শনিবার ২১ অক্টোবর, ২০১৭, সকাল ০৭:১৪

ভারতের সেনাপ্রধান ফের সফরে আসছেন

‘হয় ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব, নয়তো চীনের অধীনতা’

Published : 2017-04-21 01:00:00, Count : 224
সকালের খবর ডেস্ক: ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত আগামী সপ্তাহে আবারও বাংলাদেশ সফরে আসছেন। গত ৩১ মার্চ তিন দিনের বাংলাদেশ সফর করে যান বিপিন। ভারতের ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৭-১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের রেশ না কাটতেই বাংলাদেশে আসছেন ভারতের সেনাপ্রধান। দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক হালনাগাদ করার নীতির আলোকে হচ্ছে এই সফর।
অন্যদিকে র্যাডিফ ডটকমের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, একটি ছোট দেশ হিসেবে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অনেক কার্যকরী। না হলে এক সময় চীনের ঋণে জর্জরিত হয়ে তার অধীনে একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে বাংলাদেশ।  
প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ১ জানুয়ারি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর জেনারেল রাওয়াত তার আন্তর্জাতিক সফরের প্রথম গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছিলেন। 
টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, জেনারেল রাওয়াত ২৭ থেকে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করবেন। ভারতে শেখ হাসিনার সফরকালে দুই দেশ একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। ওই সময় উপকূল টহলযানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশকে নতুন ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণাও দেয় ভারত। বাংলাদেশ গত বছর চীনের কাছ থেকে প্রথমবারের মতো দুটি সাবমেরিন সংগ্রহ করে। 
টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে, ঢাকার বেইজিংয়ের অন্যতম অস্ত্র আমদানিকারক হয়ে পড়ার প্রমাণ দিচ্ছে ডিজেলচালিত ইলেকট্রিক এই দুই সাবমেরিন কেনা। ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে তথা শ্রীলঙ্কা থেকে মালদ্বীপ, সিসিলি, মরিশাস, মিয়ানমার, নেপাল ও বাংলাদেশে চীনের প্রাধান্য প্রতিরোধের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে ভারতের গণমাধ্যম র্যাডিফ ডটকমের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘পরামর্শ’ দিয়ে বলা হয়েছে, একটি ছোট দেশ হিসেবে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক কার্যকরী। যদিও বাংলাদেশ সহজেই চীনের সহযোগিতা পাবে ও ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু তখন দেশটি ঋণের বোঝায় জর্জরিত এবং চীনের অধীন একটি দেশে (স্যাটেলাইট স্টেট) পরিণত হবে।
র্যাডিফ ডটকমের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইতোমধ্যে পতনের কিছুটা দৃশ্যমান হচ্ছে। কারণ দেশটির ৮০ ভাগ সামরিক সরঞ্জামই চীন থেকে ইতোমধ্যে আমদানি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রটোকল ভেঙে তাকে স্বাগত জানান। 
কোনো দেশে সফরের সময় ওই দেশের সরকারপ্রধান চাপের মধ্যে থাকেন। ভৌগোলিক রাজনীতিতে অনেক চাওয়া-পাওয়া থাকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক বাংলাদেশের মানুষ ও দেশটির প্রধান বিরোধী দল প্রধান খালেদা জিয়ার কাছে একটি বড় ইস্যু। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে চাপে আছেন। খালেদা জিয়া তিস্তা ইস্যুকে শেখ হাসিনার অপারগতা বলে সুযোগ  নেবেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার জয়ের জন্য ভারতকে তাকে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে সমর্থন দিতে হবে।
শেখ হাসিনার সফরে অবকাঠামো ও বিদ্যুত্ খাতে ১৭টি প্রকল্পে দুই দেশের মধ্যে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিষয়ক ঋণচুক্তি হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের। ৯ বিলিয়ন ডলারের ১৩টি ব্যবসায়িক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। 
অন্যদিকে ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশ ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে। সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থেকে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ভারত-বাংলাদেশের জন্য একটি সাধারণ বিষয় হল চীনের ছায়া ও প্রভাব। বাংলাদেশ চীনকে না রাগিয়ে ভারতের প্রতি উষ্ণ সম্পর্কের হাত বাড়াতে চায়। অন্যদিকে চীন ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী। বার্ষিকভাবে ১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেন হয়। তাই ভারত কখনও চীনকে বাণিজ্যিকভাবে না বলতে পারবে না। তবে ভূ-কৌশলগত রাজনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের উপকূলকে ভারত চীনের প্রভাবমুক্ত রাখতে চায়।
অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো নিয়ন্ত্রণ ও সেগুলোতে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ভারতের বাংলাদেশকে প্রয়োজন। এটি মোদীর কাছে এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তিকে পুরো ভারত স্বাগত জানিয়েছে। এর মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী ভৌগোলিক অঞ্চলগুলোতে ভারতের বাজার সম্প্রসারিত হল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ভারত নজর রাখতে পারবে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩-১৪ সালে ৬.৬ বিলিয়নের বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। তবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি প্রবল। ভারত বাংলাদেশে রফতানি করে ৬.১ বিলিয়ন এবং বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে মাত্র ৪৬২ মিলিয়ন। ভারতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে এই অসমতা দূর করার আহ্বান জানান।
সামরিক চুক্তি ছাড়াও দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, সীমান্ত সহযোগিতা, যোগাযোগ, সন্ত্রাসবাদ রোধ, বিদ্যুত্ প্রকল্প, গণমাধ্যম ও বিচারিক কার্যক্রম বিষয়ক ১১টি চুক্তি ও ২৪টি এমওইউ স্বাক্ষর হয়। দুই দেশ সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ রোধে ঐকমত্যে পৌঁছে এবং অবৈধ অভিবাসন সমস্যা নিরসন কাজে অঙ্গীকার করে। তবে আলোচনার সব বিষয়বস্তু জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। এই সফর সত্যিকার অর্থেই দুই দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ এখন সীমার মধ্যে আছে।