মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০৪:০৫

উপকূলে স্থায়ী বেড়িবাঁধের প্রয়োজনীয়তা

Published : 2017-04-28 22:23:00, Updated : 2017-04-29 09:49:55
এস এম ফরিদুল আলম: ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। উপকূলে এ রাতে আঘাত হেনেছিল মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। লাশের পরে লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল চারদিক। বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বিশ্ববাসী অবাক হয়ে গিয়েছিল সেই ধ্বংসলীলা দেখে। কেঁদে উঠেছিল বিবেক। এত বছর পর কেমন আছেন তারা? দুর্যোগ মোকাবেলার কী অবস্থা এখন উপকূলের?
দীর্ঘ ২৬ বছর আগের সেদিনটি ছিল সোমবার। সকাল থেকে আকাশে মেঘের আনাগোনার পাশাপাশি ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বাতাস প্রবহমান ছিল হালকাভাবে। দুপুর গড়াতেই বেড়ে ক্রমশ বাড়ছিল বাতাসের গতিবেগ। বিকেলে ৪টার পর থেকে বাতাসের গতি বৃদ্ধি পায়, একই সঙ্গে বৃষ্টিও। চলতে থাকে প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস। রাত ১২টার পর ২২৫ কিলোমিটার বেগে বঙ্গোপসাগর থেকে বয়ে আসা জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে পুরো উপকূলীয় এলাকায়। ২৫ ফুট জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় এসব এলাকা। মহাপ্রলয়ের এই রাতের ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকা। বঙ্গোপসাগর ও শঙ্খ নদীর বেড়িবাঁধে বিলীন হয়ে স্রোতের সঙ্গে ভেসে গিয়েছিল পুরো এলাকার সমস্ত বাড়িঘর, গাছপালা, গবাদি পশু। হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর সলিল সমাধি ঘটেছিল সে রাতের জলোচ্ছ্বাসে, এমনকি বাঁশখালী সমগ্র উপকূলীয় এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। সরকারি হিসাব মতে সেই ঘূর্ণিঝড়ে মারা গিয়েছিল বাঁশখালী উপজেলায় ৪০ হাজার; আমাদের হিসাবে ৭০ হাজার। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় এলাকায় সরকারি হিসাবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার এবং বেসরকারি হিসেবে ২ লাখেরও বেশি প্রাণ হারায়। স্বজন হারানোর স্মৃতি নিয়ে প্রতি বছরই এই দিন ফিরে আসে উপকূলবাসীর কাছে।
আজ আবারও এসেছে সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল। এই দিনে মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। চলছে ঘূর্ণিঝড় মৌসুম। আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাসে এপ্রিল-মে মাসে একাধিক নিম্নচাপের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছে। কিন্তু এখনও সম্পূর্ণ অরক্ষিত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূল। বাংলাদেশের অন্যতম সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের বন্দরনগরীর পতেঙ্গা চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, সন্দ্বীপ, কক্সবাজারের পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালীসহ উপকূলীয় এলাকার লোকজন এখনও রয়েছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্কে। ৯১ সালে এ ভয়াল রাতে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এসব এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলেও এখন পর্যন্ত সেখানে নির্মিত হয়নি স্থায়ী বেড়িবাঁধ।
অতীতে লক্ষ করা গেছে, ঘোর বর্ষাকালে জোয়ারের পানি ঠেকানোর নামে রিং বাঁধ নির্মাণ, মেরামত, সংস্কারসহ নানা নামে প্রতি বছরই নেওয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। কিন্তু এসব প্রকল্পে ঘটে সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ নয়ছয়ের ঘটনা। বৃষ্টি হলে ভেঙে যায় বাঁধ। আবারও নতুন নতুন প্রকল্পের নামে নতুন বরাদ্দ। এভাবেই বছরের পর বছর উপকূলীয় বাঁধের কাজের নামে চলে আসছে সরকারি অর্থের অপচয়।
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরীর পতেঙ্গা বেড়িবাঁধটি এখনও পর্যন্ত টেকসইভাবে নির্মিত হয়নি। ৯১ সালের মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এ বাঁধটি ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছিল নগরীর বিভিন্ন এলাকা, শিল্পকারখানা ও স্থাপনার। অনুরূপভাবে বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। ভয়াবহ প্রাণহানি আর বসতভিটা লণ্ডভণ্ড করে সেদিন বাঁশখালী উপকূলকে তছনছ করে দিয়েছিল। সেদিন থেকে এলাকাবাসী সবকিছু হারানোর নীরব দুঃখকষ্টের এত বছরের জোরালো দাবি ছিল টেকসই স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার।
অবশেষে বাঁশখালীর উপকূলে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্তর গতি জনমতে ক্রমাগত ক্ষোভের সঞ্চার করছে। কারণ তারা ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহারে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে কাজ করছে। এহেন দুর্নীতি অনিয়ম ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বলয়ের বাইরে থেকে নিরাপদে উক্ত কাজ সুষ্ঠু ও সুনিপুণভাবে সেনাবাহিনী-নৌবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন করার জন্য এলাকাবাসী দাবি জানিয়ে আসছিল। তা যদি হতো তাহলে আজ কতিপয় প্রকল্প সম্পৃক্তগণ উক্ত অনিয়ম করার সুযোগ পেত না।
আমরা দেখেছি ২০১৫ সালের মে থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত এই কাজের মেয়াদ রাখা হলেও কাজ শুরু হয়েছে সকল প্রক্রিয়া শেষে, বিগত ২০১৬ সালের শেষ পর্যায়ে এসে। কাজ শুরুর সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা মারামারি ও হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়াতে প্রথম ২০ দিন কাজ বন্ধ থাকে। ইউএনও, পুলিশের হস্তক্ষেপে পুনরায় কাজ শুরু হয়। তখন কাজ বন্ধ থাকায় চলমান কাজের বাধা প্রাপ্তিতে বিরাট ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছে দক্ষিণ প্রেমাশিয়ায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ এলাকাটি পুরো বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এই বেড়িবাঁধ টেকসই না হলে আগামীতে ব্যাপকহারে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাই উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণে কোনো ধরনের দুর্নীতি-অবহেলা-রাজনীতি কাম্য নয়।
লেখক : সমাজসেবী