শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ০৯:৫৪

মৌলভীবাজারে ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’: অভিযান স্থগিতের পরও আস্তানায় বিস্ফোরণ

Published : 2017-03-31 23:21:00
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, সাইদুল হাসান সিপন, মৌলভীবাজার ও মামশাদ কবীর, কুমিল্লা: মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন হিটব্যাক’ চলাকালে শিশু ও নারীসহ সাতজনের লাশ উদ্ধার হলেও আরেক আস্তানায় চলছে শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’। গতকাল সকাল থেকে বড়হাট আস্তানা থেকে ব্যাপক বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। পরে সন্ধ্যায় অভিযানটি স্থগিত করা হয়। আজ সকালে অভিযানটি পরিচালিত হবে বলে সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। তবে রাত ৮টা থেকে ফের কয়েকদফা বিস্ফোরণের শব্দ পেয়ে সোয়াত ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা ওই ভবনে ২০-২৫ রাউন্ড গুলি করে বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে আস্তানাটি ঘিরে রাখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গত তিন দিনেও আস্তানাটিতে সফলভাবে অভিযান সমাপ্ত না হওয়ায় দিনভর উত্কণ্ঠায় ছিল স্থানীয়রা।
অন্যদিকে কুমিল্লা মহানগরীর গন্ধমতী এলাকায় জঙ্গি আস্তানা তিন দিন ঘিরে রাখার পর গতকাল ‘অপারেশন স্ট্রাইক আউট’ অভিযানের পর ওই আস্তানায় কোনো জঙ্গির সন্ধান পায়নি পুলিশ। গত বুধবার বিকেলে ওই আস্তানার সংবাদ পাওয়ার পর পুরো ভবন ঘিরে রাখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ওইদিন পুলিশ জানিয়েছিল, আস্তানাটির ভেতর থেকে দফায় দফায় বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হলেও ওইদিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ায় অভিযান বাতিল করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ওইদিন উত্সবের ভোটে নগরবাসীর মধ্যে ছিল উত্কণ্ঠা। গতকাল দিনভর অভিযান শেষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাউকে গ্রেফতার করতে না পারলেও বাড়িটি থেকে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।
মৌলভীবাজার : গতকাল সকালে পৌরশহরের বড়হাটে অভিযান শুরু করে ঢাকা থেকে আসা সোয়াত টিম। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ম্যক্সিমাস’। দিনভর অভিযান চালিয়ে আস্তানাটি দখলে নিতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ জানায়, ভবনে অনেকগুলো রুম থাকায় এবং জানালা বুলেটপ্রুফ হওয়ায় ভেতরে থাকা জঙ্গিদের ধ্বংস করা যাচ্ছে না। আস্তানার ভেতরে প্রচুর পরিমাণে বিস্ফোরক এবং একজন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ রয়েছে বলেও ধারণা করছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা।
গতকাল সন্ধ্যায় কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অপারেশন ম্যাক্সিমাস আজ সকাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। সকালে ফের অভিযান শুরু করব। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অন্যদিকে দিনভর আস্তানায় দফায় দফায় গুলি ও বিকট শব্দে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়ার পর স্থানীয়রা আতঙ্কে অনেকে বাইরে বের হয়নি। পুরো এলাকায় বোমা আতঙ্কে ভুগছিল স্থানীয়রা। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে বিকট শব্দে দুটি বিস্ফোরণে চার মিনিট পরই কয়ছর আহমদ (৩০) নামে এক পুলিশ সদস্যকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিতে দেখা গেছে। কয়ছর মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল। আস্তানাটির আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকায় শহরের কুসুমভাগ-শেরপুর রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে ওই এলাকার সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
পায়ে হেঁটে বিয়ে করতে গেলেন বড়হাটের এক বর : বড়হাটে জঙ্গি আস্তানার অভিযানের কারণে সর্বত্র উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যেও স্বল্প সংখ্যক বরযাত্রী নিয়ে প্রায় ২ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বিয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে যান আশিকুর রহমান শুকুর নামে এক বর। তিনি বড়হাট এলাকার ছদর উদ্দিনের ছেলে।
