রবিবার ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ০২:৫৩

খালেদা জিয়ার রায়: দুই রকম প্রস্তুতি আ.লীগ ও বিএনপির

Published : 2018-01-28 10:36:00, Updated : 2018-01-28 11:00:16

অনলাইন ডেস্ক : আগামী জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচনী রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে খালেদা জিয়ার মামলা।৮ ফেব্রুয়ারি অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় নিয়ে রাজনীতিবিদরা হিসাব-নিকাশ করছেন। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের জন্য ক্ষমতাসীনরা তাকিয়ে আছেন এ মামলার রায়ের দিকে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা প্রত্যাশা করেছেন। শাসক দলের একটি অংশ বলছে, খালেদা জিয়ার সাজা হয়ে তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হলে এক রকম নির্বাচনী কৌশল হবে।

আর রায়ে খালেদা জিয়া নির্দোষ হলে কৌশল হবে অন্য রকম। তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হলে বিএনপির একটি অংশ খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যেতে চাইবে না। তারা নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। তবে দলটির অনেকে আবার গতবারের মতো নির্বাচন বর্জনও করতে চাইবে না। বিএনপির নির্বাচনমুখী এ অংশকে নিয়ে সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের ওপর। রায় নিয়ে বিএনপি মাঠে থেকে রাজনৈতিক ও আইনিভাবে মোকাবেলা করবে।

শনিবার (২৮ জানুয়ারি) গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রাত স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়াসহ কয়েকজন নিরাপরাধ ব্যক্তিকে মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়ে সরকারের আইন-আদালতের নিয়মনীতির বিরুদ্ধ আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। 

এ ব্যাপারে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিচারের নামে সরকারি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আহ্বান জানান তিনি।খালেদা জিয়াকে ছাড়া আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণনি ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রায়কে ঘিরে দুই রকম প্রস্তুতি নেয়ার কথা ভাবছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। জানা গেছে, রায়ের পর বিএনপির প্রতিক্রিয়া দেখে আওয়ামী লীগ মাঠে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি যে কোনো সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজপথে থাকবে। এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা।

একই সাথে খালেদা জিয়ার সাজা হলে তাকে ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে রাজনীতির মাঠে বিএনপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে সরকার। অপরদিকে রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হলে এর প্রতিবাদে বিএনপি রাজপথের পাশাপাশি আইনিভাবেও মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দলটি তাৎক্ষনিক বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিতে পারে। একই সাথে যত দ্রুত সম্ভব বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা হাইকোর্টে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানা গেছে। 
আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনী বছরের শুরুতেই দলটি কোনোভাবেই দেশে সহিংস পরিস্থিতি সহ্য করবে না। তাই সহিংসতায় জড়িতদের ব্যাপারে রাজনীতি ও আইনিগত ব্যবস্থা নেবে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ এবং সহযোগি সংগঠনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হবে বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের অন্য একটি সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে বিএনপিকে চাপে রাখতে কৌশলের অংশ হিসেবে সম্ভাব্য সব পরিকল্পনা প্রয়োগ করবে সরকার। মূল উদ্দেশ্য, বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে নির্বাচন করা। এ ক্ষেত্রে বছরের শুরুতে খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে বিএনপিকে চাপে রাখতে পারলে দলটির নেতা-কর্মীরা নির্বাচনের আগে মনোবল হারাবে।

তাছাড়া নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তকমা ভোটে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় কী হবে, তা জানি না। তবে মামলার গতিবিধি এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় এই মামলায় খালেদা জিয়া শাস্তি এড়াতে পারবেন না। তাই তার সাজা হলে খুব স্বাভাবিকভাবে বিএনপি সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কাউকে মাঠ ছেড়ে দেবে না। আমাদেরও কর্মসূচি থাকবে। কর্মসূচি হবে জনগণের জান-মাল রক্ষায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করা।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার মামলার রায়ে সাজা হলে কী রকমের প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে তা নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা আছে বিএনপির মধ্যে। জানা গেছে, বিএনপির রক্ষণশীলপন্থী নেতারা চরম প্রতিক্রিয়া দেখানোর পক্ষ। এ ক্ষেত্রে বিক্ষোভের পর হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি চায় তারা। দলের এই অংশের নেতাদের যুক্তি হচ্ছে; এখনই সরকারের বিরুদ্ধে চরম প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে না নিয়ে গেলে সরকার বিএনপিকে আরো বেশি চাপে রাখার কৌশল বাস্তবায়নের দিকে এগুবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের তাদের পরিকল্পনাকে সফল মনে করবে।

তাই আইনি মোকাবিলার পাশাপাশি রাজপথে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে চায় বিএনপির এই অংশ। এই মত পোষণকারী নেতাদের অন্যতম বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, রায়ে বেগম জিয়ার সাজা হলে দেশে কী প্রতিক্রিয়া হবে তা বলা মুশকিল। যদি এই মিথ্যা মামলায় সরকারের নির্দেশে বিএনপি চেয়ারপারসনকে সাজা দেয়া হয়, তখন জনগণ বিএনপির কর্মসূচি ডাকার অপেক্ষায় থাকবে না। আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচি দিই বা না দিই তাতে জনগণ বসে থাকবে না। যে যেভাবে পারে সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

এ জন্য সরকারই দায়ী থাকবে। তবে তিনি বলেন, বিএনপি দলগতভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পক্ষে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে এ রকম পরিস্থিতির সময় অদৃশ্য কিছু পক্ষ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। আবার সরকার নিজেও বিভিন্ন এজেন্সি দিয়ে বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে। এমনটা হলে তখন বিএনপিকে দোষ দেয়া যাবে না। অবশ্য বিএনপির অপর একটি অংশের নেতাদের অভিমত, এই মামলায় রায়ই বিএনপি চেয়ারপারসনের শেষ মামলার রায় নয়। তা ছাড়া এটা চূড়ান্ত রায়ও নয়। কিন্তু নির্বাচন সামনে থাকায় এর প্রভাব ব্যাপক।

তবুও বিএনপির এমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে যাতে সরকার তাদের পরিকল্পনায় সফল না হয়। এ ক্ষেত্রে কঠিন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বরং রাজপথে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এবং আইনগতভাবে মোকাবিলা করার পক্ষে ওই নেতারা। তাদের অভিমত, নির্বাচনের বছর বিএনপির এমন কোনো কর্মসূচিতে যাবে না, যাতে জনমত উল্টো দিকে চলে যায়। বরং মিথ্যা মামলায় সাজা হলে খালেদা জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট থাকবে বলে মনে করেন নেতারা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি কখনো সহিংস কর্মসূচি সমর্থন করে না। ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) মামলায় রায় নিয়ে যা-ই হউক তার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান আমরা চাই। আমরা শান্তি চাই, সহিংসতা নয়।