সোমবার ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭, রাত ১০:২৮

দশ ট্রাক অস্ত্র : এপ্রিলের সেই সময়

Published : 2017-04-06 09:41:00
ড. শেখ আবদুস সালাম: এখন এপ্রিল মাস। আজ থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে এ মাসেই চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্রের একটি চালান ধরা পড়েছিল। সে সময়ে গণমাধ্যম থেকে এ ব্যাপারে অনেক তথ্য আমরা জানতে পেরেছিলাম। এসব তথ্য রটনা, না ঘটনা অথবা ঘটনার পেছনের ঘটনা তা নিয়ে সে সময় অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। অনেক সময় গণমাধ্যমে উঠে আসে যার সবকিছু কিংবা ‘নিগূঢ় সত্য’ আমাদের পক্ষে অনেক সময় জানা সম্ভব হয় না। তাত্ত্বিক বিচারে এজন্য গণমাধ্যম দায়ী নয়। গণমাধ্যম ঘটনা ঘটায় না কিংবা বানায় না-ঘটনা তুলে ধরে মাত্র।

অনেক সময় দেখা যায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব তথ্যের সঙ্গে বিশেষ করে তাতে যদি রাজনীতি কিংবা অপরাধ সংক্রান্ত সংশ্লেষ রয়ে যায় সেক্ষেত্রে প্রকাশিত ওই তথ্য বা খবর সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য-বিবৃতি, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থেকে প্রকৃত তথ্য জানতে আমাদের প্রচুর বেগ পেতে হয়; রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। তখন মনে হয় রাজনীতিবিদ পরিচয়ে এই মানুষগুলো সম্ভবত এদেশের ১৬ কোটি মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য-মন্তব্যে আমরা কেবল ভাবনা-দুর্ভাবনা আর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে থাকি। এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল তদানীন্তন বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কারখানার জেটিতে দুটি কন্টেইনার বোট থেকে এখন থেকে এক যুগের বেশি সময় অর্থাত্ ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসের ১ তারিখ রাতভর একদল লোকের সহায়তায় এবং সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের তদারকিতে ২৭ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র খালাস করে সেসব অস্ত্র ১০টি ট্রাকে ভর্তি করা হয়েছিল। চীনের চায়না নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (নওরিনশে) কারখানায় তৈরি এসব অস্ত্রের মধ্যে ছিল অটোমেটিক ও স্নাইপার রাইফেল, সাবমেশিনগান ও গ্রেনেডসহ যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা যায়, এমন ধরনের সব অস্ত্র। সে সময়ের পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার লোকজন পাকিস্তানের আইএসআই এবং দুবাইভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এআরওয়াই এদের সহায়তায় কিউসি নামক জাহাজে করে এই অস্ত্রের চালান চট্টগ্রামে নিয়ে এসেছিল। সেদিন ১০ ট্রাক অস্ত্রের ওই চালানটি ধরা পড়েছিল একেবারেই কাকতালীয়ভাবে। হঠাত্ করে বিষয়টি সে সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির একজন সদস্য এবং নিকটস্থ কয়লা ডিপোর একজন পুলিশ সার্জেন্টের নজরে পড়ে।

ঘটনার এলাকায় ওই দিন তাদের ডিউটিও ছিল না। বিষয়টি নজরে এলে এর পরিণাম এবং ব্যাপকতা আঁচ করে তারা তাত্ক্ষণিকভাবে ওয়্যারলেসে তাদের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। অতঃপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ এসে ট্রাকগুলো আটকে দিয়ে তা চট্টগ্রামে দামপাড়া পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। এ সময় অনেকের সঙ্গে আটক করা হয় উলফা সদস্যসহ আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পাঁচজন সদস্যকে। আলাউদ্দিন এবং হেলাল নামের ওই দুই পুলিশ সদস্য, যারা বিষয়টি দেখে তাদের কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন, তারা তখন হয়ে উঠেন ঘটনা উদঘাটনের মূল নায়ক। ঘটনার পরদিন ২ এপ্রিল হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামে ছুটে যান তত্কালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর। তিনি সেখানে গিয়ে এসব অস্ত্র হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে পর্যবেক্ষণ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেন এবং একপর্যায়ে উলফার সদস্যসহ এনএসআইয়ের পাঁচজন সদস্যকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এছাড়াও চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তাদের গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলতে পরামর্শ দেন। এ সময় তারই নির্দেশে গঠন করা হয় উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি। আর সেই কমিটির একজন সদস্য করা হয় তত্কালীন ডিজিএফআইয়ের পরিচালক (পরে তিনি এনএসআইয়ের মহাপরিচালক হয়েছিলেন) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীকে। ভাগ্যের কী পরিহাস, শীর্ষ এই গোয়েন্দা কর্মকর্তাই পরবর্তী সময়ে এই মামলায় আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সম্ভবত আজও একজন ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত ও আটককৃত আসামি হয়ে জেলবাস করছেন। তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর এই অস্ত্র আটকের ব্যাপারে অনুষ্ঠিত সভাগুলোতে ঘটনাটি স্পর্শকাতর উল্লেখ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত এনএসআই, ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের নাম ফাঁস না করার জন্য প্রায়শ সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিতেন।

এ থেকে আঁচ করা যায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার পেছনে হয়তো তার হাত ছিল। এই মামলার রায়েও আদালত কর্তৃক এ ধরনের পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই মামলার রায় অনুযায়ী বাবর সাহেবও এখন ফাঁসির দড়ি গলায় পরার জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন। রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করে দেশের নিরাপত্তা কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাকে এ ধরনের কাজে ব্যবহার করার কথা ভাবতেই আমাদের গা শিউরে ওঠে। সম্ভবত ২০১৩ কিংবা ২০১৪ সালে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলাটির রায় দিয়েছিলেন আদালত। এত বড় একটি ঘটনার বিচার হয়েছে জেনে সাধারণভাবে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে তখন একটি স্বস্তির ভাব লক্ষ করা গিয়েছিল। চারশ’র বেশি পৃষ্ঠার ওই রায় থেকে আমরা যা জানতে পেরেছিলাম এবং রায়টিতে ঘটনার যে বয়ান-ব্যাখ্যা উঠে এসেছিল তা কতটা লোমহর্ষক এবং ভয়ঙ্কর তা ভাবতেও সত্যি অবাক লাগে। সত্যকে নাটক বানানোর কত আয়োজন তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম তত্কালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ওই রায় সম্পর্কিত খবরাখবর থেকে। পূর্বেই দুই পুলিশ সদস্যের কথা উল্লেখ করেছি। পত্রিকায় দেখেছিলাম এই অস্ত্র চালানের বিষয়টি দেখে ফেলা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খবর দেওয়ার কারণে এই দুই পুলিশ সদস্য এই চালান থেকে একে-৪৭ রাইফেল চুরি করেছেন ও অন্যের কাছে বিক্রি করেছেন-এই অভিযোগে তাদের ২৭ মাস জেল খাটতে হয়েছিল।

সে সময় রড দিয়ে পিটিয়ে তাদের দুজনেরই পা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ইঙ্গিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আয়োজনে সংবাদ সম্মেলন করে ওই সময় এই দুই পুলিশ সদস্যকে পুলিশের ‘ঘৃণিত’ সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ঘৃণিত পুলিশ ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০১১ সালে এসে তারা কোনো রকমে চাকরিটি ফেরত পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু মাঝের কয়েকটি বছর তাদের প্রতি যে নির্দয় নির্যাতন-অত্যাচার এবং অবিচার করা হল এসবের কি বিচার হবে? লেখাটি আমি শুরু করেছিলাম এতসব আদ্যোপান্ত বিবরণ দেওয়ার জন্য নয়। মামলার রায়, পত্রপত্রিকা, গণমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্র থেকে পাঠকগণ নিশ্চয়ই সেদিন জেনে গিয়েছিলেন যে, ঘটনাটি কী ছিল এবং নেপথ্যের কুশীলব কারা ছিল? এখন থেকে সম্ভবত তিন বছর পূর্বে যখন এই মামলার রায়টি প্রদান করা হয় তখন বহু মানুষকে উত্সুক চোখ নিয়ে টেলিভিশন সেটের সামনে অবস্থান করতে দেখেছিলাম।

