শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ১১:২৯

রামপাল প্রকল্প নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে ইউনেস্কো

Published : 2017-04-28 23:32:00
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের কারণে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে কি না, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করছে জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। আগামী ২ জুলাই পোল্যান্ডে ইউনেস্কোর ৪১তম সাধারণ সভায় ওই প্রতিবেদন তুলে ধরা হবে।
এদিকে বিশ্ব ঐতিহ্য ‘সুন্দরবন’ সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার কী করছে, কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংস্থাটি।
রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র বাতিলের জন্য ইউনেস্কোর উদ্যোগ চেয়ে গত ২০ এপ্রিল বিশ্বের ৭০টি পরিবেশবাদী সংস্থার খোলা চিঠির জবাবে এসব কথা বলেছে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের পরিচালক ম্যাকটিল্ড রোজলির। ইউনেস্কোর প্রধানকে দেওয়া ওই চিঠিতে সুন্দরবন রক্ষায় রামপাল ও ওরিয়নের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র বাতিল না করলে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলা হয়।
ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ২৫ এপ্রিল দেওয়া জবাবের অনুলিপি ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের মহাপরিচালককে দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করে ইউনেস্কো। সেই সুন্দরবনের কাছে রামপালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র। দেশ-বিদেশে পরিবেশবাদী ও বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার পরও এগিয়ে চলেছে বহুল আলোচিত এই কয়লা বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণযজ্ঞ।
ক’দিন আগেই বিদ্যুেকন্দ্রটি নির্মাণে যন্ত্রপাতি সরবরাহের আদেশ পেয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যাল লিমিটেড (ভেল)। যার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি রুপি বা ১২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা।
সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে পশুর নদীর তীর ঘেঁষে এই প্রকল্পে ১৮৩৪ একর জমির সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বালু ভরাট, সীমানা প্রাচীর ও প্রাথমিক অন্যান্য কাজ শেষ হয়েছে। খুব শিগগির মূল বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
এই বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ বন্ধের দাবিতে পরিবেশবাদীরা এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে। তারা বলছেন, বিদ্যুেকন্দ্র নির্মিত হলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে আশপাশের এলাকা। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন।
এর আগে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার এবং ইন্টারন্যাশনাল কনজারভেশন ইউনিয়ন (আইইউসিএন) বলেছে, এমন সম্ভাবনা খুব প্রবল যে, এই বিদ্যুেকন্দ্রের দূষণ সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। ইউনেস্কো বলেছে, এই বিদ্যুেকন্দ্রটি এমন কোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়া উচিত, যাতে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি না হয়।
তবে এসব শঙ্কার কথা উড়িয়ে দিয়ে সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হচ্ছে, উন্নত প্রযুক্তির এই বিদ্যুেকন্দ্রের কারণে পরিবেশ দূষণ হবে না। ক্ষতি হবে না সুন্দরবনেরও। বরং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ওই এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে।
রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র নিয়ে গেল বছরের অক্টোবরে ইউনেস্কো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের মূলত চার ধরনের ক্ষতির আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়। রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রে কয়লা পোড়ানোর পর সেখান থেকে নির্গত কয়লার ছাইকে সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য এক নম্বর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইউনেস্কোর ওই প্রতিবেদনে।
বিদ্যুেকন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্য এবং পানিকে দ্বিতীয় হুমকি গণ্য করছে ইউনেস্কো। এই প্রকল্পকে ঘিরে সুন্দরবন এলাকায় যেভাবে জাহাজ চলাচল বাড়বে এবং ড্রেজিং করার দরকার হবে, সেটিও সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আর সবশেষে বিদ্যুেকন্দ্রকে ঘিরে ওই অঞ্চলের সার্বিক শিল্পায়ন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও সুন্দরবনের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে মনে করে ইউনেস্কো। রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের (ইআইএ) জন্য আইইউসিএন যে নির্দেশনা দিয়েছিল, তা ঠিকমতো মেনে চলা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয় এই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য ক্ষতি এড়াতে এই বিদ্যুেকন্দ্রে যে ধরনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং যে রকম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা উচিত, সেটাও করা হচ্ছে না।

আরও খবর