বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ১১:৫৯

বিশ্বমানের চিকিত্সাসেবার নির্ভরযোগ্য নাম ‘বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল’

Published : 2017-03-31 21:54:00, Updated : 2017-04-04 20:08:56
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি উদ্দিন চৌধূরী ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। ঢাকার নামকরা সব হাসপাতালে চিকিত্সা করিয়ে যখন কোনো কূল পাচ্ছিলেন না তখন তার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী দুই ছেলে এনাম ও এরশাদ এবং মেয়ে মুনমুন মিলে বাবাকে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। হাসপাতালের বাংলাদেশ অফিসের সহযোগিতায় দ্রুত ভিসার ব্যবস্থা করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে থাইল্যান্ড নিয়ে যাওয়া হল। হাসপাতালে যখন পৌঁছলেন তখন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ডাক্তারদের অভিমত, বাঁচার সম্ভাবনা ৫০/৫০ স্কেলে। হাসপাতালে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে দক্ষ ডাক্তারদের তত্ত্বাবধান, অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতির নিখুঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সর্বোচ্চমানের চিকিত্সা সরঞ্জামের ব্যবহার এবং নার্সদের নিরন্তর সেবা-সব মিলিয়ে তিন দিনের মাথায় ড. শফি চোখ খুললেন, কথা বললেন এবং সবশেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরলেন। উম্মে হানী চৌধূরী (ড. শফি উদ্দিন চৌধূরীর সহধর্মিণী) আজও বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের চিকিত্সাসেবার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।
এ রকমভাবেই বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবার এক নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে থাইল্যান্ডের ‘বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল’। ড. শফির মতো প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ নির্ভরযোগ্য চিকিত্সাসেবা নিতে ছুটে আসেন থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্ককে  অবস্থিত বিশ্বমানের এই হাসপাতালে।
১৯৮০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০ বেড নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল’। শুরু থেকেই সর্বোচ্চমানের সেবা প্রদান আর নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালটি মানুষের আস্থা আর নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দিন দিন এর পরিধি বেড়ে চলেছে। বর্তমানে এর বেড সংখ্যা ৫৮০টি। চালু হয়েছে দৈনিক ৫ হাজার ৫০০ রোগীকে সেবাদানের সক্ষমতা সম্পন্ন বহির্বিভাগ। এটি বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্ বেসরকারি হাসপাতাল।
আবাসিক এবং বহির্বিভাগের রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা ভবন। মূল হাসপাতাল ভবনটি ৭০,২৫২ বর্গফুটের ওপর নির্মিত পার্কিং সুবিধা সংবলিত ১২তলা। এর রয়েছে অনুমোদিত মেডিক্যাল হ্যালিপোর্ট এবং ওয়াই-ফাই সুবিধা। রোগীদের থাকার জন্য রয়েছে একক ডিলাক্স রুম, প্রিমিয়ার অট্রিয়াম ডিলাক্স এবং প্রিমিয়ার রয়েল স্যুট। প্রতিটি রুমে রয়েছে ওয়াই-ফাই সংযুক্ত বেড-সাইড ল্যাপটপ, ফ্রি চ্যানেল এবং হাসপাতালের যাবতীয় তথ্যসেবা পাওয়ার জন্য রুম টেলিভিশন।
প্রতিটি তলায় রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সেবা ইউনিট। মেডিক্যাল, সার্জিক্যাল, পেডিয়াট্রিক বিভাগ, অ্যাডাল্ট ইনটেনসিভ কেয়ার (আইসিইউ), কার্ডিয়াক কেয়ার (সিসিইউ), পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার, নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইত্যাদি। রোগ অনুযায়ী রোগীকে নির্ধারিত তলায় সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। যাতে প্রয়োজনে দ্রুততার সঙ্গে রোগীকে সেবা প্রদান সহজ হয়।