রায়টি শুনে মানুষ যা ভাবার তা-ই ভেবে নিয়েছিল। আমার বিশ্বাস, এত বড় একটি স্পর্শকাতর ঘটনা, যা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বারবার চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলেছিল এবং যেখানে সরকারের মন্ত্রী, সচিবসহ রাষ্ট্রীয় নিরাপাত্তা সংস্থার উচ্চ আসনের সদস্যদের সংশ্লেষ পাওয়া গিয়েছিল তা অনুপুঙ্খভাবে তুলে এনে ঘটনার ১০-১১ বছর পরে রায় দেওয়ার যে সক্ষমতা আমাদের আদালতগুলো অর্জন করেছেন, সে কারণে সবাই আদালত তথা বিচারব্যবস্থাকে মনে মনে ধন্যবাদই জানিয়েছিল। মানুষ কমবেশি সবাই এই রায় বিশ্বাসও করেছিল এবং একইভাবে একটি রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিবিশেষের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের জড়িত করে এত বড় ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার ব্যাপারে ভীষণভাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল, বাংলাদেশের সব মানুষ এই ঘটনায় হতবাক হয়েছিল। আমার অন্তত এমনটিই ধারণা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এত বড় একটি ঘটনা আদালতের রায়ে উন্মোচিত হওয়ার দুই-চারদিন যেতে না যেতেই এই রায়টি নিয়ে তখন বিএনপি এবং জামায়াত একই সুরে এবং একইভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল। কেবল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নয়, জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান তো রীতিমতো এই রায় নিয়ে সে সময় সে দেশে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছিল।

এদিকে বিএনপির মহাসচিব (তখন ভারপ্রাপ্ত) এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব তখন বলেছিলেন, আইন-আদালতে প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার এই রায়টি করিয়েছিল এবং সরকারের উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হেয় করা। দুয়েকজন নেতৃস্থানীয় রাজনীতিক তখন এভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, এই রায়ের কারণে আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বর্তমান সরকার তাই চাচ্ছে। বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের মুখ থেকে অতীতেও এ ধরনের বক্তব্য শোনা গিয়েছিল। একসময় চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অনেকটা তাদের সরাসরি দৃশ্যমান পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদের উত্থান এদেশে এক ভয়াবহ আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছিল। সে সময় প্রশাসনের সামনেই রাজনৈতিক আশীর্বাদ নিয়ে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রকাশ্যে গাছে ঝুলিয়ে গুলি করে মানুষ মেরেছে, সারাদেশের মানুষ মিডিয়ার কল্যাণে তা প্রত্যক্ষও করেছিল। অথচ এ ব্যাপারে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে গণমাধ্যম সম্পাদকদের সঙ্গে এক বৈঠকে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘দেশে বাংলাভাই বলে কিছু নেই। এটি একটি প্রপাগান্ডা।’ খালেদা জিয়ার তত্কালীন মন্ত্রিসভার সদস্য জামায়াত নেতা মাওলানা নিজামী ২০০৪ সালের ২২ জুলাই বলেছিলেন ‘বাংলাভাই গণমাধ্যমের সৃষ্টি’। ১৩ মার্চ ২০০৫ সালে নিজামী বাংলাভাই বা জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলাকে ‘আওয়ামী লীগের প্রপাগান্ডা এবং বিএনপি-জামায়াত জোট ভাঙার আওয়ামী ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিজামীর এসব বলার মাত্র দুই দিন পর ২০০৫ সালের ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়াও আওয়ামী লীগের দিকে ইঙ্গিত করে ওই একই কথা বলেছিলেন যে, আওয়ামী লীগই চারদলীয় জোট ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে এসব অপপ্রচার করছে। লুত্ফুজ্জামান বাবর তখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনিও ২০০৫ সালে জানুয়ারি মাসে একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো জেএমজেবি (জাগ্রত মুসলিম জনতা-বাংলাদেশ) নেই। কিন্তু ওই বছর ১৭ আগস্ট যখন দেশব্যাপী প্রায় একই সঙ্গে ৫০০-এর বেশি জায়গায় বোমাবাজি হল তখন সরকারের একটু টনক নড়েছিল।

