বুধবার ২৩ আগস্ট, ২০১৭, রাত ০২:৩৬

বুক চেরা পৃথিবী

Published : 2017-04-09 22:51:00, Updated : 2017-04-10 09:48:31, Count : 432
সেলিম আজাদ চৌধুরী: দুপুরের একটু পর হুবার ড্যাম থেকে রওনা দিলাম ফ্ল্যাগস্টাফ শহরের উদ্দেশে। এবারের যাত্রার গন্তব্য গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম ফ্ল্যাগস্টাফ শহরে। এটি আরিজোনার একটি শহর। নেভাদার এককালের দুর্গম পাথুরে পাহাড়ি পথ এখন অপূর্ব কারিগরি দক্ষতায় হয়ে উঠেছে নির্মাণশৈলীর সাক্ষী। সেসব পথ তরতর করে পার হয়ে আমরা পড়লাম আরিজোনায়। একই দৃশ্যপট, পাহাড়ি পথ। একটু পর পড়লাম আরিজোনার ঊষর মরুভূমিতে। যতদূর চোখ যায় বালির ঢেউয়ে ছোট ছোট হালকা-পাতলা ঝোপঝাড়। বহুদূর দিগন্তে উঁচু উঁচু পাহাড়ের উদ্ধত শিখর জানান দিচ্ছে এই সমতল তার পদানত। জনশূন্য বিজন মরুতে মাঝে মাঝে দূরে দূরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে দুয়েকটা ছন্নছাড়া ঘরবাড়ি। চলতে চলতে হারিয়ে যাই জন ওয়েনের গ্রেট ওয়েস্টার্ন ছবির জগতে। মনে হচ্ছে পাহাড়ের আড়াল থেকে এখনই হুই হুই শব্দ করে দুর্দান্ত বেগে ছুটে আসবে মৃত্যুদূত অ্যাপাচির দল। গাড়ি চলছে তো চলছেই, যেন এক অন্তহীন পথচলা। দেশে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি এই লম্বা পথে একাকী অনবরত গাড়ি চালানো কষ্টকর, ক্লান্তিকর। ফাহিমের পাশে বসে মাঝে মাঝে আমার ঝিমুনি লাগছিল। তন্দ্রা কেটে গেলে মনে হচ্ছিল, এ আমি কী করছি। বেচারা ফাহিম অবিশ্রাম গাড়ি চালাচ্ছে আর আমি ঘুমাচ্ছি। আমি দেশে মোটামুটি ভালোই গাড়ি চালাই। কিন্তু এখানে গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, এখানে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আর আমরা দেশে ডান হাতে গাড়ি চালাই। এখানে চলে বাঁ হাতে। ফাহিমের একঘেয়েমি কাটাতে আমি মাঝে মাঝে এটা সেটা নিয়ে কথা বলছি। বললাম, এই বিশাল প্রান্তর এরা কোনো উত্পাদনকাজে লাগাচ্ছে না। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে এর থেকে অনেক বেশি রুক্ষ মরু অঞ্চলে চাষাবাদ হচ্ছে। চাষবাস না করলেও মার্কিনরা এখানে অনেক বড় বড় কলকারখানা করতে পারে। কেন করছে না বুঝি না। অবশ্য এখানে সস্তা শ্রমিকের অভাব। আমাদের দেশে মানুষ উপচে পড়ছে। চাইলে এরা প্রয়োজনীয় শ্রমিক আমাদের দেশ থেকে নিয়ে আসতে পারে। শিল্পায়নের জন্য সস্তা শ্রমের বিকল্প নেই। চীন দেশে একসময় বিশ্ববাজারের তুলনায় শ্রম সস্তা ছিল। ফলে সামগ্রীর উত্পাদন খরচ পড়ত কম। আর কম মূল্যে সামগ্রী বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজার সহজেই কব্জা করেছে। বর্তমানে জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য এখন চীনের শ্রম আর আগের মতো সস্তা নেই। পরিস্থিতি মোকাবেলায় চীন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। পোশাকের অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রয়োজন মেটাতে চীন বাংলাদেশে প্রস্তুত পোশাক আমদানি করছে। পক্ষান্তরে নিজেদের বেশি মূল্যের শ্রমে প্রস্তুতকৃত সামগ্রী রফতানি করছে। গত কয়েক বছরে চীনের প্রবৃদ্ধি আর আগের মতো নেই। ভবিষ্যতে দেখার বিষয় চীন তাদের প্রবৃদ্ধি কীভাবে বজায় রাখে। এসব আলোচনা করতে করতে চোখে পড়ল বেশ কয়েকটি সাইনবোর্ড। সেগুলোর কোনোটাতে লেখা ৫৭০ একর জমি বিক্রয় হবে, কোনোটাতে লেখা রয়েছে ৩২১ একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। বুঝলাম, আপাতদৃষ্টে এসব পতিত জমির বেশির ভাগই ব্যক্তিমালিকানাধীন। অর্থাত্ অদূর ভবিষ্যতে এই বিশাল প্রান্তর আর পতিত থাকবে না। এই প্রান্তর হয়তো হয়ে উঠবে সুজলা সুফলা। তখন আমেরিকার অর্থনৈতিক ভিত হবে আরও মজবুত। বিশ্ববাসীর কাছে আমেরিকার আকর্ষণ এমনিতেই বিপুল। ভবিষ্যতে সে আকর্ষণ বৃদ্ধি ছাড়া কমার কোনো কারণ দেখি না। চলতে চলতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। সবাই উদরের বিদ্রোহের লক্ষণ অনুভব করছে। আমাদের বাহনের উদরপূর্তি করার দরকার পড়েছে। সামনে দেখা যাচ্ছে ‘সেলিগ্রাম’-এর এক্সিট অর্থাত্ এই পার্শ্বরাস্তা দিয়ে সেলিগ্রাম শহরে যাওয়া যায়। ফাহিম বলল, ওখান থেকে গাড়ির তেল নেব আর খাবার কোনো ব্যবস্থা হয় কি না দেখি।
হাতের বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি দূরে প্রান্তরের ভেতর কয়েকটি ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখা গেল গোটা ১৫-২০ ঘরের শহর। গ্যাস স্টেশনে গাড়ি দাঁড়ালে ফাহিম বলল, ওই যে, কনফেডারেশনের পতাকা। তাকিয়ে দেখি বিচিত্র রঙের কয়েকটি পতাকা ঝুলিয়ে হাতে প্রস্তুত সামগ্রী বিক্রির চেষ্টা হচ্ছে খোলা জায়গায়। বুঝলাম এগুলো নেটিভ ইন্ডিয়ানদের প্রস্তুত করা জিনিসপত্র। ফাহিমকে জিজ্ঞাসা করলাম কনফেডারেশনের পতাকা মানে কী? ফাহিম বলল, আমেরিকার সিভিল ওয়ারের আগে এই পতাকগুলো তত্কালীন অঙ্গরাজ্যগুলো ব্যবহার করত। সিভিল ওয়ারের পর সম্পূর্ণ আমেরিকায় বর্তমান পতাকার ব্যবহার শুরু হয়।
গাড়িতে গ্যাস (আমেরিকায় অকটেনকে গ্যাস বলে) নেওয়া শেষ। ওখানে খাবার মতো কোনো রেস্তোরাঁ বা দোকানপাট পাওয়া গেল না। কাজেই গাড়ি ঘুরে ফেরার পথের রাস্তার উল্টো দিকে নজর পড়তেই আমি রোমাঞ্চিত। একটি রেস্তোরাঁর সামনে কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ির চাকা, রেড ইন্ডিয়ানদের থাকার কয়েকটি কাঠের ভাঙাচোরা তাঁবুর মতো ঘর। আমার স্থির বিশ্বাস, এগুলো সবই আসল, সংরক্ষিত সম্পদ। গাড়ি হাইওয়েতে উঠে আমাদের গন্তব্য ফ্ল্যাগস্টাফ শহরের পথে আবার রওনা হয়েছে। তখনও আমার মনের ভেতর রেড ইন্ডিয়ান ছবির দৃশ্যের মতো ‘সেলিগ্রাম’-এর ছবি ভাসছে।
একটু পর আমরা পৌঁছে গেলাম ফ্ল্যাগস্টাফ শহরে। ভেবেছিলাম ছোটখাটো শহর হবে এটা। বাস্তবে মোটামুটি বড়ই। এক জায়গায় জড়ো করা শহর নয়, ছড়ানো-ছিটানো থোকা থোকা। বর্তমানকালে আমেরিকায় রাস্তাঘাট চেনার বালাই নেই। কারণ, সে কাজটির দায়িত্ব জিপিএসের। অন্ধের হাতের ছড়ি যেমন অন্ধকে পথের নির্দেশ করে। জিপিএস-ও তাই রাস্তা চিনিয়ে আপনাকে গন্তব্যে টেনে নিয়ে যাবে। তবে গন্তব্যের ঠিকানাটা জিপিএসকে জানাতে হবে। আমরা আমাদের গন্তব্য সুপার ৮ রেস্ট হাউসে পৌঁছে জিনিসপত্র রেখেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বের হতে হল আর্লি ডিনারে। তখন বিকেল ৪টা বাজে। যেহেতু দুপুরের খাওয়া হয়নি, তাই একবারেই রাতের খাবার। ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁটিও বের হয়েছে গুগলের গুণে। এর অবস্থান হল আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সামনে লাগোয়া। চমত্কার রেস্তোরাঁয় বসে কথার ছলে বললাম, এত দূরদেশে ভারতীয় রেস্তোরাঁ বিস্ময়ের বিষয়। ফাহিম জানাল, আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়টি অত্র অঞ্চলের একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক ভারতীয় বিদ্যার্থী আছে এখানে। এছাড়াও অনেক ভিনদেশি ভারতীয় রান্না পছন্দ করে। বেচাবিক্রির সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম অনেকেই ভারতীয় নয়। সেদিন সেই ভারতীয় রেস্তোরাঁয় ভিআইপি কাস্টমার ছিল আমার ১৩ মাস বয়সী নাতনি নবনী। টলমল পায়ে টেবিলে টেবিলে ঘুরে সবার খোঁজখবর করছিল, হাই বলে। বিশেষত ১২-১৩ বছরের নিচে সবাই তার কাছে বেবি। সবাইকে সেভাবেই সম্বোধন করে। আমরা প্রথমে এক-আধটুকু বাধা দিলেও পরে দেখলাম এই ফুটফুটে শিশুটির চলাফেরায় সবাই বেশ মজা পাচ্ছিল বলে তার স্বাধীন চলাতে আর বাধা দিইনি। চলে আসার সময় অনেকেই তাকে বাই বাই জানাল।   
পরদিন সকালে নাশতা সেরে আমরা রওনা দিলাম গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে। শহর পার হলেই আবার ঊষর মরুভূমির রাস্তা। কোথাও পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে, কোথাও কেবল মরুপথ। সবখানেই চমত্কার রাস্তা, যেন এই মাত্র বানানো। তরতর করে এগিয়ে চলেছি। কিছু পরে নজরে পড়তে থাকল রাস্তার পাশে ছোট ছোট অস্থায়ী স্থাপনা, যেগুলোতে নেটিভ আমেরিকানরা বিভিন্ন হস্তশিল্প বিক্রি করছে। সারাদিন বেচাবিক্রি করে শহরের ঘরে ফিরে যায়। একটি জায়গায় আমরা থামলাম। ওখানে ভূপ্রকৃতি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের আদলে গঠিত। পাহাড় ভেঙে বিশাল গহ্বর সৃষ্টি হয়েছে। তার ভেতর দিয়ে একসময় নদী প্রবাহিত হতো। এখন শুষ্ক খটখটে। দেখার জন্য কর্তৃপক্ষ লোহার ঘের দিয়ে পরিদর্শন স্থান বানিয়ে দিয়েছে। জায়গায় জায়গায় সতর্কতা নির্দেশনা স্থাপন করা। দেখা শেষে নেটিভদের দোকানে ঘুরব, এ সময় বড় মেয়ে হূদি এক পাশে টেনে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, ভুলেও এদেরকে নেটিভ বলো না, তাহলে বড় বিপত্তি হবে। নিগ্রোদেরকে নিগার বললে যেমন উত্তম-মধ্যম খাওয়ার সম্ভাবনা, এদের বেলায়ও সেরকম ঘটতে পারে। কাজেই মুখে কুলুপ লাগিয়ে দোকানে ঢুকে এটা-সেটা দেখছি। সব জিনিসই অতীত ঐতিহ্যনির্ভর মনোগ্রাহী শিল্পকর্ম। তবে ৫ ডলারের কমে কিছুই মিলবে না। অনেক খুঁজে একটা পাথুরে কুড়াল কিনলাম। মনের আনন্দে গাড়িতে উঠতে যাব, হঠাত্ দেখলাম সারোয়ার সাহেব একটি গাড়ির আড়াল হয়ে গেলেন যেন। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে এক সময়কার অফিস সহকর্মীকে দেখে আনন্দে নেচে উঠল প্রাণ। স্থান কাল অবস্থান ভুলে কিছুটা শব্দ করেই ডাকলাম, সারোয়ার ভাই। আশেপাশের লোকজন, আমার স্ত্রী ও মেয়েরাও অবাক হয়ে দেখল আমাকে। সারোয়ার সাহেবের স্ত্রী-সন্তানকে চিনতাম। আমি ভালো করে লক্ষ করলাম সারোয়ার সাহেবের সঙ্গে পরিবার-পরিজনকে। না কাউকে পরিচিত মনে হল না। এর ভেতর সারোয়ার বলে যাকে ডাকলাম তিনি আড়াল থেকে সামনে এলেন। না, তিনি