শনিবার ২১ অক্টোবর, ২০১৭, সকাল ০৭:২৩

তারুণ্যের শিক্ষা : সমকালীন বাস্তবতা

Published : 2017-04-09 22:51:00, Updated : 2017-04-10 09:46:05, Count : 419
খন রঞ্জন রায়: আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশে কৃষিই মানুষের মূল জীবিকা। ভূ-উত্পত্তিগতভাবে এদেশের জমি উর্বর। মূলত কৃষিব্যবস্থার মধ্যেই গড়ে উঠেছে বাঙালি সমাজ। দেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সরাসরি কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। এ তিন-চতুর্থাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চলে কৃষি উত্পাদন ও কৃষি বিপণন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে। তদুপরি কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে পুঁজির অভাব, স্বল্প মূল্যে উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক দ্রব্য না পাওয়া, উত্পাদিত ফসল ভাগাভাগিতে বর্গাচাষিদের বঞ্চিত করা, ভূমিস্বত্ব ও ভূমি সংস্কার কৃষকদের অনুকূলে না থাকা, উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, উত্পাদিত কৃষিদ্রব্যের সংরক্ষণ গুদাম না থাকা এবং বাজারজাত করার সমস্যা। খাদ্যশস্যের মূল্য হ্রাস ও স্থিতিশীল রাখা সরকারি নীতির অন্তর্গত হওয়ায় কৃষিদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় না। অথচ আমদানিকৃত পণ্য, স্থানীয় শিল্পপণ্যের মূল্য অবিরত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সার, বীজ, কীটনাশক, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে কৃষির উন্নয়ন। তাই এদেশে কৃষিক্ষেত্রে যেসব সমস্যা বিরাজমান, সেগুলো সুষ্ঠুভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে কৃষিতে উল্লেখযোগ্য হারে উত্পাদনশীলতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। কৃষির বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। যেমন বাংলাদেশে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি সাধন করতে হলে যান্ত্রিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রবর্তন করতে হবে। কম সময়ে, কম খরচে যাতে অধিক ফসল উত্পাদন সম্ভব হয়, এজন্য এদেশের সর্বত্র আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সম্প্রসারণ করতে হবে। এদেশের কৃষির উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রাচীন চাষাবাদ পদ্ধতির পরিবর্তে ট্রাক্টর, বুলডোজার, শক্তিচলিত পাম্প প্রভৃতি আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রচলন করে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। যদিও বাংলাদেশে সম্প্রতি যান্ত্রিক চাষাবাদ পদ্ধতির কিছুটা প্রচলন হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত ও নগণ্য বলা যায়।
কৃষির উন্নতির লক্ষ্যের জমির উপবিভাগ ও খণ্ডীকরণ রোধ করতে হবে। উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করে কিংবা সমবায় খামার প্রতিষ্ঠা ও বিনিময় প্রথার মাধ্যমে ক্ষুদ্র জমিগুলো একত্রিত করতে হবে। ফলে জমিগুলো আকারে বড় হবে এবং উন্নত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রবর্তন করে কৃষির ফলন বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক নিরক্ষর ও অজ্ঞ বিধায় তাদের মধ্যে পুঁথিগত বিদ্যাসহ কৃষি বিষয়ক শিক্ষা প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য দেশে অধিক সংখ্যক তরুণ শিক্ষার্থীকে কৃষির বিভিন্ন বিষয় সুনির্দিষ্ট করে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করতে হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে আভির্ভূত হয়েছে।
বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অদক্ষ, কারিগরি জ্ঞান না থাকা অশিক্ষিত কর্মীরা সেসব দেশের দক্ষ-অভিজ্ঞ কারিগরি জ্ঞান জানা শিক্ষিত কর্মীদের তুলনায় অনেক কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অদক্ষ, আধাদক্ষ ডিপ্লোমা শিক্ষা না থাকা শ্রমিক, কর্মীদের বেতন নিয়ে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, মালিকের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ থাকে না। তারা অন্যান্য দেশের ডিপ্লোমা জ্ঞান থাকা শিক্ষিত দক্ষ শ্রমিক কর্মীদের তুলনায় এ ক্ষেত্রে দুর্বল এবং অসুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন। অনেকটা বাধ্য হয়ে তারা অপেক্ষাকৃত কম বেতনে সেখানে কাজ করেন। এ কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। ফলে বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানি খাত থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। যদি ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষিত তেমন উপযুক্ত কাজ নিয়ে বাংলাদেশের কর্মীরা বিদেশে যেতে পারে তাহলে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে অন্যান্য দেশের কর্মীদের টেক্কা দিতে পারত। বাংলাদেশে ৪ কোটি ১৭ লাখ তরুণের মধ্যে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত আর অশিক্ষিত প্রায় অর্ধেক তরুণযুব ডিপ্লোমা শিক্ষার অভাবে কর্মহীন জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটেছে বাংলাদেশে। এটাও আমাদের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। জনবহুল একটি দেশের বেশিরভাগ নারী-পুরুষ যদি কর্মক্ষম এবং উপার্জনক্ষম হন তাহলে সেদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্বাভাবিকভাবেই মজবুত হতে বাধ্য। দেশটি স্বাধীন হয়েছে সাড়ে চার যুগ হয়েছে। সামনে আমরা সুবর্ণজয়ন্তী উত্সব পালন করব এই দীর্ঘ সময়ে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল তৈরির সুর্নিদিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারিনি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভ্রান্ত সৃষ্টির ডিপ্লোমা শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তো হয়নি বরং দিন দিন বৈষম্য পুষে রাখার শিক্ষাকে উসকে দেওয়া হয়েছে। সময় হয়েছে ঔপনিবেশিক মানসিকতার শিক্ষাব্যবস্থা উপড়ে ফেলার। জনসংখ্যামিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার কর্তৃক গ্রহণীয় ২০১০-এর শিক্ষানীতি সুপারিশের আলোকে ডিপ্লোমা শিক্ষাকে মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করা। আর তা সম্ভব হলেই যুবতরুণদের উচ্ছন্নে যাওয়া রোধ হবে। কর্মক্ষম সৃষ্টিশীল মননশীল প্রজন্ম তৈরি হবে। সমকালীন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠবে।
লেখক : সমাজসেবক