সে সময়ের সরকার বিদেশি মুরব্বিদের চাপেই হোক অথবা নিজস্ব উপলব্ধি থেকে হোক তারা জেএমবি, জেএমজেবি, হুজি ইত্যাদি কয়েকটি সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল এবং একপর্যায়ে ২০০৬ সালে ৬ মার্চ বাংলাভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। খালেদা জিয়ার শাসনামলেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার জনসভায় ২১ আগস্টের (২০০৪) গ্রেনেড হামলায় ২৪ জনের বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর প্রাণনাশ ঘটেছিল। এসব ঘটনা নিয়ে তখন বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারা নিরপেক্ষ তো নয়ই, বরং অনেক সময় হাস্যরস মন্তব্য এবং ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে তারা ওই সময় বলতে চেষ্টা করেছিলেন যে এটি ছিল আওয়ামী লীগেরই কাজ। অনেকের বক্তব্য ছিল শেখ হাসিনা নিজেই সেদিন তার ব্যাগে গ্রেনেড বা বোমা বহন করে এনেছিল (!) বিএনপি-জামায়াতের ভাবনায় আওয়ামী লীগই নিজেরা নিজেদের লোকদের হত্যা করে চারদলীয় জোটের ওপর সেদিন দোষ চাপাতে চেয়েছিল। এই ঘটনার বিচার সাজাতে গিয়ে তারা ‘জজমিয়া’ নাটকের অবতারণাও করেছিলেন। পাঠকমাত্রেরই সেসব কথা হয়তো মনে আছে। তখন শীর্ষ দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখ থেকে বলতে শুনেছিলাম যে, ‘এই গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনা যদি মারা না গিয়ে থাকেন তাহলে এই বোমা অন্যরা মেরেছে তা কী করে বলা যাবে? অন্যরা গ্রেনেড মারলে তো শেখ হাসিনার বেঁচে থাকার কথা নয়।’ অর্থাত্ শেখ হাসিনা সেদিন মারা গেলেই তখন কেবল বলা যেত যে বোমাটি হয়তো অন্য কেউ মেরেছিল। আর তা ঘটেনি বিধায় আওয়ামী লীগ নিজেরাই এটা করেছিল। কী অদ্ভুত সব যুক্তি; সত্যকে আড়াল করার জন্য কী সব বক্তব্য! বিএনপি নেতা-নেত্রীরা আজকাল প্রায়ই বলে থাকেন যে, তাদের সরকারের সময় তারাই জঙ্গিবাদ দমন করেছিল। বাংলাভাই, শায়খ রহমান এদেরকে ধরে জেলে নিয়েছিল তারা ইত্যাদি। স্মর্তব্য, ২১ আগস্টের নৃশংস ও নারকীয় ঘটনার সাজানো মহানায়ক ‘জজমিয়া’কেও সেদিন গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে তারা কার্পণ্য করেননি। জজমিয়ার মাকে মাসোহারা দেওয়ার কথা বলে পরে টাকা না দেওয়ায় ‘জজমিয়া’ নাটকটি কীভাবে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল তাও কিন্তু গণমাধ্যমের কল্যাণে তখন এদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিল। একইভাবে বিএনপি নেতৃবৃন্দ চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানও তারাই ধরেছিল বলে মাঝেমধ্যে দাবি করেন। নিষ্ঠুর হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ, সারা দুনিয়ার বিবেকবান মানুষ, দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম সবাই কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বের এসব কথা বিশ্বাস করে না; তারা বরং অন্য কথা বলে। মানুষকে বলতে শুনেছি যে এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আসলে ‘বিএনপি-জামায়াতই বরং সেদিন ধরা খেয়েছিল’।

