মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ১২:১১

শিক্ষাকে চিরন্তনের বিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

Published : 2017-03-16 10:08:00
বাহালুল মজনুন চুন্নু: শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে হল মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানের আলোয় প্রজ্বলিত করে, মানব আচরণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটায়। শিক্ষার আবেদন মানবিক এবং পার্থিব। শিক্ষা একদিকে মানুষের মাঝে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়, আবার অন্যদিকে তাদের দক্ষ মানবসম্পদেও পরিণত করে। শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত না হলে নাগরিকদের মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার স্ফুরণ ঘটে না।
শিক্ষা নাগরিকদের বাস্তববাদী, যুক্তিবাদী এবং অধিকার ও কর্তব্যসচেতন হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষ সত্যকে উপলব্ধি, ধারণ ও লালন করতে পারে। সক্রেটিস বলেছেন, শিক্ষা হল মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের বিকাশ। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শিক্ষার মিলন প্রবন্ধে বলেছেন, ‘সত্যকে চাই অন্তরে উপলব্ধি করতে এবং সত্যকে চাই বাহিরে প্রকাশ করতে—কোনো সুবিধার জন্য নয়, সম্মানের জন্য নয়, মানুষের আত্মাকে তার প্রচ্ছন্নতা থেকে মুক্তি দেবার জন্য। মানুষের সেই প্রকাশতত্ত্বটি আমাদের শিক্ষার মাধ্যমে প্রচার করতে হবে, কর্মের মধ্যে প্রচলিত করতে হবে, তাহলেই সকল মানুষকে সম্মান করে আমরা সম্মানিত হবো—নবযুগের উদ্বোধন করে আমরা জরামুক্ত হব।’ একটি জাতির উন্নতির মূলে রয়েছে সামষ্টিক শিক্ষার বিকাশ। শিক্ষা তাই বিনিয়োগ, শিক্ষা তাই মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ছাব্বিশ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সংবিধানেই শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধানের পনের ও সতের নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। সতের নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র একই পদ্ধতির সার্বজনীন ও গণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জাতির পিতা জানতেন বাঙালির উন্নতির জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই তিনি নাগরিকদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক, সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করার বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সরকারের ওপর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেছিলেন। বিক্ষুব্ধ-ঝঞ্ঝাময় উত্তাল সময় পাড়ি দিতে দিতে, আন্দোলন-সংগ্রাম ও জেল-জুলুম সহ্য করতে করতে সঞ্চারিত যে অভিজ্ঞতা, তার উত্তাপে দাঁড়িয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মাণ করেছেন ত্রিকালিক বিভূতি। মানুষের জীবনাবেগকে নবতর মাত্রায় স্পন্দিত করে সঞ্চার করেছেন অভিনতুন সংবেদনা। কাল অতিক্রমী দৃষ্টির অধিকারী তিনি বাঙালি জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করেই কেবল ক্ষান্ত হননি, তা টেকসইকরণের জন্য শিক্ষা বিস্তারে নিয়েছিলেন নানা পদক্ষেপ।
তিনি শিক্ষাকে ব্যষ্টিকভাবে না দেখে দেখেছেন সামষ্টিকভাবে। আর তাই শিক্ষাকে চিরন্তনের বিন্দুতে স্থাপনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতেও কার্পণ্য করেননি। শিক্ষার প্রতি তাঁর যে দরদ তা পাকিস্তানিদের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন, শরীফ শিক্ষা কমিশনসহ শিক্ষার অধিকার হরণকারী প্রতিটি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তেজোদীপ্ত প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে। শিক্ষার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে দেশের মানুষ বেশি শিক্ষিত, সে দেশ আর্থসামাজিক দিক দিয়ে বেশি শক্তিশালী; এটা পারিসংখ্যানিকভাবেই কেবল নয়, হাতে-কলমেও প্রমাণিত। শিক্ষা যে সর্বোত্কৃষ্ট বিনিয়োগ তা তথ্য প্রমাণ দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ থিয়োডর শুলজ। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছেন। এ বিষয়ে সত্তরের নির্বাচনী ভাষণে জাতির পিতা যে বক্তব্য দেন তা স্মরণযোগ্য। তিনি সেদিন বজ্রনিনাদ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উত্কৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার পরিসংখ্যান ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা আশি ভাগ অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতি বছর দশ লাখেরও অধিক লোক নিরক্ষর থেকে যাচ্ছে। জাতির অর্ধেকের বেশি শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শতকরা মাত্র আঠারোজন বালক ও ছয়জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উত্পাদনের শতকরা কমপক্ষে চার ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুল, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে।’ তাঁর এ ভাষ্য থেকেই বোঝা যায়, তিনি শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন, জাতীয় মুক্তি ও উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর অন্যতম উপায় হিসেবে তিনি জনগণের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি মানুষের শৃঙ্খল-মুক্তির উপায় খুঁজে পেয়েছেন শিক্ষার মাঝেই।
