নাতি।
২০১৬ সালের ৮ জুন কানাডার পত্রিকা ন্যাশনাল পোস্ট তামিম চৌধুরীর জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশে চলে আসে তামিম, নিহত হয় নারায়ণগঞ্জের ডেরায়। তার আগে নিউইয়র্ক টাইমস তিন বাংলাদেশির জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরা হল তামিম চৌধুরী, জাপান প্রবাসী সাইফুল্লাহ ওজাকি ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী তাজউদ্দিন কাওসার। এদের মধ্যে ওজাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কাওসার কম্পিউটারবিজ্ঞানী। ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে জঙ্গিদের আত্মঘাতী দলের সদস্য আয়াত আল হাসান উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান। এভাবে দেখা যাচ্ছে দিনে দিনে বদলে যাচ্ছে জঙ্গিদের সমর্থনের ভিত্তি।
ঘোষিত ১৪ জঙ্গি সংগঠন : ১৯৯২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে ১৪টি জঙ্গি সংগঠন প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এর মধ্যে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামই (হুজি) মূলত বাংলাদেশের প্রথম আত্মপ্রকাশিত জঙ্গি সংগঠন। ১৯৯৩ সালের ৬ মে যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেয় ইসলামী সমাজ নামের একটি সংগঠন। ১৯৯৪ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়ার এক গ্রামে বসে গঠন করা হয় হিযবুত তাওহীদ। ১৯৯৮ সালে হুজি থেকে বের হয়ে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি গঠন করে শায়ক আবদুর রহমান। ১৯৯৮ সালেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক ছাত্র রফিকুল ইসলাম বাংলাভাই গঠন করে জেএমজেবি। আদর্শগত দিক থেকে বাংলাভাই ও শায়ক আবদুর রহমান ছিল কাছাকাছি। এরা যৌথভাবে ২০০৪ সালে একযোগে দেশের ৬৩ জেলায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের কথা জানান দেয়। ২০০১ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে হিযবুত তাহরীরের।  ২০০৭ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৮ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম বাংলাদেশ (হুজি-বি) রাজনৈতিক দল ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (আইডিপি) তৈরি করে। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে ছাত্রশিবিরের সাবেক সদস্যদের মাধ্যমে শহীদ হামজা ব্রিগেড গঠিত হয়। ২০১৩ সালে মুজাহিদ অব বাংলাদেশ তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ জিহাদি গ্রুপ নামে আলাদা একটি গ্রুপের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০১৫ সালে জুনুদ আল তৌহিদ আল খলিফা নামে আরেকটি গ্রুপ যাত্রা শুরু করে। ২০১৫ সালে ইত্তেহাদুল মুজাহিদীন নামের আরেকটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
নিষিদ্ধ ৭টি সংগঠন : ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় শাহাদাত-ই-আল হিকমা, ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ করা হয় বাংলাভাইয়ের জেএমজেবি, ২০০৫ সালের ২২ অক্টোবর হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম (হুজি), ২০০৯ সালে হিযবুত তাহরীর, ২০১৫ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, সর্বশেষ নব্য জেএমবিকে নিষিদ্ধ করা হয় চলতি বছর।
কালো তালিকাভুক্ত ৯টি : ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কালো তালিকাভুক্ত করে ৭টি ও ২০১৩ সালে কালো তালিকাভুক্ত করে ২টি সংগঠনকে। সংগঠনগুলো হচ্ছে-তামির-উদ-দীন বাংলাদেশ, আল্লাহর দল, হিজবুত তাহরীর, ইসলামী সমাজ, ওলেমা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনাত, ইসলামিক গণতন্ত্র দল, তওহিদ ট্রাস্ট, শাহাদাত-ই-নবুয়ত ও আল মারকাজুল আল ইসলাম।
এখনও সক্রিয় ৩০টি সংগঠন : সরকার জঙ্গি সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে তাদের কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করলেও দেখা যায় কারাগারে বসে জঙ্গি নেতারা পরিচালনা করছে তাদের সংগঠন। তাদের সংগঠনেও যোগ হচ্ছে নতুন কর্মী।
