মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ১২:১৮

একজন মুক্তিযোদ্ধার তিনটি আবেদন

Published : 2017-04-27 23:04:00, Updated : 2017-04-27 23:18:19
ড. রানা চৌধুরী: এক. আমরা ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে, তার স্বাধীনতা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা আমাদের এই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এটা এই বিশ্বের সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন ও করবেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতো না। কিন্তু ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের কয়েকজন সেক্টর-সাব সেক্টর কমান্ডার আর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ব্যতীত আর কারও নাম উল্লেখ নেই এবং কোনোদিন থাকবেও না। আমরা প্রত্যেকে আমাদের এই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাই।

আর এই স্বীকৃতি দিতে পারেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদে তার দল ও জোটের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। তার কাছে আমাদের বিনীত আবেদন, সংবিধান সংশোধন করে পরিশিষ্টে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা সংযোজন করুন।

দুই. আমরা ‘মুক্তিযোদ্ধারা জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান’। এই বাক্যটি স্বাধীনতার পর থেকেই সকলের মুখে বারবার শুনেছি। কিন্তু জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে রাষ্ট্র আমাদের কতটুকু সম্মান আর শ্রদ্ধা দিয়েছে? রাষ্ট্র তথা সরকার আমাদের সরকারি হাসপাতালে বিনাব্যয়ে চিকিত্সার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সরকার বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করছে। এটি যে গরিব, নিঃস্ব মুক্তিযোদ্ধাদের কত বড় উপকার হচ্ছে তা ভাষায় বর্ণনার অতীত। এজন্য আমরা সরকার তথা রাষ্ট্রের এবং জনগণের (যেহেতু জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই ভাতা) প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞ।

আমরা সম্মান চাই। রাষ্ট্র অবশ্য মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ বিদায়ের সময় ‘গান স্যালুট’ প্রদানের ব্যবস্থা করে থাকে। যথাযথ প্রমাণাদিসহ থানায় যোগাযোগ করলে পুলিশের একটি দল এসে সশস্ত্র সালাম জানিয়ে যায়। কিন্তু পৃথিবীর কোনো ধর্মেই উল্লেখ নেই যে মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর তাকে কী সম্মান বা খেতাব বা পুরস্কার দেওয়া হল তা জানতে পারেন।

জীবিত অবস্থায় আমরা কী সম্মান পাচ্ছি? যারা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের ৮০ শতাংশেরও বেশি ছিলেন গ্রামের নিরক্ষর কৃষক বা ভূমিহীন কৃষক অথবা তাদের সন্তান। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের কারওই বর্তমান বয়স ৬৫-এর কম হওয়ার কথা নয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা শুধু এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাই নই, এই দেশের সিনিয়র নাগরিকও। অথচ বড় অফিসারের কথা বাদই দিলাম, একজন মুক্তিযোদ্ধা কোনো উপজেলায় কোনো কাজে গেলে সংশ্লিষ্ট অফিসারের আর্দালি তাকে কক্ষে ঢুকতে বাধা দেয়। কোনোমতে ঢুকলেও অফিসাররা তাকে বসতে বলার মতো সৌজন্যও সবসময় প্রদর্শন করেন না।

আমাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে, আমাদের রাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মচারী ও কর্মকর্তারা পর্যন্ত জীবিত আমাদের ন্যূনতম সম্মানটুকু দেন না।

অন্যদের কথা বাদই দিলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেটে বা বারান্দায় গেলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। মৃত ব্যক্তির প্রতি কতটুকু রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদর্শন করা হল তার চেয়ে জীবিত এবং বর্তমানে এই বৃদ্ধাবস্থায় আমাদের প্রতি কী আচরণ করা হচ্ছে সেটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমরা ভিআইপি মর্যাদা চাই। অনেক বড়লোক ব্যবসায়ী সিআইপি এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ভিআইপি হিসেবে পথে-ঘাটে, বিমানে, রেলে, বাসে, সার্কিট হাউস, রেস্ট হাউসে কত সম্মান ও সুবিধা পান। আমাদের জীবিত অধিকাংশ (ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবাই) মুক্তিযোদ্ধার বিমানে চড়া তো দূরের কথা, ভূমিতে বিমানই দেখেননি। তারা যেন অন্তত রেলে-বাসে চড়ার সময়, কোনো সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করা, অতিপ্রয়োজনে রেস্ট হাউস বা সার্কিট হাউসে থাকার মতো ভিআইপি মর্যাদা পান, রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে বসার জন্য একখানা চেয়ার পান এর জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এতে সরকার বা রাষ্ট্রের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই, যে অর্থ দফতরে ফাইল গেলেই আমলারা তা আটকে দেবেন।

আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রীর মুখের একটি কথায় আমরা অনেক সম্মানজনক অবস্থায় চলে যাব। কোনো ফাইল চালাচালি করতে হবে না, কেবল একটা সার্কুলার বা গেজেট নোটিফিকেশনই যথেষ্ট। আমরা শুনেছি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে দেশের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়া সৈনিক এবং অফিসার সর্বত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে অত্যন্ত সম্মান ও সুযোগ পেয়ে থাকেন। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে আমাদের ভিআইপি মর্যাদায় বাস্তবে অভিষিক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে সানুনয় আবেদন জানাচ্ছি।

তিন. প্রধানমন্ত্রী অনেক লোক-লস্কর নিয়ে বিদেশ সফর করেন। এর মধ্যে সকলেই যে ওই সফরে অবদান রাখেন তা কিন্তু নয়। আমি প্রধানমন্ত্রীকে আবেদন জানাব আপনার প্রতিটি সফরে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের (উপজেলা) ৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সফরসঙ্গী করার জন্য।

যারা অন্তত আপনার কল্যাণে বিমানে করে বিদেশে গিয়ে পাঁচ তারা হোটেলে অবস্থান করে গর্বিত হবেন এবং আপনাকে চিরজীবন মনে রাখবেন। তারা হয়তো বিদেশের-বিমানের-হোটেলের প্রটোকল ঠিকমতো মানতে ব্যর্থ হবেন। তবে আমার ধারণা, যৌবনে যখন বিভিন্ন অস্ত্র চালাতে শিখতে পেরেছেন, আপনার কোনো প্রটোকল অফিসার শিখিয়ে দিলে নিশ্চয়ই বৃদ্ধ বয়সে সফর চালিয়ে নিতে পারবেন।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক