বৃহস্পতিবার ১৮ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০৪:১৫

কৃষকের ধানের লাভ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে

Published : 2017-04-03 22:22:00
আবদুল হাই রঞ্জু: সরকার কৃষকের উত্পাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকল্পে প্রতি বছর বোরো ও আমন মৌসুমে কৃষক এবং ধান ও চালকল মালিকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে থাকে। তবে ধান উত্পাদনের তুলনায় সংগৃহীত ধান ও চালের বরাদ্দের পরিমাণ অনেক কম থাকায় কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। উল্লেখ্য, কৃষি অর্থনীতির বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গুটিকতক অত্যাধুনিক অটোমেটিক রাইস মিল ও গোটা দেশে গড়ে ওঠা ছোট-বড় প্রায় ১৬-১৭ হাজার হাসকিং মিল চাতালই একমাত্র কৃষিভিত্তিক শিল্প। ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হলে মিল চাতাল মালিকগণ এবং অটোমেটিক রাইস মিলগুলো কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনে এবং ধান থেকে ফলিত চাল খাদ্যগুদামে সরকারি দরে বিক্রি করে। এতে এসব শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়। এবারই প্রথম বোরো মৌসুমে সরকার খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালায় পরিবর্তন আনে। যেখানে সরকার অতীতে চালকল মালিকদের কাছ থেকে ১০-১১ লাখ টন সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহ করেছে, সেখানে এবার বোরো মৌসুমে মিলারগণের কাছ থেকে চাল সংগ্রহের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং কৃষকদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দরে ৭ লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কৃষি বিভাগ কৃষকের তালিকা দিতে অনেক বিলম্ব করে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ধান সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী কৃষকদের পক্ষে খাদ্যগুদামে বিক্রি করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। এ কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষকদের খাদ্যগুদামে বিক্রি উপযোগী ধান প্রস্তুত করার মতো পাকা চাতালের অভাবে ধান শুকাতে না পারা এবং তালিকা প্রণয়নে কালক্ষেপণ, কৃষকপ্রতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০০-৫০০ কেজি ধান বিক্রিতে অনেকের অনীহা। অপরদিকে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় অধিকাংশ কৃষকের পক্ষে ১৪ শতাংশ আর্দ্রতায় ধান প্রসেস করাও সম্ভব হয়নি। আবার কৃষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ধানের মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় ধান নিয়ে অনেক কৃষকের পক্ষে খাদ্যগুদামে পৌঁছাও সম্ভব হয়নি। ফলে ধান সংগ্রহে গতি না আসায় খাদ্য মন্ত্রণালয় নতুন করে আদেশ জারি করে, কৃষি বিভাগের দেওয়া তালিকা ছাড়াই যেকোনো কৃষক প্রতিটি কৃষি কার্ডে তিন টন পর্যন্ত ধান খাদ্যগুদামে বিক্রি করতে পারবে। এ আদেশের কারণে ধান ক্রয়ে গতি ফেরে এবং সে সুযোগটি গ্রহণ করে মধ্যস্বত্ব্বভোগীরা। যারা নামমাত্র মূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ড কিনে নিয়ে ব্যাপক হারে খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করায় মাত্র দশ-বারো দিনের মধ্যেই অধিকাংশ উপজেলার অনুকূলে বরাদ্দকৃত ধান কেনা শেষ হয়ে যায়। ফলে প্রকৃত কৃষকের পক্ষে আর সরকারি দরে তালিকায় নাম থাকার পরও ধান বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। আবার অনেক খাদ্যগুদামে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ার কারণে সংগৃহীত ধান ছাঁটাইয়ের জন্য চালকল মালিকদের সঙ্গে খাদ্য বিভাগ চুক্তি করে। চুক্তিমতে মিলারগণ খাদ্যগুদাম থেকে ধানের সরবরাহ গ্রহণ করে। অনেক ক্ষেত্রে গুদাম থেকে বের হওয়া এসব ধান বিভিন্ন খাদ্যগুদামে বিক্রি হওয়ায় প্রকৃত কৃষকের ধান গোলায় থাকতেই প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টন ধান কিনে খাদ্য মন্ত্রণালয় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে! শুধু তাই নয়, জনশ্রুতি আছে ছাঁটাইয়ে নেওয়া ধানের ফলিত চাল নিজস্ব মিলে প্রস্তুত না করে অনেকেই পুরান চাল অত্যাধুনিক অটোমেটিক রাইস মিলে ঘষামাজা করে খাদ্যগুদামে জমা করেছে। ধান সংগ্রহের পরিমাণ, ধান ছাঁটাইয়ের পরিমাণ এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝেও কীভাবে ফলিত চাল খাদ্যগুদামে জমা করা সম্ভব হল, তা একটু খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব এবং ভ্রান্ত নীতিমালা গ্রহণ করে কখনও সফলতা অর্জন করা যায় না। উল্টো অনেক সময়ই পদ্ধতিগত কারণে শুধু পুকুর চুরিই হয় না, সাগর চুরি পর্যন্ত হয়ে যায়। অন্তত এবারের বোরো মৌসুমে শুরুতে সরকার একদিকে চাল সংগ্রহ না করে দেশের একমাত্র কৃষিভিত্তিক চালকল শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, অন্যদিকে