মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ১০:১৮

‘মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল টকিং বুক’এর মত ১৯টি উদ্ভাবনের গল্প নিয়ে তৈরী ‘উদ্ভাবকের দেশে’

Published : 2017-04-12 21:25:00, Updated : 2017-04-12 21:38:03
নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্রেইল বইয়ে হাত বুলিয়ে পড়া অথবা শিক্ষকের কথা শুনে মনে রাখা। এভাবেই এতো দিন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা পড়াশোনা করতেন। কিন্তু স্কুলে পর্যাপ্ত বই কোথায়! ‘আমি যখন স্কুলে ছিলাম, পড়ার জন্য বই পেতাম না। যদিও বা পেতাম, তা থাকত ১০/১২ বছরের পুরানো। সিলেবাসের সঙ্গে কোন মিলই থাকতোনা। বই এর সংখ্যা এতোটাই অপ্রতুল ছিল। কত কষ্ট করে যে পড়েছি!’- বলছিলেন বিশেষভাবে সক্ষম ভাস্কর ভট্টাচার্য। তার আরেকটি পরিচয় তিনি ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক এর উদ্ভাবক।
কি এই, ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক? এটি এমন একটি সফটওয়্যার, যেখানে বাংলাদেশের শিক্ষাবোর্ডের সবগুলো পাঠ্যবই এর ডিজিটাল ভার্শন পাওয়া যাবে। এখানে বইগুলো একইসঙ্গে দেখা, পড়া এবং শোনা যাবে। ফলে শুধু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নয়, শ্রুতি প্রতিবন্ধী, অন্যান্য প্রতিবন্ধী, নিরক্ষরসহ অন্যান্য শিশুরা সবাই এখন এই বইয়ের সাহায্যে লেখাপড়া করতে পারবে।
কিন্তু এমন একটি সফটওয়্যার কেন তৈরি করলেন ভাস্কর বাবু? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘আমার মেয়ে যখন এসে বলত, আমাকে একটু পড়িয়ে দাও। কিন্তু ওর বই তো আমি দেখতে পাচ্ছিনা। আমি পড়াতে পারতাম না। বলতাম, মায়ের কাছে যাও। আমার খুব খারাপ লাগত।’ বলছিলেন ভাস্কর ভট্টাচার্য। ‘তখন আমি ভাবলাম, এমন একটা বই তৈরি করা যায় কিনা, যা সবাই পড়তে পারবে। সেখান থেকেই আমার ‘ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক’ তৈরি করা।’
ভাস্কর বাবুর করা বই এখন সবাই পড়তে পারে, সবাই দেখতে পারছে। দেশের কোটি কোটি মানুষ এর সুফল ভোগ করছে, এতেই ভাস্কর ভট্টাচার্যের আনন্দ। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সোহেলী বলেন, ‘ব্রেইল বই আগে পেতাম না খুব একটা। তাই খুব সমস্যা হত। তবে এখন সেই সমস্যা অনেকটাই কেটে গেছে মাল্টিমিডিয়া বই থাকাতে। এখন নিজেরাই নিজেদের বই পড়তে পারছি এবং উপকৃত হচ্ছি।’
কিভাবে কাজ হচ্ছে?
