বৃহস্পতিবার ১৮ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৬:১৯

থেমে গেল হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানার চাকা

Published : 2017-04-08 23:24:00
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ দিনের টানাহেঁচড়া ও নানা বিতর্কের পর অবশেষে থামল রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানার চাকা। গতকাল দুই শতাধিক ট্যানারির গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম চালায় পরিবেশ অধিদফতর। পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এ অভিযানে অংশ নেন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা) ও তিতাস গ্যাসের প্রতিনিধিরা। আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার জন্য দায়িত্বে ছিলেন হাজারীবাগ থানার পুলিশ সদস্যরা।
অভিযানের প্রথম দিনেই সব ট্যানারির গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ কারণে আজ রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও তার আর দরকার পড়ছে না বলে জানান পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল সকাল ৯টা থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়। পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) রাইসুল আলম মণ্ডল হাজারীবাগে উপস্থিত থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কার্যক্রম তদারকি করেন।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের নির্দেশ মতো আমরা হাজারীবাগের সব ট্যানারি কারখানার সব ধরনের সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি।
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) মোহাম্মদ আলমগীর সকালের খবরকে জানান, গতকাল সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান চালানো হয়। এ সময়ের মধ্যে বিদ্যুত্ সংযোগ ২২৪টি, পানি সংযোগ ১৯৩টি এবং গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় ৫৪টি। উল্লেখ্য, এর আগেই ১২৩টি টেলিফোন লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) বলেন, আমরা ধারণা করেছিলাম এক দিনে সব কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না, তাই দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু সবার সহযোগিতায় এক দিনেই সব কারখানার সব ধরনের সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে বিকেলের দিকে সংযোগ বিচ্ছিন্নকারী টিমের সংখ্যা বাড়িয়ে আমরা এক দিনের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করেছি। আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করব।
তিনি জানান, ট্যানারি কারখানার সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর যাতে অন্য কোনো উপায়ে কেউ কোনো ট্যানারি চালু করতে না পারে তার জন্য এক সপ্তাহ ওই এলাকায় টহল দেওয়া হবে। এ জন্য পরিবেশ অধিদফতরের একজন পরিদর্শকের নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমে সব ধরনের সেবা সংস্থার একজন করে সদস্য ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবারের মধ্যেই গ্যাস-বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু লোকবল সঙ্কটের কারণ দেখিয়ে পরিবেশ অধিদফতর দু’দিন পর গতকাল সকাল থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান শুরু করে।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের ডিজি রাইসুল আলম মণ্ডল বলেন, আমাদের লোকবল সঙ্কট রয়েছে। তাই বৃহস্পতিবার সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি।     
গতকাল হাজারীবাগ এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এবং পরিবেশ অধিদফতরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চারটি ইউনিট, বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ছয়টি ইউনিট ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চারটি ইউনিট কাজ করছে।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিদ্যুতের মিটার, জেনারেটর গ্যাস মিটার এবং গ্যাসের লেজার নিয়ে যাচ্ছেন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজে নিয়োজিতরা। এর বিনিময়ে যেসব সামগ্রী নেওয়া হচ্ছে তার প্রমাণ স্বরূপ লিখিত একটি কাগজ কারখানা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হচ্ছে।
গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজে নিয়োজিতরা জানান, জেনারেটর গ্যাস মিটার ও গ্যাসের লেজার নিয়ে যাওয়ার কারণে কারখানাগুলো তিতাসের লাইনের গ্যাস পাবে না। যদি কেউ নতুন মিটার লাগিয়ে গ্যাস সংযোগ নেয়, তবে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। মিটার না লাগিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ যদি চায় তাহলে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে পারবে। কারণ সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের জন্য এই মিটারের প্রয়োজন নেই।
