শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৬:০২

বিদ্যুৎ সংযোগে বরাদ্দ না থাকায় হোঁচট

Published : 2017-03-13 15:10:00

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন : ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুমোদনের আগেই কয়েক দফায় কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করা হয়। দুই দফায় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) অনুষ্ঠিত হয়। তারপরও ডিপিপিতে প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুত্ সংযোগের জন্য কোনো বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বড় প্রকল্পে এমন ভুল চোখে পড়েনি সেতু বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনের। ফলে কর্ণফুলীতে বিদ্যুত্ সংযোগের অভাবে টানেল নির্মাণের অবকাঠামো কাজ শুরুতে হোঁচট খেল। 
প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুত্ সংযোগ দিতে ৭৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু অনুমোদিত ডিপিপিতে এ খাতে কোনো বরাদ্দ নেই। এ অবস্থায় বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিদ্যুত্ সংযোগের আবেদন করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। দ্রুত সময়ে বিদ্যুত্ সংযোগ না দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হওয়ার এবং চীনের দেওয়া ঋণের সুদের পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেতু বিভাগ থেকে বিদ্যুত্ বিভাগের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের রাষ্ট্রপতি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন সড়ক টানেল নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। একই দিনে চীনা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৭০ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শিগগিরই প্রকল্পের ভৌত নির্মাণকাজ শুরু হবে। এ জন্য প্রকল্প এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুত্ সংযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে বিদ্যুত্ লাইন ও সাবস্টেশন নির্মাণ খাতে বতর্মানে কোনো অর্থের সংস্থান নেই। ডিপিপির প্রাক্কলন অনুযায়ী এ কাজের ৭৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা সংস্থানের জন্য প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডিপিপি সংশোধনের আলোকে ভবিষ্যতে বিদ্যুত্ লাইন ও সাবস্টেশন নির্মাণ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দপ্রাপ্তির পর অর্থ পরিশোধ করা হবে।  
এ বিষয়ে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের পরিচালক ইফতেখার কবির বলেন, ডিপিপিতে বিদ্যুত্ সংযোগের বিষয়টি ছিল না। আমরা জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুত্ বিভাগকে আবেদন জানিয়েছি। বরাদ্দ পাওয়ার পর অর্থ পরিশোধ করা হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুত্ বিভাগ রাজি হয়েছে। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে শুরু থেকে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি ছিল। বেশ কিছু অঙ্গে ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। কিন্তু ব্যয় বিষয়ে আপত্তি জানানোর কারণে প্রকল্পের বিদ্যুত্ সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দই ডিপিপিতে রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় বৃদ্ধির কৌশল নেয় সেতু বিভাগ। 
তিনি জানান, অনেক প্রকল্পেই এ ধরনের কৌশল নিয়ে থাকে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। যাতে শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় কম দেখানো হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় বাড়ানো হয়। 
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথম দিকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো টানেল প্রকল্পের প্রস্তাবনায় ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ৩ দশমিক ৪০ কিলোমিটার এ টানেল নির্মাণে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার প্রস্তাব করা হয় ১ হাজার ৪৬০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বৈদেশিক ঋণ ধরা হয় ৪ হাজার ১৪০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। কিন্তু ২০১৫ সালের মার্চে প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। অতিরিক্ত দুই হাজার কোটি টাকাই সরকারি তহবিল থেকে জোগানের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের অঙ্গ ভেদে এর ব্যয় বিভাজন দেখাতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেতু বিভাগ। এছাড়াও কিছু খাতে ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলে পরিকল্পনা কমিশন। ফলে ওই সময় অনুমোদন না দিয়েই প্রকল্পটি ফেরত পাঠায় পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় পুনর্গঠনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প দাবি করে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পটির ব্যয় ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩ হাজার ৬৪৭ কোটি ২০ লাখ আর চায়না এক্সিম ব্যাংকের ঋণ ধরা হয় ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিও (একনেক) প্রস্তাবিত ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুমোদন দেয়। 
নদীর তলদেশ থেকে ৩৫ মিটারের নিচে নির্মাণ করা হবে এ সুড়ঙ্গপথ। এর  দৈর্ঘ্য হবে সাড়ে ৩ দশমিক ৪০ কিলোমিটার। এতে ৮০০ মিটারের একটি ব্রিজসহ ৪ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড থাকবে। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর, পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করা হবে। এ টানেল এশিয়া হাইওয়ের নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। ২০২০ সালের আগে টানেলটির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।