বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৬:১০

তারেক ও বাবরের মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা :

Published : 2018-01-01 18:02:00

অনলাইন ডেস্ক : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩৮ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ সরকারী কর্মকর্তার ৭ বছর কারাদণ্ড চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সোমবার (১ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্কের সমাপনি দিনে প্রধান কৌশলী সৈয়দ রেজাউর রহমান ট্রাইব্যুনালে এ দাবী করেন। রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সোমবার রাষ্ট্রপক্ষ ২৫তম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।

এদিন রাষ্ট্রপক্ষে সৈয়দ রেজাউর রহমান আসামীদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ ও দৃষ্টান্তমূলক দণ্ডের স্বপক্ষে বিভিন্ন মামলায় দেয়া উচ্চতর আদালতের বেশকিছু সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মার্ডার কেস, জঙ্গী হামলায় নিহত ঝালকাঠি আদালতের বিচারক জগন্নাথ পাড়ে হত্যা মামলা ও ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী হত্যা চেষ্টা মামলা। এরপর তিনি যুক্তিতর্কের সমাপনি বক্তব্যে মামলার সকল আসামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে বিচার প্রার্থী মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে আসামিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবী করেন।
রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি সমাপ্ত ঘোষণার পর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ এ পর্যায়ে যুক্তিতর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীরা মঙ্গলবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন।
সৈয়দ রেজাউর যুক্তি উপস্থাপনে বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পরিচালিত ওই গ্রেনেড হামলার লক্ষ্য ছিলো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা। এতে করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য হতো। যাতে ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অসৎ উদ্দেশ্য।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবী অনুযায়ী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩৮ জন আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ সরকারী কর্মকর্তার ৭ বছর কারাদণ্ডের শাস্তি দাবী করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
মৃত্যুদণ্ড দাবী করা ৩৮ আসামি হলেন, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, বিএনপি দলীয় ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ, হানিফ এন্টার প্রাইজের মালিক মো. হানিফ, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এর সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম ও রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, হরকাতুল জিহাদ নেতা আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ ওরফে জিএম, শেখ আব্দুস সালাম, কাশ্মিরী নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাট, আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা শাওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, বাবু ওরফে বাতুল বাবু, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলুবুল, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহমেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান সুমন, মো রফিকুল ইসলাম সবুজ, মোঃ উজ্জল ওরফে রতন, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাও. তাজউদ্দিন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুনছালিন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মোঃ ইকবাল, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার ও লিটন ওরফে মাও. লিটন।
উক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০-বি, ৩২৪, ৩২৬, ৩০৭, ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩, ৪ ও ৬ ধারায় চার্জগঠন হয়। দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মানুষ হত্যার অভিযোগে এবং ১২০-বি ধারায় হত্যার অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগের উভয় ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ধারায় বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রাণহানির অভিযোগে এবং ৬ ধারায় অর্থ, পরামর্শ ও বিস্ফোরক দিয়ে সহায়তার অভিযোগে একই দণ্ডের বিধান রয়েছে।
৭ বছর কারাদণ্ড চাওয়া ১১ জন হলেন, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, সবেক ডিসি পূর্ব মো. ওবায়দুর রহমান, সবেক ডিসি দক্ষিণ খান সাইদ হাসান, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক ও লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, মেজর (অব.) এটিএম আমিন, তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি পরবর্তীতে আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, তদন্ত ভিন্নখাতে নেওয়া ৩ তদন্তকারী কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ।
কারণ দ-বিধির ২০১, ২১২, ২১৭, ২৩০ ও ২১৮ ধারায় উক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন হয়। ওই ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড।
উল্লেখ্য, মামলা দুইটিতে মোট ছিল ছিল ৫২ জন। বিচারকালীন সময়ে আসামি জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় এবং হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাই বর্তমানে মামলা দুইটিতে মোট আসামি ৪৯ জন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের জনসভায় সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায়। হামলায় আওয়ামীলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নির্মমভাবে নিহত হন। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রানে বেঁচে যান। আহত হন শতাধিত নেতাকর্মী। এ ঘটনায় মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় পৃথক ৩টি এজাহার দায়ের করেন।
মামলার প্রথম চার্জশিটের সাবেক উপ-মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ আসামীর বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর চার্জগঠন করে ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তীতে অধিকতর তদন্তে তারেক রহমানসহ ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৮ মার্চ চার্জগঠন করা হয়। চলতি বছর ৩০ মে মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। গত ১২ জুন মামলাটিতে জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামীর আত্মপক্ষ শুনানি শুরু হয়, যা গত ১১ জুলাই শেষ হয়। আত্মপক্ষ শুনানিতে জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামির সকলেই নিজেদের নির্দোষ দাবী করেন। এরপর শুরু হয় সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ। কারাগারে থাকা ২৩ আসামির মধ্যে ২০ জন আসামি সাফাই সাক্ষ্য প্রদান করেন। গত বছর ১১ অক্টোবর মামলা দুইটিতে আসামি পক্ষের সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এরপরই গত বছর ২৩ অক্টোবর থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়।