ফরাসি দার্শনিক জঁ জ্যাক রুশো তাঁর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (সামাজিক চুক্তি) বইতে বলেছিলেন, মানুষের জন্ম হয় মুক্ত হয়ে, কিন্তু জন্মের পরই দেখে তার চারদিকে বাঁধার শেকল। এই শেকলই হচ্ছে শোষণের অন্যতম হাতিয়ার, সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমাজের মানুষের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর সেদিনের ভাষণে শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি রাজনীতির কবি, তাই তাঁর রাজনৈতিক কাব্যের পরিসীমায় ব্যষ্টিক মানুষ থেকে শুরু করে মানবগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের কল্যাণ ছিল অন্তর্ভুক্ত; এবং তিনি উপলব্ধি করেছেন এই কল্যাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে শিক্ষা। এক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল তাঁর বই পড়ার অভ্যাস। তিনি বিশ্বাস করতেন বই মানুষের চেতনাকে শানিত করে। ছাত্রাবস্থায় এমনকি জেলে বসে তাঁর একান্ত ও বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল বই। তাঁর জ্ঞানার্জনের আগ্রহ ছিল বিস্তৃত। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বার্নার্ড শ, কার্ল মার্কস, কেনেডি, মাও সে তুং, চার্চিল, বার্ট্রান্ড রাসেলসহ নানা মনীষীর বই এবং বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের বইসহ নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ বই পড়ে তিনি তাঁর জ্ঞানার্জনের আগ্রহ চরিতার্থ করতেন। জ্ঞানপিপাসু জ্ঞানতাপস বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের কীভাবে জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত করে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখার পাঁয়তারা করেছিল, কীভাবে সুকৌশলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনছিল। সাতচল্লিশ সালে পূর্ববাংলায় যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ২৯৬৬৩টি, সেখানে আটষট্টি সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছিল ২৮৩০৮টি। মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ছিল প্রকট বৈষম্য।
তদুপরি মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে দেশের শতকরা ষাট ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এজন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরপরই শিক্ষার উন্নয়নে যুগপত্ভাবে নানামুখী দুঃসাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের সর্বত্র ছিল নানাবিধ সঙ্কট। অভাব আর হাহাকারের ভারি বাতাসে মানুষ যখন হাঁসফাঁস করছিল, তখন জাতির পিতা দেশে ফিরে হাল ধরলেন দক্ষ নাবিকের মতো। চারিদিকে বইয়ে দিলেন শান্তির সুবাতাস। নিদারুণ সঙ্কট থেকে মুক্তির জন্য ব্যাপকভিত্তিক প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। সেই উদ্যোগের মাঝে শিক্ষা খাত ছিল অগ্রবর্তী। বিধ্বস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের জন্য বাহাত্তরের ২০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে একান্ন কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী। বাহাত্তরের ১২ ফেব্রুয়ারিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম বাংলার ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে তিন কোটি বাহাত্তর লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয় শিক্ষা খাতে।
গণশিক্ষার প্রসারে অর্থাত্ নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু বরাদ্দ করেছিলেন আড়াই কোটি টাকা। তিনি এক ভাষণে গণশিক্ষা নিয়ে বলেছেন, গণশিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়, সম্ভব নয় সমাজতন্ত্রের বাস্তবায়ন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি, যা ছিল নারীশিক্ষা অগ্রযাত্রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জাতির পিতা যথাযথভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, শিক্ষার প্রাথমিক স্তরের ভিত যদি মজবুত করা না যায় তাহলে দেশে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি হবে না, দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে বই, খাতা, পেনসিল, দুধ, ছাতু, বিস্কুট বিতরণ কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন। তবে তাঁর দুঃসাহসী ও চ্যালেঞ্জিং পদক্ষেপ ছিল ৩৬১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা। সেটা তিনি বেশ সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে মজবুত করে তুলবে। এজন্য তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে দেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
উচ্চশিক্ষার প্রসারের জন্য তাঁর নির্দেশে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা মুক্তবুদ্ধির চর্চার পথকে সুগম করেছিল। সেই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা, দর্শন এবং শিক্ষার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি প্রতিবিম্বিত হয়েছে তাঁর নির্দেশে প্রণীত কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ড. মুহাম্মদ কুদরাত-ই-খুদাকে সভাপতি করে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। সেই কমিটিকে বঙ্গবন্ধু তাঁর শিক্ষাসংক্রান্ত ধ্যান-ধারণার কথা জানিয়েছিলেন, নির্দেশনা দিয়েছিলেন। যা অনুসরণ করে কমিশন ১৯৭৩ সালের ৮ জুন অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট এবং ১৯৭৪ সালের ৩০ মে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেন। কমিশন দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট প্রণয়ন করেছিল। এই রিপোর্টে সমসাময়িক বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতও বিবেচনায় আনা হয়েছিল। এই রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছিল।
বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এ যাবত্ শুধু আমলা সৃষ্টি করেছে, মানুষ সৃষ্টি করেনি। এখানে মানুষ বলতে তিনি প্রাণ ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান মনুষ্যত্ব অর্জনকারী মানুষের কথা বলেছেন। তাই কমিশন সেই রকম মানুষ সৃষ্টি করার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিল। এই কমিশন বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশা অনুযায়ী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠন সম্পর্কে যথাসম্ভব সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও প্রস্তাবনা দিয়েছিল। এই রিপোর্টে সর্বস্তরের মানুষের শিক্ষা সংস্কার সম্পর্কে মৌল আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। জাতীয় চার মূলনীতির প্রতিফলন নিশ্চিত করা হয়েছিল রিপোর্টটিতে। কমিশনের রিপোর্টে শিক্ষার সকল স্তরে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা চালু এবং ভবিষ্যত্ কর্মসংশ্লিষ্ট কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। কমিশন শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ যেমন মোট জাতীয় আয়ের সাত ভাগ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, পাঁচ বছরের মধ্যে সাড়ে তিন কোটি নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করা, শিক্ষকের মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষকের বৈষম্য দূর করা, নারীশিক্ষার প্রসার, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালুকরণ, শিক্ষার সকল স্তরে বাংলা মাধ্যম প্রবর্তন, পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষায় গবেষণাসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করে। এই সুপারিশগুলো করা হয়েছিল জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে।
বঙ্গবন্ধু কমিশনের রিপোর্টটিকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। এবং তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক সৃজনশীল শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিপূর্ণতা পাওয়ার আগেই পাকিস্তানি ভাবধারা লালনকারী ঘৃণ্য চক্রান্তকারী ও তার দোসররা পনের আগস্টের ভয়াল রাতে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ঘটনা ঘটাল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। তারা দেশকে আবারও পাকিস্তানি যুগের অন্ধকার অতল গহ্বরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। দীর্ঘ একুশ বছর তারা সুকৌশলে বাঙালিকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করার প্রয়াস চালিয়েছিল, বাঙালিকে ভুল পথে চালিত করতে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও যে অরাজকতা, যে অমানিশার অন্ধকার ঘিরে ধরেছিল, তা থেকে পরিত্রাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল ছিয়ানব্বই সালে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে।
আর ২০০৯ সাল থেকে আঘাত করা হতে থাকে সাম্প্রদায়িক ও সনাতনী ধ্যান-ধারণায় লালিত শিক্ষাব্যবস্থার বেদিমূলে। কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদনের আলোকে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময় প্রণীত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে কেবল দক্ষ মানবসম্পদই তৈরি নয়, আমলার পরিবর্তে প্রকৃত মানুষ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এমডিজির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১৬.৮ শতাংশের সাক্ষরতার হার এখন পৌঁছেছে ৭১ শতাংশে। শিক্ষায় অভিগম্যতা বৃদ্ধির ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হার ১০০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নারীশিক্ষার হার ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় সর্বাগ্রে পরিমাণগত উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে, আর এখন জোর দেওয়া হচ্ছে গুণগত উন্নয়নের দিকে। এজন্য শিক্ষায় ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের মধ্যে বিশাল কর্মযজ্ঞ সরকার অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করছে। পরিকল্পিতভাবে সুসম্পন্ন করা হচ্ছে শিক্ষার প্রতিটি স্তরের পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ কার্যক্রম। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হচ্ছে। শিক্ষার মান উন্নয়নে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের জন্য নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষানীতি প্রণয়ন, পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংযোজন, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য যে বিশাল কর্মযজ্ঞ গ্রহণ করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, তার ফলে শিক্ষার আলোয় আলোকিত দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি হচ্ছে।
দক্ষ জনসম্পদ তৈরি হচ্ছে। এই দক্ষ জনশক্তি ইতোমধ্যে এই দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে করেছে টেকসই, দেশকে এনে দিয়েছে বিশ্বের বুকে ভিন্ন এক পরিচিতি, যে পরিচিতিতে দেশের মানুষ গর্বিত। তারপরও যে প্রশ্নটি থেকেই যায় তা হল, বাংলাদেশ কি শিক্ষার গুণগত মানের দিক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিকূলতা রয়ে গেছে। প্রশ্ন ফাঁসসহ যেসব বিতর্কিত ইস্যু লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, সেসব প্রতিকূলতাকে চিহ্নিতকরণ ও তা নিরসনের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্ম ও প্রাণশক্তিতে বলীয়ান মনুষ্যত্ব অর্জনকারী প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর তাহলেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো সার্থক হবে। লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