রবিবার ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭, সকাল ০৮:৩২

জঙ্গিদের আত্মঘাতী কৌশল : নতুন শঙ্কা!

Published : 2017-03-29 22:14:00
মেজর জেনারেল মো. আবদুর রশীদ (অব): স্বাধীনতার মাস মার্চের গৌরবোজ্জ্বল ধারাকে মলিন করতে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে একাধিক অসফল হামলায় ব্যস্ত থেকেছে, অপরদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও গুঁড়িয়ে দিয়েছে অনেক জঙ্গি আস্তানা। আত্মঘাতী হামলাগুলো সফল না হলেও মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে অবলীলায়। জঙ্গি হামলার কৌশল, লক্ষ্যবস্তু ও মাত্রা থেকে জঙ্গি সংগঠনে অস্থিরতা ও বেপরোয়া ভাব লক্ষ করা গেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া অন্তত ৮টি জঙ্গি ঘটনা, জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সফলতার কৃতিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান করে তুলেছে মানুষকে। আত্মঘাতী হামলা ও জঙ্গিদের প্রতিরোধ প্রবণতা থেকে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার শঙ্কা বেড়েছে। জঙ্গিবাদের বৈশিষ্ট্য ও অনুসৃত কৌশল ও প্রস্তুতির মাত্রা থেকে হামলা করার শক্তি ও সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা করা যায় সহজেই। বাহ্যিকভাবে নিউ জেএমবি নামের জঙ্গি সংগঠনটি শক্তির মহড়া দেওয়ার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। প্রতিটি হামলার পরে ক্রমাগতভাবে শক্তি হারিয়ে জঙ্গি সংগঠনটি প্রচণ্ড অস্থিরতায় ভুগছে। মাথাচাড়া দেওয়ার শুরুতেই চট্টগ্রাম ও সিলেটের আস্তানায় ২ নারীসহ ৪ প্রশিক্ষিত জঙ্গি জীবন হারালে নেতৃত্ব ঘাটতি শূন্যের দিকে এগিয়ে গেছে এবং আস্তানায় বহু কসরত করে জড়ো করা অস্ত্র ও গোলাবারুদগুলো হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় জঙ্গিদের সামর্থ্য আরও খর্ব হয়েছে। তবে হামলা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থেকে কোনো দেশই এখন মুক্ত নয়। কিন্তু ঝুঁকির মাত্রার পার্থক্য রয়েছে। স্থিতিশীল বাংলাদেশে ধর্মের নামে মানুষ হত্যার সহিংস চর্চা জনগণ আগে দেখেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গিরা আরও বেশি নৃশংস ও বর্বর হয়ে উঠেছে। নতুন প্রযুক্তি যোগ হচ্ছে, নরম লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নিরীহ মানুষ হত্যার লীলাখেলায় মেতেছে। আমাদের দেশের একদল ধর্মান্ধ মানুষ তাদের সমর্থন করে জঙ্গিদের শক্তি ও পুষ্টি জোগায়। গণতন্ত্রের ঘাটতি, সুশাসনের অভাবকে জঙ্গি বিস্তারের কারণ হিসেবে নির্ণয় করছে। যদিও জঙ্গি দর্শন গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না এবং পার্থিব জগতের প্রাপ্তিতে তাদের মনোযোগ নেই। তাদের মধ্যে পারলৌকিক জগতের প্রতি মোহ সৃষ্টি করে ধর্মজ্ঞানের ঘাটতিকে পুঁজি করে আত্মঘাতী বানানো হচ্ছে।  
এবারে হামলা শুরু হয় প্রথম প্রজন্মের জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর (হুজি-বি) শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানকে বহনকারী প্রিজন ভ্যানে। মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় জঙ্গি মতাদর্শের প্রতি বড় ধরনের আদর্শিক ধাক্কা। মুফতি হান্নান সকল জঙ্গির কাছে জিহাদের আইকন হিসেবে পূজনীয় এবং অনুপ্রেরণার উত্স। তার ফাঁসি নিঃসন্দেহে জঙ্গিদের মনোবলে প্রচণ্ড আঘাত ও মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের দৃশ্যমান স্তম্ভ হয়ে আবর্তিত হচ্ছে। শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ ছয় জঙ্গির ফাঁসি জেএমবি নামের বীভত্স জঙ্গি দলকে গর্তে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার উদরে জন্ম নেওয়া জঙ্গি দলটি খেই হারিয়েছিল অতি সহজেই।  
পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নির্দেশ ও পুষ্টি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এদেশীয় ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলোর দুধ খেয়ে বেড়ে ওঠা হুজি ও তার নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ইসলামী জিহাদের অছিলায় নব্বইয়ের দশকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার আবহমান সংস্কৃতি ও তার চর্চাকারী বাহকদের ওপর। কুপিয়েছিল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের। ইসলাম আশ্রয়ী রাজনৈতিক দল ও জঙ্গি দলগুলো বাংলাদেশের জন্ম কোনোদিন মানতে পারেনি। ইসলামের তথাকথিত ঝাণ্ডাধারী পাকিস্তানের স্বার্থকে রক্ষা করতে তারা খুন করতে চেয়েছিল শেখ হাসিনাকে। ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে হামলা দিয়ে শুরু করে কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলা নববর্ষে রমনা বটমূল, ময়মনসিংহের সিনেমা হল, সিলেটে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ও সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়ার ওপর হামলা এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করে বিশ্বকে কাঁপিয়ে তোলে। সেই নেতার ফাঁসি স্বভাবতই জঙ্গিদের কিছুটা হলেও অস্থির করে তুলবে। যেমন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে জামায়াতে ইসলামীকে অস্থিরতায় ভুগতে দেখা গেছে।
অপরদিকে নিউ জেএমবি নামের দলটি ইসলামিক স্টেটের ভাবধারার সিল মেরে গ্রামেগঞ্জে টার্গেট কিলিং করে অবশেষে গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বিদেশিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ১৭ জন নিরীহ বিদেশিসহ ২০ জনকে জিহাদের নামে কুপিয়ে হত্যা করে ইসলাম ধর্মকে কলুষিত করা হয়েছে। বাঙালি মুসলিমদের সম্মান ও আত্মমর্যাদাকে ধুলায় মিশিয়েছে। তামিম-সরোয়ার-কাশেমরা মিলে ২০১৩ সালে জেএমবি, আনসারউল্লাহ ?বাংলা টিম ও হিজবুত তাহরীর, জামায়াত-শিবিরের অংশবিশেষকে নিয়ে সঙ্গোপনে গড়ে তুলেছিল এক দুর্ধর্ষ জঙ্গি দল। পাশে পেয়েছিল দেশি-বিদেশি মদদদাতাদের। নিউ জেএমবির শীর্ষ নেতারা নিহত হলে দলটি কিছুটা বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শক্তি হারায়। পুলিশি অভিযানের মুখে গুটিয়ে পড়া দলটি ইদানীং আবার মাথাচাড়া দিয়ে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। নতুন নেতা দলকে আবার সংগঠিত করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। নতুনভাবে আরও আগ্রাসী কৌশল নিয়ে মাঠে নেমে আসে। দেখা মেলে জঙ্গিদের আত্মহনন ও আত্মঘাতী কৌশল; যা অস্থিরতা, পাগলামি এবং অপরিপক্বতার লক্ষণ।
রাজধানীর কড়া নিরাপত্তার মুখে টিকতে না পেরে ঘাঁটিগুলোকে ঢাকার বাইরে নিয়ে সঙ্গোপনে ও সন্তর্পণে বোমা বানিয়ে ঢাকাতে আচমকা হামলার প্রস্তুতি নিতে থাকে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বোমা আনার সময় কুমিল্লার চান্দিনায় পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির মুখে পড়লে পুলিশের ওপর বোমা ছুড়ে পালানোর চেষ্টাকালে পুলিশ ও জনতার হাতে ধরা পড়ে দুই জঙ্গি। ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে পুলিশ আস্তানার সন্ধানে নামলে মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ মেলে। জঙ্গিদের পরিবারভিত্তিক আস্তানার অস্তিত্ব আজিমপুর ও আশকোনায় পাওয়া গিয়েছিল। জঙ্গিদের পরিবার আটক হয় এবং একজন নারীকে তার শিশুসন্তানসহ আত্মঘাতী হতে দেখা গেছে আশকোনার আস্তানায়। এবার সীতাকুণ্ড এবং সিলেটের আস্তানায় পরিবারদের লড়তে দেখা গেল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। জঙ্গিদের কোমরে সুইসাইড বেল্ট বাঁধা। এটা আত্মরক্ষা না আক্রমণের জন্য, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে। তবে সব ক্ষেত্রেই অঙ্কের শেষ হয়েছে মরণ বরণে।   
