শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৫:৩৮

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে rag ডে

Published : 2017-11-16 17:12:00, Updated : 2018-01-08 18:16:40
ফাইল ছবি প্রতিটা বাবা মায়েরই একটা স্বপ্ন থাকে যেন তাদের সন্তানেরা বড় হয়ে সমাজে মানুষের মত মানুষ হয়ে বসবাস করুক বা জীবনে অনেক বড় হবে। হয়তো সবার ভাগ্যে এমনটা হয় না। সেটা বিভিন্ন কারনে। হতে পারে অার্থিক অস্বচ্ছলতার কারন বা সমাজের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারনে। কিন্তু যাদের পক্ষে লেখাপড়া করাটা সম্ভব বা লেখাপড়া করতে থাকে আমার এ লেখাটি তাদেরই জন্য।

হয়তো এই লেখাপড়া করতে গিয়ে শুরুতেই পারিবারিক নানা অনুশাসনের মধ্যে পড়তে হয়েছে প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রীকেই। যেমন  প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা অবস্থায় জীবনের গল্পটা এমন কেউ যদি খেলাধূলার প্রতি আগ্রহ বেশি হয়ে থাকে বা প্রচুর খেলাধূলা করেছে তাহলে তার অভিভাবক তাকে এই বলে শাসন করেছে যে - সামনে পরীক্ষা, কোন খেলাধূলা করা যাবে না। জীবনে খেলাধালার অনেক সময় পাওয়া যাবে তখন খেলো। আগে প্রাইমারি পাশ করো তারপর হাইস্কুল জীবনে খেলাধূলা করো তখন কেউ বাধা দিবে না।

আবার যারা টিভি দেখতে পছন্দ করতো তাদের বেলায় ঘটেছে এমনটা- সামনে পরীক্ষা এখন টিভি দেখা যাবে না, যাও পড়তে বসো। টিভি দেখার অনেক সময় পাওয়া যাবে। ফলে মন না চাইলেও বাধ্য হয়ে পড়তে হয়েছে। মন ভরে খেলা বা টিভি দেখা কখনই সম্ভব হয়নি।

ঠিক একই ভাবে কেটেছে হাই স্কুল জীবন। অভিভাবক এবং শিক্ষকরা বলতেন -হাই স্কুল জীবন হচ্ছে জীবন গড়ার সময়। সময় নষ্ট করা যাবে না। নবম- দশম শ্রেণীটা একটু আলাদা। এই সময়ে ছেলে মেয়েরা জীবনে নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করে। জগতের সব কিছুই রঙিন লাগতে শুরু করে। ভাল লাগার ভালবাসার একটা বিষয় চলে আসে তখন। এ সময় শিক্ষকগণ বলতেন- এস এস সিতে ভাল রেজাল্ট করতে হবে, ভাল রেজাল্ট না করলে ভাল কলেজে ভর্তি হওয়া যাবে না। কলেজে পড়াশুনার চাপ একটু কম। প্রেম করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। সুতরাং পড়াশুনা করো। এ ভাবে কেটে যায় হাই স্কুল জীবনও।

এরপর কলেজ জীবন। গায়ে একটু বাতাস লাগা শুরু করে। রঙিন বাতাস। সে বাতাসে কেউ নুয়ে পড়ে কেউ বা টিকে থাকে। যারা পরিবারের সাথে থাকে তারা মোটামুটি ভালই অনুশাসনে থাকে। কিন্তু যারা বাড়ি ছেড়ে শহরের পথ ধরে  তাদের বেশির ভাগই ভুল পথে হাঁটে। যাই হোক শিক্ষকদের কথায় প্রাইমারি আর হাই স্কুল জীবন পাড় করলেও কলেজ জীবনে আর সেরকম কথা শুনার অপেক্ষা থাকে না। অনেকে মনে মনে ভেবেছিল কলেজ জীবনে শান্তি মত ঘুরবো। এদিক সেদিক যাবো। কিন্তু কলেেজ এসে শিক্ষকদের মুখে শোনে কলেজ জীবন হচ্ছে জীবন গড়ার শেষ ধাপ। অর্থাৎ এখানে যারা ভাল করবে শুধুমাত্র তারাই স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ পাবে। তাছাড়াও কলেজের দুই বছর চোখের পলকে চলে যাবে। জীবনের আসল মজাটাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে পড়া ছাড়া কোন উপায় নাই। তাই সব কিছু আবার পড়াশুনা। যারা ভাল করে তারাই বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তি হয়। আর এই ভর্তির জন্য অবতীর্ণ হতে হয় ভর্তি যুদ্ধের ময়দানে। কলেজ জীবনের ছোট সময়টাকে যারা সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছিল তারাই শুধুমাত্র স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে পারে।