সারোয়ার সাহেবের অবিকল হলেও আসলে সারোয়ার নন। আমার বিভ্রান্ত অবস্থায় মেয়ে বলল, তোমার কি মনে হয় সারোয়ার সাহেবের সন্তানরা এখনও শিশু? আমি বোকা বনে গেলাম। তাই তো, সারোয়ার সাহেবের সন্তানরা আমার বড় মেয়ের সমবয়সী। আমি লজ্জা পেলাম। মনে মনে বললাম, আসলে আমার কোনো দোষ নেই। অবচেতন মনের গভীরে ঘরকুনো মনটা দারুণ সক্রিয়। তাই হয়তো এমন ঘটেছে। আবার চলার শুরু। গাড়ি ছুটে চলেছে ৬০-৬৫ মাইল বেগে। এর ভেতর আমাদের গাড়ি অতিক্রম করে ঝড়ের বেগে চলছে ৫-৬টি মোটরসাইকেল। দুই চাকার বলে সাইকেল বলছি। আসলে আকারে ওগুলো ছোটখাটো মোটর গাড়ির সমান। সওয়ারিগুলোও বিচিত্র। আমাদের দেশে অল্পবয়সী তরুণরা জীবনের উদ্দামতা দেখাতে দুরন্ত বেগে মোটরসাইকেল চালায়। কিন্তু এখানে দৃশ্যপট ভিন্ন। আমাদের দেশে সাধারণত যে বয়সে মানুষ মৃত্যুচিন্তায় আক্রান্ত হয়, মার্কিন মুলুকে মোটরসাইকেলে গতির ঝড় তুলে মাঝবয়স পার হওয়া যুবকরা। এদের মোটরসাইকেলগুলোর বিশালত্ব দেখে মনে হয় সাধারণ আকারের মানুষের পক্ষে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দুরূহ। মনের ভেতর জানার আগ্রহ, এই মাঝবয়স পার হওয়া মানুষগুলো এই দুরন্ত বেগে মোটরসাইকেল কেন চালায়। মওকা মিলে গেল দিন দুয়েক পর ফ্ল্যাগস্টাফ শহর থেকে বের হওয়ার আয়োজন করে হোটেলের নিচে গাড়ির কাছে এসে দেখি ৫টি বিশাল মোটরসাইকেল। রাস্তায় নামার আগে গাড়ির ঝাড়মোচ চলছে। পাঁচজন চালকও গায়েগতরে বেশ। গায়ের টি-শার্টে লেখা, ভিয়েতনাম ওয়ার ভেটারেন। আমাদের গাড়ির কাছের চালকের কাছাকাছি গিয়ে প্রশংসনীয়ভাবে বললাম, সুন্দর আর বেশ বড় মোটরসাইকেল। জানতে চাইলাম, কত মাইল যায় গ্যালনে। ভদ্রলোক আমার কথা হয়তো ভালো করে বুঝলেন না। তবে অবাক করা একটা তথ্য দিলেন যে, তারা এর ভেতর সাড়ে তিন হাজার মাইল রাস্তা পার করেছেন, ওকলাহোমা থেকে আরিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ পর্যন্ত। এবারের গন্তব্য লাস ভেগাস। আমি বললাম, এত লম্বা পথ গাড়ি চালাতে ক্লান্তি লাগে না? ভদ্রলোক হাসলেন একটু। বললেন, আমরা সবাই ওয়ার ভেটারেন। আমরা চারজন ভিয়েতনাম ওয়ার ভেটারেন। অল্পবয়সী একজনকে দেখিয়ে বললেন, ও ইরাক ওয়ার ভেটারেন। আমি বললাম তোমরা তাহলে বেশ উপভোগ করো এই ভ্রমণ। বললেন, অবশ্যই। তবে রাতে বিশ্রাম নিই। যেমন গতরাত নিয়েছি এই হোটেলে। জানতে চাইলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ। বললাম, এখন লাস ভেগাস। আমাদের একই গন্তব্য। তোমার গাড়ি আছে? না হলে তোমাকে আমার গাড়ির পেছনে চড়তে বলতাম। বললাম, তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ তোমার গাড়ি চড়ার প্রস্তাবের জন্য। আশা করি তোমাদের যাত্রা উপভোগ্য আর নিরাপদ হবে। বলল, তোমাকেও ধন্যবাদ।