বহির্বিভাগের রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য হাসপাতালের রয়েছে মূল ভবন সংলগ্ন ৫৭,২০৬ বর্গফুটের ওপর নির্মিত প্রায় ৭০০ গাড়ি পার্কিং সুবিধা সংবলিত ২১তলা ভবন। প্রতিটি তলা বিশেষায়িত চিকিত্সাসেবা প্রদানের জন্য নির্ধারিত। প্রতি তলায় রয়েছে চিকিত্সা সংশ্লিষ্ট ওষুধ প্রাপ্তির জন্য ফার্মেসি। যেখান থেকে রোগী প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নগদের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় ওষুধটি সহজে পেতে পারেন। প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে ওয়াই-ফাই সুবিধা, ডিরেক্টরিজ এবং টেলিভিশন। যেখানে বসে রোগী হাসপাতালের সেবা সংশ্লিষ্ট যাবতীয় তথ্য পেতে পারেন। বহির্বিভাগে রোগী অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারবেন। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট অটো প্রক্রিয়ায় ডাক্তারের কম্পিউটারে প্রেরণ করা হয় এবং রোগী সহজেই সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের পরামর্শ সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
বহির্বিভাগে রোগীদের জন্য রয়েছে অ্যালার্জি সেন্টার, চিলড্রেন’স সেন্টার, ডেন্টাল সেন্টার, ইএনটি সেন্টার, আই সেন্টার, হার্ট সেন্টার, নেপ্রোলজি সেন্টার, নিউরোসায়েন্সেস সেন্টার, স্পাইন ইনস্টিটিউট, ইউরোলজি সেন্টার, অর্থোপেডিক সেন্টার, প্লাস্টিক সার্জারি সেন্টার, স্কিন সেন্টারসহ প্রায় ৪১টি চিকিত্সাসেবা ইউনিট। রোগী তার রোগ অনুযায়ী চিকিত্সকের পরামর্শ এবং এতদসংশ্লিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্দিষ্ট তলার স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট থেকে নিতে পারেন।
বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের বিশেষায়িত কিছু চিকিত্সাসেবা এটিকে বিশ্বের অন্যান্য হাসপাতাল থেকে আলাদা একটা মাত্রা দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন ইউনিট, ইলেকট্রোপিজিওলজি ল্যাব, ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি, নিওনেটাল ক্রিটিক্যাল কেয়ার ট্রান্সপোর্ট, রেডিয়েশন থেরাপি, সার্জিক্যাল নেভিগেশন সিস্টেম, ভাইটাল লাইফ ওয়েলস সেন্টার।
প্রতি বছর প্রায় ১.১ মিলিয়ন রোগী এ হাসপাতাল থেকে চিকিত্সাসেবা নিয়ে থাকে। এর মধ্যে ৫,২০,০০০-এর অধিক রোগী আসে বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশ থেকে। অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, চায়না, ইথিওপিয়া, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, কুয়েত, লাউস, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সুদান, ভিয়েতনামসহ পৃথিবীর প্রায় ১৯টিরও বেশি দেশে হাসপাতালের ৩৪টি রেফারেল অফিস রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের জন্য এখানে প্রায় ১৭৬ জনের বেশি দোভাষী কাজ করছে। রয়েছে ভিআইপি ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সেবা, দূতাবাস সহকারী, ই-মেইল কন্টাক্ট সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কো-অর্ডিনেশন, মেডিক্যাল কো-অর্ডিনেটর, ভিসা এক্সটেনশন সেন্টার এবং ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রার্থনা স্থান।
আমেরিকান ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এ হাসপাতালে প্রায় ৪৮০০ কর্মী রোগীদের সেবায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রয়েছে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৩০০ অধিক বিশেষজ্ঞ এবং দন্ত চিকিত্সক। রোগীর সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত আছে ১০০০-এর অধিক নার্স। চিকিত্সাসেবার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজটিও যথাযথ করে আসছে। এ লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে বামরুনগ্রাদ হাসপাতাল ফাউন্ডেশন গঠিত হয়, যা বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের পক্ষে কাজ করে আসছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১,০০,০০০  সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে ফ্রি-স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং হার্টের শিশুরোগীকে সার্জারি করা হয়েছে, তাতে তারা নতুন জীবন পেয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের কর্তৃক পুরস্কৃত হয় ‘বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল’। ২০১৫ সালে হাসপাতালটি থাইল্যান্ডের প্রথম হাসপাতাল হিসেবে আইএমটিজে কর্তৃক ‘দি ইন্টারন্যাশনাল হসপিটাল অব দি ইয়ার-২০১৫’ নির্বাচিত হয়।