এ ভাবে সব বাধা পেরিয়ে প্রবেশ করা হয় নতুন জীবনে। যে জীবনে নেই কোন বাধা, নেই কোন পরামর্শদাতা। যে জীবন নিজের হাতেই মুঠোয়, ইচ্ছে করলেই যে কোন পথে যেতে পারি। বাধা দেওয়ার কেউ নেই। আসলেই কেউ নেই। পড়াশুনার তিনটা স্তর পার করে এসে প্রথম দিকে মনে হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এতো পড়ে কি হবে? পরে পড়া যাবে। কিন্তু কিছু দিন পরেই বুঝতে পারা যায় জীবনের আসল খেলাই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন। দীর্ঘ সময়ে গড়ে ওঠে একটা নতুন সমাজ, নতুন পরিবার। হাই স্কুল, কলেজ জীবনে অনেকে প্রেমে না পড়লেও এখানে হয়তো সেটাও হয়ে যায়। নিজের জীবনের হাল তখন নিজের হাতের উপর এসে পড়ে। শুধু সামাল দিয়ে চলতে হয়। এখানে পড়াশুনার পাশাপাশি রাজনীতি, সংস্কৃতি, খেলাধূলাসহ অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর সুযোগ থাকে। সবার সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে নিজের বিভাগে সহপাঠিদের সাথে।

আমার লেখার মূল বিষয়টা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠি নিয়ে। দীর্ঘ চার বছর অনার্স শেষে দেখা যায় সবার মধ্যে একটা বন্ধন সৃষ্টি হয়। এ বন্ধন একটা পরিবারের সাথে ভালবাসার বন্ধন। অনার্স জীবনের শেষ দিনে সাধারণত একটা অনুষ্ঠান করা হয়। যেহেতু আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাই আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিকে নিয়েই লিখছি। হয়তো এটা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও করা হয়। সেটা হলো rag ডে। এই rag  ডে আমার কাছে মনে হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি। যেখানে জড়িয়ে থাকে একটা ক্লাসের সকল শিক্ষার্থীর আবেগ, অনুভূতি আর ভালবাসা।

এই দিনটিকে স্মৃতির পাতায় অনেক রঙিন করে রাখার জন্য হাতে নেওয়া হয় নানা রকম কর্মসূচি। সেখানে থাকে ডিপার্টমেন্টকে সুন্দর করে সাজানো, কেক কাটা, রঙ মাখামাখি, প্রিয় বন্ধুদের টি শার্টে নিজের অনুভূতি গুলো লেখা। সে লেখায় স্থান পায় কত কিছু। তার সীমা নেই। বড়ই ভাল লাগার সে লেখাগুলো। এমনই ভাল লাগে যে সারা জীবন সে টি শার্ট যত্ন করে রেখে দিতে হয়। সাবেক হলে এটা হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ।

এর পর থাকে সাউণ্ড সিস্টেম, গানের তালে তালে সবাই এক সাথে নাচ, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্পটে যেমন অপরাজেয় বাংলা, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, কার্জন হল প্রাঙ্গণ, মধুর ক্যান্টিনসহ নানা স্থানে নাচ ও গানের তালে সে নাচের ভিডিও ধারণ। সত্যিই ভাল লাগার অপার অনুভূতি। এর পর থাকে সন্ধ্যায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নিজেরাই শিল্পী, নিজেরাই অভিনেতা, মডেল,উপস্থাপক, নাচনে ওয়ালা। আহ! কি মধুর সেই অনুভূতি, সেই স্মৃতিগুলো।

শুধু এই একটি দিনই সব বাধা ভুলে নেচে গেয়ে কাটানো হয়। এক সাথে খাওয়া। কেউ বলে না পড়াশুনা আছে, এখন থামো। আসলে এমন একটি দিনে কিছু বলারও থাকে না। শিক্ষা জীবনের শেষ দিন বলে কথা। তাই এই rag ডে সংস্কৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই নির্বিঘ্নে যেন করতে পারে সে দিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ। সমাজের কোন কাল থাবা যেন এই আবেগ, অনুভূতি আঘাত করতে না পারে সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

পরিশেষে বলি rag ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামী, অমূল্য একটি দিন। পৃথিবীর কোন কিছুর বিনিময়েও এই দিনকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। এই rag ডে স্মৃতি মানসিক প্রশান্তির একটি মহৌষধ।

এরপর চলে জীবনের আসল ট্রাজেডি। কর্মজীবন। অনেকের মধ্যে শুরু হয় ভাঙ্গনের গান। যারা প্রেম করে শুধু তাদের ক্ষেত্রে হতে পারে এমন। হয়েও থাকে অনেকের জীবনে। সময় মতো চাকরি না পাওয়ার কারনে কনে পক্ষ আর দেরি করে না। ফলে যা হবার তাই হয়।  তারপরেও জীবন থেমে থাকে না। জীবন চলে জীবনের নিয়মেই। তারপরেও ভাল থাকুক rag ডের বন্ধুরা।

লেখকঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা
দপ্তর সম্পাক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।