আমরা প্রায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এসে পড়েছি। তবে অবাক হচ্ছি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কোনো লক্ষণ না দেখে। চারদিকে গাছপালা ঝোপঝাড়ে ভর্তি বনজঙ্গল। একটু পর হাতের ডানে পথনির্দেশনা, ওদিকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দক্ষিণ দৃশ্য দেখার স্থান। পার্কিংয়ে গিয়ে দেখা গেল গাড়ি রাখার মতো খালি নেই, পার্কিং নেই। শত শত না বলে হাজার হাজার গাড়ির বাজার বলাটা ঠিক হবে। এ পথ সে পথ ঘুরে অবশেষে গাড়ি রাখা গেল। আমাদের ১৩ মাস বয়সী সফরসঙ্গী, নবনী গাড়ি থেকে নেমে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওকে নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত জটিল কাজ। এর ভেতর ওর খাবার সময় হয়ে গেল। ঠিক হল আগে নবুর খাওয়ার কাজ শেষ হোক, তারপর আমাদের ক্যানিয়ন দেখার কাজ। হরেক রঙ, হরেক বয়সী মানুষের আগমন। এমনকি কেউ কেউ এসেছেন হুইলচেয়ারে। জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণে। একটু রোমাঞ্চ লাগল এই ভেবে যে আমি ১০ হাজার মাইলের অধিক পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর এই অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখতে এসেছি। এমন ভাবনার পিঠে আবার বৈসাদৃশ্য একটি ভাবনাও আমাকে একটু পীড়া দিচ্ছে। বন্ধুবান্ধবের কাছে চট্টগ্রামের বান্দরবানের প্রাকৃতিক দৃশ্যের গুণগান শুনে কতদিন ধরে পরিকল্পনা করছি যাওয়ার। এ কাজ সে কাজ কখনও সঙ্গী-সাথির অভাবে আর যাওয়া হয়নি। অথচ আজ গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এসেছি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে। মনে পড়ে গেল, রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত পঙিক্তটি-‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু’।
আমাদের নবুর খাওয়া শেষ আর আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সময়। সামনে একটা পথের বাঁক নিতেই চকিতে চোখের সামনে উদ্ভাসিত হল পৃথিবীর এক অপরূপ দৃশ্য। যতদূর চোখ যায় হরেক রঙের পরতে পরতে সাজানো পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে অন্তর্জগত্ পর্যন্ত। সামনে এগিয়ে নিচে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করলাম কত গভীর ক্যানিয়ন। দেখলাম বহুদূরে নিচে সাদা ফিতার মতো চকচক করছে কলোরাডো নদী। বিভিন্ন সাইনবোর্ড লেখা ক্যানিয়নের নিচে নদীর প্রস্থ ৩০০ ফুট। বুঝলাম কত দূরে হলে ৩০০ ফুট একটি ফিতার আকৃতি পায়। সাইনবোর্ডে দেখলাম ওপর থেকে ক্যানিয়নের উপত্যকা এক মাইল গভীর। আমার স্ত্রী ঝুমা, মেয়ে হূদি ও সিঁথি, মেয়ের জামাই ফাহিম ছবি তুলছে। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছি সৃষ্টির অপার রহস্য। দেখতে দেখতে আমার মনে হচ্ছিল এই এক নিঃসঙ্গ সৃষ্টি। কোনো এক অপার রহস্যে পৃথিবী নিজের বুকের পাঁজর চিরে যেন বলছে, এই আমাকে দেখ আমি এ রকম। আমার মনে হল লাশ কাটা ঘরের টেবিলের ওপর আদিগন্ত বিস্তৃত একটি উদোম লাশ যেন পড়ে আছে। সুরতহাল করার জন্য লম্বালম্বিভাবে বুকের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত করা। এখনও তাজা লাশ। চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে লাশের গা বেয়ে। এই আমার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখা। হাজার বছর ধরে মানুষ আসবে-যাবে, তবে কেউই সঙ্গী হবে না এই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের। আরও লাখ লাখ বছর সে পড়ে থাকবে একাকী এই রকম। এক বিরহী পৃথিবীর দৃশ্যে বুকে নিয়ে ফিরে এলাম বিষণ্ন মনে।
লেখক : সমাজসেবী