সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, বিকাল ০৪:২৯

ক্ষমতা, রাজনীতি ও কিছু কথা

Published : 2017-03-13 15:21:00

ওয়াহেদুজ্জামান সরকার : নতুন নির্বাচন কমিশন ও বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ কিছুটা হলেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেককেই আশাবাদী করে তুলছে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নতুন ইসির ব্যাপারে শুরু থেকে বিরোধিতা করলেও দলটি যে একে একরকম মেনে নিয়েছে, সেটা তাদের সাম্প্রতিক দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায়। কারণ বিএনপি এখন জাতীয় নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি তুলছে। অর্থাত্ তারা একটি ইস্যু থেকে এখন আরেক ইস্যুর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এটি পরোক্ষভাবে ইসিকে মেনে নেওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। যদিও এ ধরনের সরকার গঠনের কোনো সুযোগ নেই বলে এ দাবি নাকচ করেছে আওয়ামী লীগ। তাছাড়া বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে সামনের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া বিএনপির যে আর কোনো উপায় নেই, সেটি তারা মনে হয় বুঝতে পারছে। আর আওয়ামী লীগও চাইছে বিএনপি এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে যে প্রশ্ন উঠেছে, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে যাতে সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয় সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগকে অনেকটা সচেতন দেখা যাচ্ছে। আমরা সাধারণ জনগণ আশান্বিত হতে চাই।

পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হোক, সেটা সবাই চায়। এজন্য নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিএনপিকে যে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই সেটা আওয়ামী লীগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতার সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকেও বোঝা যায়। সময়মতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, নতুন সরকার দেশ পরিচালনা করবে। জাতীয় সংসদে অনেক নতুন মুখও দেখা যাবে। সবকিছু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতার পালাবদল-এটাই কি সব। আমাদের দেশের প্রধান দুই দলের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি অন্তত সে কথাই বলে যে ক্ষমতাই শেষ কথা। এর বাইরে কিছু নেই। কিন্তু ক্ষমতা তো পাঁচ বছরের জন্য। আর রাজনীতি? রাজনীতি তো পাঁচ বছরের কোনো বিষয় নয়। তাহলে কোনটা বড়? ক্ষমতা না রাজনীতি? অবশ্যই রাজনীতি।  
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছাড়া আওয়ামী লীগের কোনো পথ ছিল না। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। এ অবস্থায় বিএনপিকে ছাড়াই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। ফলাফলস্বরূপ বেশির ভাগ আসনেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হওয়ার নজির সৃষ্টি হল। অবস্থা এমনই হয়েছিল যে,অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের বিপরীতে কোনো প্রার্থীই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রশ্ন হল, জনগণের ভোট ছাড়া জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে সেখানে সেই জনপ্রতিনিধির দায়বদ্ধতা কতটুকু থাকে। সম্প্রতি কোনো কোনো জাতীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধি সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন তৈরি করে। গাইবান্ধার এক এমপি, যিনি গত বছরের শেষ দিনে সন্ত্রাসীর গুলিতে মারা গেছেন, সেই এমপি একটি ঘটনা দিয়ে সারাদেশে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। কথা না শোনায় সৌরভ নামে এক শিশুর পায়ে গুলি করেছিলেন তিনি। একজন জনপ্রতিনিধি, যার জনগণের অভিভাবকের ভূমিকায় থাকা উচিত, তিনি কি না একটি শিশুর জীবন নিতে বসেছিলেন। একজন আইনপ্রণেতা কীভাবে এ রকম অসংলগ্ন আচরণ করতে পারে, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
সম্প্রতি একই আসনের এক সাবেক আইনপ্রণেতাকে সেই আলোচিত এমপিকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, ‘গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আবার এমপি হওয়ার জন্য এ আসনের সাবেক এমপি আবদুল কাদের খান মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, এ ছাড়া কাদের ওই আসনে পুনর্নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থীকে হত্যার পরিকল্পনাও করেছিলেন।’ খুব ভয়ঙ্কর কথা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়তো এটাই প্রথম নয়। কিন্তু রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ যদি বিরাজমান না থাকে তাহলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়। সম্প্রতি খুলনার এক এমপি পরিবারের নেতিবাচক খবর আমাদেরকে মারাত্মকভাবে আশাহত করে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ওই এমপি পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারকে বাড়ি থেকে উত্খাত চেষ্টার। খুলনার পাইকগাছার স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ কর্মী ও তার পরিবারের অভিযোগ, যে বাড়িটিতে সত্তর বছর ধরে তারা বসবাস করে আসছেন, তাকে ঘিরে গত বছরের জানুয়ারিতে প্রায় ১০  ফুট উঁচু ইটের দেয়াল তৈরি করে তাদের অনেকটা অবরুদ্ধ করে রেখেছে এমপি পরিবার। বাড়ি থেকে বের হতে হলে মইয়ের সাহায্যে প্রাচীর ডিঙাতে হয়। বাড়ির বয়স্ক এবং শিশুদের জন্য বিষয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অমানবিক। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এভাবেই ইতোমধ্যে এক বছর অমানবিকভাবে বসবাস করেছে ওই পরিবারটি। জমি নিয়ে বিরোধ কমবেশি সব জায়গাতেই আছে। কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধি ও তার পরিবারের কাছে এ বিষয়ের কি কোনো মানবিক সমাধান ছিল না? এসব যদি আমাদের জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড হয় তাহলে সে সমাজব্যবস্থায় রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ওপর আস্থা বাড়ার কোনো কারণ নেই।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর পার্লামেন্টে বলেছিলেন, ‘সবাইকেই একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। আমাদেরকেও চলে যেতে হবে। এই পার্লামেন্ট ও আওয়ামী লীগ থেকে অনেক ঝানু রাজনীতিবিদ ইতোমধ্যে পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। এ ধরনের রাজনীতিকের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। কাজেই আমাদের উচিত নতুনদের জন্য সুযোগ তৈরি করা।’  
সত্যিই রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝানু রাজনীতিকের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। একসময় যখন পার্লামেন্টে শুধু রাজনৈতিক ময়দানে অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের দেখা যেত, সেখানে এখন ব্যবসায়ী থেকে হঠাত্ রাজনীতিক বনে যাওয়া ব্যক্তিদেরই বেশি দেখা যায়। এর সামগ্রিক ফলাফলটা কী, সেটা আমরা জনগণ ভালোভাবে বুঝতে পারছি। ব্যবসা আর রাজনীতি যদি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় তখন তার পরিণামটা কত ভয়াবহ হতে পারে, এর সর্বশেষ উদাহরণ মনে হয় সম্প্রতি পরিবহন ধর্মঘটের সময় দেশবাসী দেখেছে। ব্যবসায়ীরা পরিবহন ব্যবসা করে ফুলে-ফেঁপে উঠে এখন সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে। এখন তারাই যখন তখন জনগণকে জিম্মি করে ফেলছে ও হুমকি দিচ্ছে। যা হোক, জনগণ যখন রাজনৈতিক ময়দানে থাকে না, আবার কোনো দলের সঙ্গেও থাকে না; তখন বুঝতে হবে যে জনগণ সে সময়ের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু যেহেতু মানুষের জীবন রাজনীতির বাইরে নয়, সেহেতু রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
মানুষের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর এ কাজটা সবাই মিলে করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনীতি যাতে সুস্থ, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আবার ফিরে আসে; আবার যাতে মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রাণস্পন্দন ফিরে আসে, রাজনীতিতে যাতে ভালো মানুষ আসে সে উদ্যোগ ক্ষমতাসীন দল হিসেবে প্রথমত আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সময় রাজনীতি নিয়ে বেশ ভালো উপদেশ দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘ভালো মানুষ রাজনীতিতে এলেই, রাজনীতি ভালো হয়ে যাবে। ভালো মানুষেরা রাজনীতি না করে দূরে সরে গেলে, খারাপ লোকেরা রাজনীতির মঞ্চ দখল করবে, এমপি-মন্ত্রী হবে। তারা দেশ চালাবে কিন্তু তাতে দেশের ভালো হবে না। রাজনীতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে গেছে। দেশের রাজনীতিকে আমরা জনগণের সামনে আকর্ষণীয় করে তুলতে চাই। রাজনীতিতে সত্, যোগ্য, মেধাবীদের টেনে আনতে চাই আমরা। রাজনীতিতে যখন ভালো মানুষ আসবে এবং এমপি-মন্ত্রী হবে, তখন রাজনীতি জনগণের কাছে আকর্ষণীয় হবে।’
আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ ব্যক্তি যখন রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করে রাজনীতিতে সত্, যোগ্য, ভালো নেতৃত্বের ওপর বারবার গুরুত্বারোপ করছেন তখন তাদের ওপর আমরা সাধারণ জনগণ আস্থা রাখতে চাই। তাদের কথাগুলো যেন নিছক কথার কথা না হয়ে ওঠে তার বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চাই। অন্যতম বৃহত্ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিরও দায়িত্ব কম নয়। সময়োচিত ইতিবাচক রাজনীতিতে ফিরে আসতে বিএনপি আর কত সময় নেবে তা কি এখনও ভেবে দেখার সময় আসেনি? বলা হয়ে থাকে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আসলে কি তাই? অবশ্যই রাজনীতিতেও শেষ কথা বলে কিছু আছে। আর তা হচ্ছে নীতি ও আদর্শ। রাজনীতিতে যদি নীতি ও আদর্শ না থাকে তাহলে আর তা রাজনীতি থাকে না। নীতি-আদর্শহীন তথাকথিত রাজনীতি সাধারণ মানুষকে শোষণের একটি হাতিয়ার।                                                                 
লেখক : সাংবাদিক