এর পেছনে লাগাতার কাজ করে যাচ্ছে বিশাল এক দল যার ৮০ ভাগই শারীরিক প্রতিবন্ধি। কেউ টাইপ করেন, কেউ সেটা এডিটিং করেন। এখানে যেসব সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, সবগুলোই ওপেন সোর্স। আপনি সহজেই এগুলো ইন্টারনেটে খুঁজে পাবেন। তাই সফটওয়্যারটি ব্যবহারে কোন টাকা খরচ হচ্ছেনা।  
‘এই বই যদি বাংলাদেশের সবখানে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে প্রতিবন্ধীদের জন্য পড়াশোনা করা অনেক সহজ হবে। এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরাও একেক জন মানবসম্পদে পরিনত হবে।’- বলছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মনিরুল ইসলাম।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাস্কর ভট্টাচার্য এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক দেশি বিদেশি পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই এর সহযোগীতা। তিনি বললেন, ‘প্রতিবন্ধীরা এখন আর পিছিয়ে থাকবেনা। আমরা এখন জাতীয় সম্পদে পরিনত হচ্ছি। আমরা বলি - “দান দয়ার দিন শেষ, প্রতিবন্ধীরাই গড়বে ডিজিটাল বাংলাদেশ।” মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল টকিং বুক গ্রামে, ইউনিয়নে সব জায়গায় ছড়িয়ে দেবার জন্য কাজ করে যাচ্ছে এটুআই।
এই বইটি শুধু পড়া যায় তাই নয়, প্রিন্ট ও করা যায় সহজে। তাই এবছর ২০১৭ সালের শুরুতে বই তুলে দেবার দিনই ১১ হাজার সেট এই মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল টকিং বুক বিতরণ করা হয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য।  একই সঙ্গে এটা যেহেতু সফটওয়্যার, সহজেই কপি পেস্ট করে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ ডিজিটাল সেন্টারে পৌছে দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে যে কেউ চাইলেই এটিকে কপি করে নিতে পারবে এবং ব্যবহার করতে পারবে। ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় বলে লাইসেন্স জনিত কোন সমস্যা নেই। একদম বিনামূল্যে এই সফটওয়্যারটি সবাই ব্যবহার করতে পারবেন। আজ এভাবেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়াশোনা করার ধারনাটাই পাল্টে দিলেন ভাস্কর ভট্টাচার্য। তৈরি করলেন মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল টকিং বুক বা কথা বলা বই।
ভাস্কর এর গল্প:
প্রযুক্তিগত জ্ঞানের মাধ্যমেই ভাস্কর ভট্টাচার্য আজকের এই অবস্থায় এসেছেন। আপনারা যেমন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই খবরের কাগজটি হাতে নিয়ে পড়েন, সেভাবে ভাস্কর ভট্টাচার্যও স্মার্টফোন হাতে নিয়ে পত্রিকার খবর জানতে বসে যান ঘুম ভাঙতেই। অন্য কারো সাহায্য ছাড়াই দিনের বেশিরভাগ কাজ সেরে ফেলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতে ইচ্ছে ছিল, কোন একটি সরকারী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন। কিন্তু পড়া শেষ করে এক বছরের একটা স্কলারশিপ নিয়ে জাপান চলে যান। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগীতা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুস সামাদ। জাপানের এক বছরের পড়াশোনাই জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দিল ভাস্কর ভট্টাচার্যের। ফিরে আসেন নতুন কিছু করার প্রত্যয় নিয়ে। সঙ্গে কম্পিউটার শিক্ষা এবং নতুন কিছু করে দেখানোর স্পৃহা। কিন্তু এরপর একটা বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন চাকরি পাননি। আসরে কেউ আস্থা রাখতে পারছিলেন না যে ভাস্কর বাবু নতুন কিছু করে দেখাবেন। হতাশ হয়ে পরবেন, এমন সময়ে চট্টগ্রামের স্থানীয় একটি সংগঠন ইপ্সা (ইয়াং পাওয়ার ইন সোশাল অ্যাকশন) এর সঙ্গে যুক্ত হন। শুরু হল নতুন কিছু করার সূচনা।
এখন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই)তে ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট ইন অ্যাকসেসিবিলিটি হিসেবে তিনি কর্মরত আছেন। এখন প্রতিদিন সাদা ছড়ি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যান ভাস্কর ভট্টাচার্য। আর সারাদিন কাজ করেন, দেশের কোনায় কোনায় আলো ছড়িয়ে দিতে।
এমন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ১৯ টি উদ্ভাবন নিয়ে ১৪ পর্বের একটি অনুষ্ঠান ‘উদ্ভাবকের দেশে’ নির্মাণ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম-এর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া (এইচডিএম)। ‘উদ্ভাবকের দেশে’ অনুষ্ঠানটি গত ১৯ জানুয়ারি থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রাত ১০ টার সংবাদের পর বিটিভিতে নিয়মিত প্রচারিত হয়ে আসছে। এটুআই কর্তৃক সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে আসছে। যাতে করে জনগনের দোরগোড়ায় সরকারি-বেসরকারি সেবাসমূহ পৌঁছে দিতে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। এটুআই-এর এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রক্ষিতে সারাদেশের সরকারি কর্মকর্তাগণ সরকারি-বেসরকারি সেবাসমূহ সহজিকরণে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে বাছাইকৃত ১৯ টি উদ্ভাবন নিয়ে ১৪ পর্বের অনুষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিটিভিতে ১৪ পর্বের মধ্যে ১১ পর্ব এবং এটিএন নিউজে ১০ পর্ব প্রচারিত হয়েছে। জনগনের অনুরোধের প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানটি সংসদ টেলিভিশনে সন্ধ্যা ৬ টা ৩০ মিনিটে পুনঃপ্রচার করা হচ্ছে।