তিনি বলেন, পূর্বনির্ধারিত থাকায় অল্পসংখ্যক আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে ২ কিলোমিটার এলাকা পায়ে হেঁটে ১৪৪ ধারা জারির বাইরের এলাকা থেকে গাড়িতে করে শ্বশুরবাড়ি সদর উপজেলার ওপার কাগাবালা এলাকায় যাই।
বাড়ির মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ : শহরের অধিকাংশ বাড়ির মালিক প্রবাসে থাকে। একই দিনে দুই বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার পরই সচেতন হচ্ছে অন্য বাড়ির মালিকের স্বজনরাও। অনেকেই ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সার্বিক তথ্য নেওয়া শুরু করেছে।
তিন দিন থেকে গৃহবন্দি বড়হাটের মানুষ : জঙ্গি আস্তানার সন্ধানের পর থেকে বড়হাটের আশপাশের দুই কিলোমিটার জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। ফলে ওই এলাকা দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এলাকায় লোকজনকে জটলা করতে দেওয়া হচ্ছে না। হকারদের এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এলাকার মানুষজনকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়নি। গৃহবন্দি জীবনযাপন করছে তারা।
কুমিল্লা : মহানগরীর গন্ধমতি এলাকায় জঙ্গি অবস্থানের খবরে ঘেরাও করা আরমানী নামে বাড়িতে অবশেষে বেলা সোয়া ১১টা থেকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, থানা পুলিশ, র্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ‘অপারেশন স্ট্রাইক আউট’ অভিযান শুরু করেন। ওই বাড়িটি লক্ষ্য করে ১২ থেকে ১৪ রাউন্ড গুলি ও বেশ কয়েকটি টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করেন তারা। দুপুরের পর তারা বাড়িটির নিচতলায় অভিযান চালিয়ে কোনো জঙ্গির সন্ধান না পেলেও একটি ব্রিফকেস উদ্ধার করার কথা জানান চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি সফিকুল ইসলাম।
পরে সন্ধ্যায় ডিআইজি সাংবাদিকদের বলেন, কোটবাড়ীর জঙ্গি আস্তানায় দুই জঙ্গি ছিল। কোটবাড়ীর জঙ্গি আস্তানায় যে দুই জঙ্গি ছিল, তার মধ্যে একজনের নাম আনাস ওরফে আনিস, অন্যজনের নাম রনি। দুই জঙ্গির একজন গত বুধবার সকাল ১০টার আগেই চলে গেছে, অন্যজন বিকেলে হয়তো পালিয়ে গেছে।
ডিআইজি বলেন, আনিসের বাড়ি নোয়াখালী। বয়স ১৯ থেকে ২০ বছর। সে পাঁচ মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। রনি নব্য জেএমবির সদস্য। তার বয়স ২২ থেকে ২৩ বছর। বাড়ি রাজশাহী। সেও পাঁচ মাস আগে নিখোঁজ হয়েছে।
ডিআইজি বলেন, জঙ্গিদের একটি কৌশল আছে। একজন বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আরেকজনকে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে যায়। এর মধ্যে যদি সে ফিরে না আসে, তাহলে অন্যজন বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এ পন্থা ব্যবহার করে হয়  তো দ্বিতীয়জন বেরিয়ে গেছে। যে কারণে আস্তানায় আমরা কাউকে পাইনি। তবে তারা দুজনই এখানে ছিল আমরা নিশ্চিত।
এক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, আমরা মিরসরাইয়ের জঙ্গি আস্তানা থেকে দুই জঙ্গিকে  গ্রেফতার করি। তাদের দেওয়া তথ্য মতেই কোটবাড়ীতে অভিযান চালানো হয়। তারা মার্চের ১ তারিখে এ বাসা ভাড়া নেয়। তারা প্রথমে সীতাকুণ্ড এলাকায় বাসা ভাড়া নিতে চেয়েছিল কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তারা নিতে পারেনি। এজন্য ওই জেএমবিদের পরামর্শে তারা এখানে আসে।
বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের বিষয়ে ডিআইজি শফিকুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে ৫ কেজি ওজনের দুটি বোমা রয়েছে। সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানায় যে ধরনের বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল এটাও একই ধরনের। এ ছাড়া সেখানে চারটি হ্যান্ড গ্রেনেড ও দুটি সুইসাইডাল ভেস্ট রয়েছে। জঙ্গি আস্তানায় গ্যাস ছোড়ার কারণে আমাদের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট গ্যাসের কারণে কাজ করতে পারেনি। এ ছাড়া বিদ্যুত্ না থাকায় সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এজন্য আমরা আজ বোমা নিষ্ক্রিয় কার্যক্রম স্থগিত রেখেছি। শনিবার সকালে বোমা নিষ্ক্রিয়করণের কাজ আবার শুরু হবে।

আরও খবর