মঙ্গলবার ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ১১:৪১

ভোক্তা অধিকার আইন

Published : 2017-04-28 22:23:00, Updated : 2017-04-29 09:48:10
ইহসান আজিজ: কোনো পণ্য বা সেবা যিনি ভোগ বা ভোগের উদ্দেশ্যে ক্রয় করেন, তিনিই ভোক্তা। ভোগের প্রতিটি বস্তু চাই নিরাপদ ও নির্ভেজাল। প্রত্যেক ভোক্তাই তার জীবন ও কাজের নিরাপত্তার জন্য যথোপযুক্ত ও নিরাপদ পণ্য বা সেবা প্রাপ্তির অধিকার চান।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে রালফ নাদের নামের একজন মানবাধিকারকর্মী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তার অধিকার বিষয়ে প্রথম সরব আন্দোলন করেন। আমাদের দেশে ভোক্তারা পদে পদে বঞ্চিত। এ অবস্থায় ভোক্তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ পাস হয়। এ আইনের সফলতা এখনও দৃশ্যমান নয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ভোক্তার এই আইন সম্পর্কে অবগত না থাকা এবং আইনের কিছু দুর্বলতা। তবে এই আইনে ভোক্তার অধিকারবিরোধী বিভিন্ন অপরাধ যেমন মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, সেবার তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা, ভেজাল পণ্য বিক্রয়, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রতারণা, পণ্যের নকল প্রস্তুত, ওজনে কারচুপি, মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয়, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দাম বেশি রাখা (বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে দেখা যায়) ইত্যাদির জন্য অপরাধভেদে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এখানে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড, অনধিক ২ লাখ টাকার বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে দেখা যায় ফরমালিন আমদানির পরিমাণ অনেক কমে গেছে। যে তথ্যটা অনেকের অজানা সেটা হচ্ছে কোনো ব্যক্তি যদি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভোক্তার অধিকারবিরোধী কাজের জন্য, আর যদি তদন্তে অভিযোগ সঠিক প্রমাণিত হয় তাহলে জরিমানার টাকা হতে অভিযোগকারী ২৫ শতাংশ পাবেন।
সম্প্রতি অনেক ভোক্তা অভিযোগ করে সফলতা পেয়েছেন। শিবলী সাদেক নামের এক গ্রাহক ২০১৫ সালে গ্রামীণফোনের অফার কিনে প্রতারিত হন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদে তিনি অভিযোগ করেন। পরিষদ শুনানি করে অভিযোগের সত্যতা পায় এবং গ্রামীণফোনকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করে। এখান থেকে অভিযোগকারী ২৫ শতাংশ অর্থ পাবেন। কিন্তু আমাদের অভিযোগ করার প্রতি প্রচণ্ড অনীহা। হয়তো এর কারণ অভিযোগ করার পদ্ধতিটা সঠিকভাবে আমাদের জানা না থাকা। তাছাড়া এই আইনে মারাত্মক কিছু দুর্বল দিক রয়েছে; যেমন ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তার সরাসরি মামলা করার কোনো অধিকার নেই। ভোক্তা অভিযোগ করবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের মহাপরিচালক বরাবর, তারপর সেখান থেকে আদালতে। আবার ৬১ ধারায় আছে অভিযোগ দায়েরের ৯০ দিনের মধ্যে মামলা করতে হবে। নয়তো ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করবেন না। যদি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান মহাপরিচালক বা তার মনোনীত ব্যক্তিকে প্রলোভন দেখাতে সক্ষম হয় তাহলে ৯০ দিনের মধ্যে কোনো তদন্তই হবে না। ভোক্তার এক্ষেত্রে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। আবার কেউ যদি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে তার প্রতিকারের সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে মহাপরিচালকের হাত-পা বাঁধা। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরকে বিষয়টি অবহিত করবেন মাত্র।
খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল, ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর কারণে নীরবে প্রাণঘাতী রোগের প্রকোপে পড়ছে অহরহ ভোক্তা। পচা, বাসি খাবারে সয়লাব সর্বত্র। ভোক্তার অধিকার রক্ষার জন্য ভোক্তার সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি ভোক্তা অধিকার আইনে সংস্কার এনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদকে একটি সক্রিয়, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তবেই আমরা পাব একটি ভোক্তাবান্ধব পরিবেশ।

লেখক : শিক্ষার্থী