ধান সংগ্রহের নামে লুটপাটের এক মহোত্সব হয়েছে! ভবিষ্যতে সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় কিংবা খাদ্য অধিদফতর কৃষিভিত্তিক চালকল শিল্প এবং কৃষকের স্বার্থরক্ষায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, যা দেখার জন্য হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায়, শুধু কৃষিভিত্তিক চালকল শিল্পই নয়, যেকোনো শিল্প উপযোগী কাঁচামাল যেখানে সহজলভ্য হয়, মূলত সেখানেই সে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারকরা অনেক ক্ষেত্রেই তা মানতে নারাজ। ফলে বিপত্তির শুরু হয় এখান থেকেই। যেমন দেশের মোট জনগোষ্ঠীর চাহিদার সিংহভাগ ধান এখন উত্তরাঞ্চলে উত্পাদন হয়। সেই ধানকে ঘিরে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় হাজার হাজার চালকল। যার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় অত্যাধুনিক রাইস মিলের সংখ্যা সামান্য, হাসকিং মিলের সংখ্যাই বেশি। অটোমেটিক রাইস মিলে উত্পাদিত চালের মান নিঃসন্দেহে উন্নত। তুলনামূলকভাবে হাসকিং মিলে উত্পাদিত চালে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় চালের মান উন্নত হয় না। কিন্তু উন্নত যন্ত্রপাতির বদৌলতে স্বয়ংক্রিয় চালকলে নিম্নমানের পুরান চালকে চকচকে করে সরকারি গুদামে বিক্রি বা ভোক্তাপর্যায়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।
আগেই বলেছি, ধান চাষের বদৌলতে দেশের উত্তরাঞ্চলে হাজার হাজার সিদ্ধ ও আতপ চালকল গড়ে উঠেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলে গড়ে ওঠা আতপ চালকলের অনুকূলে বরাদ্দ দিয়ে আতপ চাল সংগ্রহ করে থাকে। জানা গেছে, এ মৌসুমে সরকার উত্তরাঞ্চল থেকে কোনো আতপ চাল সংগ্রহ করবে না। এতে করে গড়ে ওঠা কৃষিভিত্তিক এই শিল্প হুমকির মুখে পড়বে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিককে কাজ হারাতে হবে। উল্লেখ্য, উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সুবিধা না থাকায় এ অঞ্চলে কোনো বৃহত্ শিল্প স্থাপিত হয়নি। কৃষি চাষাবাদের অন্যতম নিয়ামক ইউরিয়া, নন ইউরিয়া সার কারখানার একটিও উত্তরাঞ্চলে স্থাপিত হয়নি। কিন্তু সরকার কৃষি চাষাবাদের স্বার্থেই ভর্তুকি দিয়ে হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সার পরিবহন করে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের দোরগোড়ায় নিয়মিতভাবে সরবরাহ করে যাচ্ছে। যেহেতু উত্তরাঞ্চলে উত্পাদিত ধানকে ঘিরে এই অঞ্চলে আতপের মিনি অটো চালকলগুলো স্থাপিত হয়েছে, সেহেতু এই আতপ মিলগুলোকে চালু রাখতে খাদ্য বিভাগকে আতপ চাল সংগ্রহ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে হলেও উত্তরাঞ্চলের উত্পাদিত আতপ চাল পরিবহন করে ভোক্তাপর্যায়ে সরবরাহ করা উচিত।
বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশে রিফাইন করে ৬-৭টি পরিবেশক কোম্পানির মাধ্যমে ভোক্তাপর্যায়ে বাজারজাত করায় কৃষিভিত্তিক চিনি শিল্প আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে চিনি সিন্ডিকেটের কাছে দেশের মানুষ আজ জিম্মি। আবার লবণ সাগরের লোনাপানি ছাড়া উত্পাদন করা সম্ভব নয়। সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে লবণচাষিরা অপরিশোধিত লবণ চাষ করে, যা আশেপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা রিফাইন মেশিনে খাওয়ার উপযোগী করে গোটা দেশেই সরবরাহ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে লবণ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার পাশাপাশি লবণ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। দেশীয় শিল্পকে সরকারিভাবে প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও রক্ষা করা জরুরি। কারণ দেশীয় শিল্পের সঙ্গে অনেক মানুষের রুটি-রুজির বিষয়টি জড়িত। গড়ে ওঠা কৃষিভিত্তিক দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করতে না পারলে কৃষি অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে এবং কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধিও অর্জিত হবে না।
আমরা বরাবরই দেখে আসছি, খাদ্য মন্ত্রণালয় গোটা দেশে আতপ চালের বরাদ্দ দিয়ে চাল সংগ্রহ শুরু করলেই ধানের মূল্য অনেক বেড়ে যায়। কৃষকের উত্পাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ধান কাটা-মাড়াইয়ের শুরুতে ধান সংগ্রহের পাশাপাশি সিদ্ধ ও আতপ চালও সংগ্রহ করা উচিত। তাহলেই ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এজন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে আগামী আমন ও বোরো মৌসুমে ধান, চাল বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করে একই সঙ্গে ধান, সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহ করা উচিত। নতুবা এবারের মতো ভবিষ্যতেও কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে।
লেখক : সমাজকর্মী