মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ০২:০৯

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি

Published : 2017-03-13 15:21:00

তায়্যিব-উল-ইসলাম : গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি বর্তমানে দেশের আলোচিত বিষয়। তবে অনেকেই হয়তো মাত্র শ’কয়েক টাকা বাড়ানোর জন্য ‘সকল সংসারী লোকের কপালে চিন্তার ভাঁজের’ মধ্যে অতিরঞ্জনের আভা দেখতে পারেন, দেখাটাই স্বাভাবিক; আবার ‘প্রায় সকলের’ কপালে যে ভাঁজ পড়বে তাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উড়িয়ে দেওয়া যায় না এ কারণেই যে ‘বাড়ানোর’ ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখের নয়। সংসারী লোকমাত্রই গ্যাসের দাম (দুই চুলার জন্য) ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার ঠিক এক না দুই বছর হয়েছে তা স্মরণ করতে তকলিফে পড়বেন।

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে একজন মন্ত্রীর বয়ান প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন গ্যাস নাকি বেশি সস্তা ছিল, তাই দাম বাড়ানো হয়েছে! মন্ত্রীর দৃষ্টি দিয়ে দেখলে হয়তো কথাটা আমিও বলতাম। তবে আফসোস, আমাকে দেখতে হচ্ছে নিতান্ত মধ্যবিত্ত পেশাজীবীর চোখে। এ কারণে আমার মতো একজন মধ্যবিত্ত পেশাজীবীর সারা মাসের একটা ‘উটকো খরচ’ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।
প্রায় এক বছরের মধ্যে ট্রেনের টিকেট, গ্যাস, বিদ্যুত্সহ অনেক কিছুর দাম বেড়েছে এবং এই বেড়ে যাওয়া দামের সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার যে ক্ষমতা তা বেড়ে গেছে। এ দেশে গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে অনেক আন্দোলন হয়েছে। এসব প্রতিবাদ কর্মসূচি দেওয়া প্রধান বিরোধী দলেরই কাজ ছিল, সঙ্গে অন্যরা সুর মিলাত এবং জনগণ সাড়া দিত। এখন দিন পাল্টেছে, দাম এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও প্রতিবাদ করার মতো বলশালী কেউ নেই। এখন কম বলের মানুষগুলোই প্রতিবাদ কর্মসূচি দেয় আর প্রধান বিরোধী দল আছে কি নেই, তা জনসাধারণের চিন্তা করে বলতে হয়। আমাদের প্রতিবাদ করা আর হয়ে উঠে না, নিভৃতে মেনে নিই সব!

একটি জাতীয় দৈনিকে পড়েছি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গ্যাস খাত থেকে সরকার মোট আয় করেছে প্রায় ছয় হাজার দুইশ’ চার কোটি টাকা, যার মধ্যে লভ্যাংশই ছিল প্রায় এক হাজার একশ’ কোটি টাকা! গ্যাস খাতে সরকারের কোনো ভর্তুকি নেই এবং পেট্রোবাংলার তহবিলে যা জমা আছে তার পরিমাণ প্রায় এগারো হাজার কোটি টাকা। আরেকটি ইংরেজি দৈনিকে দেখলাম বিইআরসির এক সদস্য বলেছেন, ডিস্ট্রিবিউটররা নাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি চেয়েছিল, সেখানে তারা বাড়িয়েছেন মাত্র ২২ শতাংশ। আনুপাতিক হারে ৯৫ শতাংশের জায়গায় ২২ শতাংশ বাড়ানো যে একটি মহত্ সিদ্ধান্ত, তা না মেনে উপায় নেই! তবে আমাদের কাছে যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হল এ খাতে সরকারের এত লাভের পরও কী কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানো হল তা জানা। আর এর চেষ্টা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রীর সেই ‘প্রণিধানযোগ্য’ উক্তি ছাড়া মাথায় আর কোনো যৌক্তিক উত্তরই এল না। শেষমেশ আমিও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে আসলেই গ্যাসের দাম সস্তা ছিল, তাই বাড়ানো হল!!

গ্যাসের দাম কেন বাড়ানো হল বা বাড়ানোর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তিতর্ক হবে। পেছনের কারণ, সামনের কারণ কিংবা অকারণ-এসব বিশেষজ্ঞরাই ভালো বুঝবেন; আমরা আমজনতা এত কিছু বুঝতেও চাই না। আমরা যা বুঝি তা সরল এবং নির্ভেজাল। আমরা বুঝি যে লাভের অঙ্কে চলা গ্যাস খাতে বছর দুয়েকের ব্যবধানে দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। এ রকম উচ্চ হারে বিদ্যুত্ বিল দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠা অবস্থায় বিদ্যুত্ খরচ আরও বাড়ানো আমাদের ক্ষতে মলম না দিয়ে লবণ দেওয়ার শামিল! যারা গ্যাসের চুলা ব্যবহার করেন তাদের সবচেয়ে বড় অংশটিই হয় মধ্যবিত্ত নাহলে দরিদ্র। এরা কিছু টাকা বাঁচাতে জীবনের অনেক শখ আহ্লাদ বাদ দেন, বিদ্যুত্ বিল বাঁচাতে তীব্র গরমেও ফ্যান ছাড়েন না। কিন্তু পেটের তাগিদে রান্নার জন্য চুলা তো লাগবেই। আর চুলা লাগালেই বিল দিতে হবে নির্দিষ্ট রেটে। চুলা বেশি ব্যবহার হোক আর কম, বিল দিতে হবে সমান রেটেই; মন্ত্রীর বাসার যে রেট, এনার্জি কমিশনের সদস্যদের বাসার যে রেট, খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষদেরও বিল দিতে হবে সেই একই রেটে।
লেখক : আইনজীবী