এখনও সক্রিয় সংগঠনগুলোর মধ্যে আছে মুজাহিদ অব বাংলাদেশ, কালো তালিকাভুক্ত ইসলামী সমাজ, দাওয়াতে ইসলাম, ওলামা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনাত, ইসলাম ও মুসলিম, হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশ, আল হায়াত আল ইসলামিয়া, জামায়াতুল ফালাইয়া, তাওহিদী জনতা, বিশ্ব ইসলামী ফ্রন্ট, জুম্মাতুল আল সাদাত, শাহাদাত-ই-নবুয়ত, জামায়াত-ই-ইয়াহিয়া আল তুরাত, জইশে মোস্তফা বাংলাদেশ, আল জিহাদ বাংলাদেশ, ওয়ারাত ইসলামিক ফ্রন্ট, জামায়াত-আল-সাদাত, আনসার রাজশাহী, আল খিদমত, হরকত-এ ইসলাম আল জিহাদ, মুসলিম মিল্লাত শরিয়া কাউন্সিল, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট ফর জিহাদ, জইশে মোহাম্মদ, আল ইসলাম মার্টায়ারস ব্রিগেড, লস্কর-ই-তৈয়্যবা, হিযবুল্লাহ ইসলামী সমাজ, হরকাতুল মুজাহিদীন, নুসরাতুল মুসলেমিন, ইসলামী জিহাদ আন্দোলন বাংলাদেশ ও ইসলামী ছাত্রশিবির, কতল বাহিনী, শহীদ নাসিরুল্লাহ খান আরাফাত ব্রিগেড, ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, তামির-উদ-দীন বাংলাদেশ, তাওহিদ ট্রাস্ট।
আন্তর্জাতিক যে সংগঠনগুলোকে অনুসরণ করে জঙ্গিরা : এদেশের জঙ্গিরা ১৪টি আন্তর্জাতিক সংগঠনকে অনুসরণ করে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের স্বীকারোক্তিতে এ তথ্য জানা গেছে।
এসব সংগঠন হচ্ছে-পাকিস্তানের লস্করই তাইবা, হরকত উল মুজাহিদ, জম্মু ও কাশ্মীর স্বাধীনতা ফ্রন্ট, জয়শে মুহাম্মদ, জয়শে মোস্তফা, ভারতের কাশ্মীরভিত্তিক আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্স, তাহরিক-ই-জাভেদ-ইসলামী কাশ্মীর, হরকতুল জিহাদুল ইসলামী, হিজবুত-উল-মুজাহেদিন, হেজবি ইসলামী, জামাত-উল-মুজাহেদিন, হরকত-উল-আনসার এবং বর্তমান দুনিয়ায় আলোচিত আইএস।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আবদুর রশিদের কাছে জানতে চাওয়া হয় জঙ্গিদের সমর্থনের ভিত্তি বদলের বিষয়ে। তিনি বলেন, যদিও প্রচার হচ্ছে সমাজের উচ্চবিত্তের শিক্ষিত ঘরের সন্তানরা জঙ্গিবাদে ব্যাপক হারে যোগ দিচ্ছে। এটা ঠিক তবে যতটা বলা হচ্ছে ততটা নয়। তিনি বলেন, মুফতি হান্নানের হুজি গঠিত হয়েছিল মাদ্রাসাকেন্দ্রিক এবং তাদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের জঙ্গি স্টাইলে সংগঠন দাঁড় করানো। এখনও হুজির সমর্থনের ভিত্তি মাদ্রাসাতেই রয়ে গেছে। তিনি বলেন, সমাজের উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকদের টার্গেট করে গড়ে তোলা হয়েছে দুটি সংগঠন। এ দুটি হল-হিযবুত তাহরীর ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। তাদের লক্ষ্য ছিল এমনকি বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল। সেজন্য তারা বরখাস্তকৃত মেজর জিয়াকেও দলে নেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মাসুদুর রহমান বলেন, দেশে কার্যক্রম চালানো জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যা ত্রিশ কি না তা এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে জঙ্গি সংগঠন আছে, তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। তিনি বলেন, এটা ঠিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সমর্থনের ভিত্তি বদলেছে। তারা আগের ধারণা থেকেও সরে এসেছে।
১১ মাসে ১৩ জঙ্গি আস্তানায় অভিযান, নিহত ৬৬ : ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১৩ মে পর্যন্ত ১১ মাসে ১৩টি জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত ৬৬ জঙ্গির মধ্যে গুলশানের হলি আর্টিজানে ৫ জন, কল্যাণপুরে ৯, নারায়ণগঞ্জে ৩, রূপনগরে ১, আজিমপুরে ১, একই দিনে গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় পৃথক অভিযানে ১২, আশকোনার অভিযানে নারী ও শিশুসহ ৩, সীতাকুণ্ডে অভিযানে শিশুসহ ৫, সিলেটের আতিয়া মহলে ৪, মৌলভীবাজারে পৃথক অভিযানে ৪ শিশু ও ১ বৃদ্ধসহ ৯ জন নিহত হয়। র্যাবের প্রস্তাবিত সদর দফতরে আত্মঘাতী হামলা চালাতে গিয়ে ১ জন ও বিমানবন্দর পুলিশ চেকপোস্টের সামনে এক জঙ্গি মারা গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ আস্তানা থেকে ৪ জঙ্গির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঝিনাইদহে ৩ জন আর সর্বশেষ ১১ মে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৫ জন। এ ছাড়া তল্লাশি বা চেকপোস্টেও সন্দেহভাজন জঙ্গি মারা গেছে।
হলি আর্টিজান থেকে সিলেটের শিববাড়ী পর্যন্ত অভিযানে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে র্যাব ও পুলিশের ৭ সদস্য। ১১ মে রাজশাহীতে মারা যায় এক ফায়ার সার্ভিস কর্মী। এসব ঘটনায় র্যাব, পুলিশসহ আহত হয় শতাধিক।

আরও খবর