শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, সকাল ১০:৪৬

খালেদা জিয়ার কারামুক্তি বিলম্ব হতে পারে

Published : 2018-02-11 10:23:00, Updated : 2018-02-12 12:27:23

অনলাইন ডেস্ক : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি বিলম্ব হতে পারে।সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত আইনি লড়াই শেষ করে তার কারামুক্তি পেতে হলে বেশ সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।কারণ হিসেবে তারা বলছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে; কিন্তু গতকাল পর্যন্ত ওই রায়ের কপি হাতে পাননি খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।

রায়ের কপি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তার আইনজীবীরা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। কপি পেলে খালেদা জিয়া ওই দণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করবেন এবং জামিন চাইবেন। এর পর হাইকোর্ট থেকে খালেদা জিয়া জামিন পেলে তার বিরুদ্ধে দুদক আপিল বিভাগে আবেদন জানাতে পারে। আর এই প্রক্রিয়া শেষ করতেই মাসখানেক সময় লাগার কথা।অন্যদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে। কারণ মামলাটি বর্তমানে যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায়ও যদি আদালত খালেদা জিয়াকে সাজা দেন, সে ক্ষেত্রে তার কারামুক্তি বেশ সময়সাপেক্ষ হয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলায় নিম্ন আদালত থেকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এসব মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কারামুক্তির জন্য পাঁচটি মামলায়ও তার জামিন নেওয়ার প্রয়োজন হবে।

জানতে চাওয়া হলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সব মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা এসব মিথ্যা মামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত। সরকার কৌশলে যদি বিলম্ব না করে, তা হলে আমরা দ্রুতই তার কারামুক্তি করাতে পারব বলে আশাবাদী।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার জানে, বেগম খালেদা জিয়ার যে জনপ্রিয়তা, তাতে নির্বাচনে গেলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন। এ কারণে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঠেকাতে নির্বাচনী বছরে সরকার ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়াকে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। তার নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঠেকাতে এটা সরকারের একটা আগাম প্রস্তুতি।’ তবে তাকে কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঠেকাতে পারবে না দাবি করে ব্যারিস্টার খোকন বলেন, ‘বর্তমানে দু-তিনজন সংসদ সদস্য আছেন, যাদের সাজা হয়েছিল। সাবেক মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দুদকের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন; কিন্তু তারাও তো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।’
জানতে চাওয়া হলে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, রায়ের সার্টিফায়েড কপি চেয়ে আসামিপক্ষ আবেদন করলে তা যত দ্রুত সম্ভব সরবরাহ করতে হবে। তবে রায়ের কপি পাওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই।

পাঁচ মামলায় পরোয়ানা : দণ্ডিত হওয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাসহ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রায় ৩৫টি মামলা রয়েছে। সেসবের মধ্যে পাঁচটি মামলায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আছে। যে পাঁচটিতে পরোয়ানা আছে, সেগুলো হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পেট্রলবোমায় ৮ জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুটি মামলা, যুদ্ধাপরাধীদের মদদ দেওয়ার একটি মানহানির মামলা, ভুয়া জন্মদিন পালন করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সুনাম নষ্টের একটি মামলা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের একটি মামলা।

এসব মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর তিনি আদালতে হাজির হয়ে জামিন গ্রহণ করেননি, যা বর্তমানে তার মুক্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে এখন এ মামলাগুলোয় গ্রেপ্তার দেখানো হলে শুধু অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় জামিন পেলেই তিনি মুক্তি পাবেন না; সেসব মামলায়ও তার জামিন নেওয়ার প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রলবোমায় ৮ জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুইটি মামলায় বিচারিক আদালতে জামিন পাওয়াটাও সহজসাধ্য হবে না। ওই মামলায় জামিন পেতে তাকে হাইকোর্টে পর্যন্ত আবেদন করতে হতে পারে। এ দুটি মামলার মধ্যে বিস্ফোরক আইনের মামলায় গত ৯ অক্টোবর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন কুমিল্লার জেলা জজ আদালত। আর একই ঘটনায় হত্যা মামলায় গত ২ জানুয়ারি কুমিল্লার ৫ নম্বর অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়নব বেগম পরোয়ানা জারি করেন।

জানা যায়, হরতাল-অবরোধের সময় ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি বাসে পেট্রলবোমা মেরে ৮ জনকে হত্যার অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ ৫৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দুটি দায়ের হয়। পরে মামলাগুলোয় চার্জশিট দাখিল হওয়ার পর আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের মদদ দেওয়ার মানহানির মামলায় ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকা মহানগর হাকিম মো. নুর নবী। এ ছাড়া ১৫ আগস্ট ভুয়া জন্মদিন পালন করার মামলায় ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম মো. মাজহারুল ইসলাম পরোয়ানা জারি করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট নড়াইলের একটি আদালত সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন।

জিয়া চ্যারিটেবলের যুক্তিতর্ক শুনানি : বকশিবাজারে আলিয়া মাদ্রাসামাঠের ওই বিশেষ জজ আদালতে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য রয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি মামলার বাদীপক্ষ এ মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে। এর পর ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি আসামি জিয়াউল হক মুন্নার পক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি হয়। আগামী ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসবে। সে ক্ষেত্রে মামলাটির রায় ঘোষণাও আর খুব বেশি দেরি নেই। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত বৃহস্পতিবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এখন রায়ের কপি হাতে পেয়ে তার আইনজীবীরা হাইকোর্টে আপিল করবেন। সঙ্গে জামিনের দরখাস্তও দাখিল করবেন। হাইকোর্টে জামিন পেলে দুদকের আইনজীবীরা আপিল বিভাগে তার জামিন ঠেকাতে যেতে পারেন। আর সর্বোচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি হতে হতেই যদি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও রায় হয় এবং রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কারণে সাজা হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে এ মামলায়ও খালেদার আইনজীবীদের উচ্চ আদালতে ছুটতে হবে। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কাই রয়েছে।