অ্যাপেক্স কারখানার ভেতরে দেখা যায়, কারখানাটির একপাশে কয়েক নারী শ্রমিক কাজ করছিল। তাদের পাশেই ওয়েট ব্লু করা চামড়ার স্তূপ পড়ে রয়েছে। বিপরীত দিকে কিছু শ্রমিক ড্রাম সরানোর কাজ করছে। তার পাশেই কিছু শ্রমিক মেশিন সরানোর কাজ করছে। এ শ্রমিকরা অভিযোগ করে, সাভারে তাদের থাকার জায়গা না করেই এবং গ্যাস সংযোগ না দিয়েই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হল।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক রাইসুল আলম মণ্ডলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমাদের দায়িত্ব গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। আদালতের নির্দেশে আমরা সে কাজই করছি। তবে সংযোগ বিচ্ছিন্নের কাজে ট্যানারি মালিক ও শ্রমিকরা কোনো রকম বাধা না দিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করছেন বলেও তিনি জানান।
১১০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চাইবেন ট্যানারি মালিকরা : হাজারীবাগের ট্যানারিতে গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা চাইবেন ট্যানারি মালিকরা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কাছে এই টাকা দাবি করা হবে বলে জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ।
গতকাল হাজারীবাগে সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান চলাকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে গ্যাসের লাইন দেওয়া হয়নি। কিছু ট্যানারি আছে যারা সাভারে এখনও প্লট পায়নি। এছাড়া সেখানে আমাদের এখনও জমির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়নি। আমরা বলেছিলাম, চলতি মাসের ৬ তারিখের আগে যাতে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে গ্যাস লাইন এবং জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। গ্যাস ছাড়া আমরা সেখানে গিয়ে কী করব। আমরা তো উত্পাদনে যেতে পারব না।
তিনি বলেন, আমাদের জমির রেজিস্ট্রেশন না দিলে হাজারীবাগ থেকে আমাদের মেশিনারিজগুলো স্থানান্তর করতে পারব না। কেননা, আমাদের প্রত্যেকটা মেশিনারিজ ব্যাংকের কাছে বন্ধক দেওয়া রয়েছে। তাই সাভারে গিয়ে যদি আমরা নতুন করে বন্ধক না দিতে পারি, তাহলে হাজারীবাগ থেকে মেশিনারিজ নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সে বিষয়ে বিসিক আমাদের কোনো কথাই শুনছে না। তাই সুযোগ থাকলে আমরা এখন বিসিকের বিরুদ্ধে মামলা করব। এছাড়া সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই টাকা চাইব।
সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় উত্পাদন বন্ধ হওয়ার কারণে আমাদের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সংক্রান্ত ক্ষতি হবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এছাড়া সবকিছু মিলিয়ে আমরা ১১০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় করেছি।
সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের যে অর্ডারগুলো আছে, তার উত্পাদন আংশিক হয়েছে এবং আংশিক হয়নি। এখন উত্পাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যে পরিমাণ উত্পাদন হয়েছে তা স্টক হয়ে যাবে। এছাড়া যেটা হয়নি সেটা আমরা শিফটিং করতে পারব না। ফলে বায়াররা তাদের অর্ডার বাতিল করবে। এছাড়া ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন এবং কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতি মিলিয়ে প্রায় ১১শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।
উল্লেখ্য, গত ৬ মার্চ হাইকোর্ট হাজারীবাগ ছাড়তে ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন। পরে এ রায় সুপ্রিমকোর্টে বহাল থাকে। ট্যানারি মালিকরা ঈদুল আজহা পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করলে তা হাইকোর্টে খারিজ হয়ে যায়। ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে ১০ এপ্রিলের মধ্যে পরিবেশ অধিদফতরকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন আদালত। পরবর্তী সময়ে এই নিয়ে ট্যানারি মালিকরা আর কোনো আইনি লড়াইয়ে না যাওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্নের কাজ শুরু হয়।
সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা গ্রামে ১৯৯ একর জমির ওপর চামড়া শিল্পনগর প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে ১৫৫টি ট্যানারি শিল্প-কারখানাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। তবে বেশ কিছু ট্যানারি সেখানে প্লট পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও পরিবেশ অধিদফতর বলছে ওই ট্যানারিগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র নেই।

আরও খবর