কৌশলী এবং চাতুর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে সত্যকে ঢাকার চেষ্টা না করাই ভালো। বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে ভারতের মতো ১৩০ কোটি মানুষের এত বড় একটি প্রতিবেশী দেশকে (যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরীক্ষিত বন্ধু এবং যাদের সঙ্গে শত্রুতা না করে বন্ধুত্বের সঙ্গে বসবাস করতে পারলে আমাদের ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি) অস্থিতিশীল করতে এই যে খেলা সেদিনের খেলোয়াড়রা খেলতে চেয়েছিলেন-এটা যদি তখন ধরা না পড়ত তাহলে বাংলাদেশকে এর জন্য কতখানি মূল্য দিতে হতো পাঠকমাত্রই হয়তো তা অনুভব করতে পারেন। আমার বিবেচনায় সেদিনের রাজন্যবর্গের জন্য এটি ছিল আগুন নিয়ে রীতিমতো একটি ভয়ঙ্কর খেলার শামিল। আমরা মাঝেমধ্যে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বক্তব্য-বিবৃতি নিয়েও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও আলোচিত কিছু খবর দেখতে পাই, যেখানে জাতির কিছু কিছু দুঃসময়ে বা ভয়ানক রকম ক্রান্তিকালে তাদের এসব বক্তব্যে সত্য এবং দায়িত্বশীলতার উপস্থিতি অনেক কম থাকে।

এ ধরনের বক্তব্য দেশের জন্য যেকোনো রকম দুর্ঘটনা বয়ে আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বছর দুয়েক আগে একটি পত্রিকায় দেখেছিলাম খালেদা জিয়া তখন সাতক্ষীরায় জামায়াতি উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় তাদের সঙ্গে ‘অপরিচিত মুখ’ দেখা গিয়েছিল বলে একটি মন্তব্য করেছিলেন। হেফাজতিরা যখন মতিঝিলসহ ঢাকা শহর প্রায় লণ্ডভণ্ড করে ফেলেছিল তখন আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাতে মতিঝিল থেকে তাদের অবস্থান উঠিয়ে দিয়েছিল। এই অপসারণের অপারেশনটি ঘটেছিল পরিস্থিতির তুলনায় জানমালের প্রায় কোনো রকম ক্ষতি সাধন ছাড়াই। অথচ বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন বলেছিলেন-ইধহমষধফবংয ভড়ত্পবং পড়ঁষফ হবাবত্ ফড় ংঁপয ‘রহযঁসধহ ঃড়ত্ঃঁত্ব’ ড়হ অষবস ধহফ সধফত্ধংধ ংঃঁফবহঃং. তাহলে এই অভিযানে বাংলাদেশ ফোর্স ছাড়া অন্য কারা অংশ নিয়েছিল তা যেমন সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য নয়; তেমনি আলেমদের ওপর কী করে ‘রহযঁসধহ ঃড়ত্ঃঁত্ব’ করা হয়েছিল তাও পরিষ্কার নয়। সরকারের পক্ষে তাদেরকে উঠিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিইবা সেদিন করার ছিল? এসব বক্তব্য আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মিলে না। আমরা আমাদের নেতৃত্বের কাছ থেকে সবসময় দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং একই সঙ্গে সত্য উচ্চারণ শুনতে চাই। আমরা যেন সবসময় মনে রাখি সত্য সত্যই; সত্য কখনও ‘মেক’ করা যায় না। বাংলাদেশে অতীতের এসব ঘটনা এবং আজও যেসব অপ্রত্যাশিত কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে সেসব ঘটনার কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক, skasalam@gmail.com