জঙ্গিদের নতুন কৌশলের মধ্যে ফুটে উঠছে পরিবারকেন্দ্রিক ইউনিট গঠন, লড়াইয়ে নারীদের সক্রিয়তা, গ্রেফতার এড়াতে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া এবং আত্মঘাতী হামলা করার প্রবণতা। দক্ষ ও অদক্ষ জঙ্গি এবং মাদ্রাসা ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের সংমিশ্রণ আমরা গুলশান হলি আর্টিজানের হামলা থেকে লক্ষ করে আসছি, যার প্রবাহ এখনও চলমান রয়েছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে কমতির দিকে এবং নতুন জঙ্গিদের আগমনে বড় খরা লেগেছে। ফলে বিবাহ বন্ধনকে জঙ্গি সংগ্রহের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। জঙ্গি মতাদর্শে অনুপ্রাণিত করে গৃহত্যাগ বা হিজরতের পথকে ধরে রেখেছে। পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের পরিত্যাগ করে জঙ্গিরা বিভিন্ন ঘাঁটিতে বাস করছে। এলাকার মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য পরিবারকে পাশে রেখে নিরীহ মানুষ সেজে বাসা ভাড়া করতে পারছে এবং ঘন ঘন বাসাবদল করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছে। বোমা তৈরি করার আস্তানাগুলোকে মফস্বল শহরে নিয়ে গেছে। ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ঘাঁটি গেড়েছিল। সেখান থেকে তৈরি বোমা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে নিয়ে এসে হামলা করার কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু বিধি বাম হওয়াই বর্ধমানের আস্তানায় বোমা বিস্ফোরিত হলে জানাজানি হয়ে যায়। ভারতের এনআইএ তদন্তে নেমে নেটওয়ার্কটিকে উচ্ছেদ করতে সমর্থ হয়। এবারও ঘটনার শুরু হয় চট্টগ্রামের ঘাঁটি থেকে বোমা ঢাকা আনার চেষ্টাকালে। পথে পুলিশি তল্লাশিতে পড়ে দুজন জঙ্গি আকস্মিক হামলা করে ধরা পড়ে। সূত্রের উত্স নিয়ে এগুতে গিয়ে নজরে আসে চট্টগ্রামের আস্তানা। সেখান থেকে সন্ধান মেলে সিলেটের আস্তানার। খবর মেলে সিলেটের শিববাড়ীর আতিয়া মহলে বর্তমানে সংগঠনের হাল ধরা নেতা বাংলাভাইয়ের সাবেক অনুচর সাবেক স্কুলশিক্ষক মাইনুল ইসলাম মুসার উপস্থিতি। শক্ত প্রতিরোধের আশঙ্কা থেকে সতর্কতার মাত্রাকে উঁচুতে রেখে অভিযান পরিচালিত হয়। শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ভবনে থাকা ২৯টি পরিবারের ৮৬ জন বাসিন্দার নিরাপত্তা নিয়ে। অনেক উত্কণ্ঠা ও গোলাগুলির মধ্য দিয়ে ৪ জঙ্গিকে মেরে মানুষের হতাহতকে এড়িয়ে সুচারুভাবে পরিচালিত অভিযান শেষ হয়। কিন্তু ভবনের অদূরে পুলিশের অস্থায়ী চেকপোস্টে বোমা বস্ফুিরণ হয়। অপ্রসন্ন ভাগ্য থেকে দুজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জনের করুণ মৃত্যু হয় এবং অনেকে আহত হন। জঙ্গিত্ব যে নিরীহ মানুষের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তা আবার প্রমাণিত হল। জঙ্গিদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ মানুষের বিতৃষ্ণা ও ধিক্কার পুনরায় ধ্বনিত হল। এমনকি জঙ্গিদের পিতা-মাতাও দায়ভার নিতে অস্বীকার করল, সামাজিক লাঞ্ছনা এড়াতে মরদেহ গ্রহণ না করে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিসম্পাত দিল।
অস্তিত্ব সঙ্কটে থাকা জঙ্গিরা অস্থির ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে হামলার মাধ্যমে নিজেদের সামর্থ্য জাহির করার জন্য। আত্মঘাতী হামলা প্রতিরোধ করা খুব দুষ্কর। জঙ্গিদের নেতৃত্ব, আস্তানা, সরবরাহ পথ ও পৃষ্ঠপোষকদের উত্খাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। মাদকের মতো জঙ্গি মতাদর্শকে না বলতে হবে সমাজকে। ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে জঙ্গিবাদ রোখা যাবে না। পবিত্র ইসলামকে শান্তির পথে ফেরত আনতে ইসলাম আশ্রয়ী রাজনীতিকে বর্জন করতে হবে। মওদুদিবাদ, সালাফিবাদ ও ওয়াহাবিবাদ পবিত্র ইসলামকে হিংসার পথে নিয়ে যাচ্ছে। জিহাদের নামে মানুষ খুন জায়েজ করছে।
‘ভয় দিয়ে জয় করা’ জঙ্গিদের একটি অব্যর্থ কৌশল। মনে শঙ্কা জাগলেও আতঙ্কিত না হয়ে সাহসের সঙ্গে হিংসার দানবকে দমন করতে শিখতে হবে। পরিবারে যাতে জঙ্গির জন্ম না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি সমাজের জঙ্গিবিরোধী সচেতনতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা বাহিনীর জঙ্গি নিধন কৌশল ও দক্ষতাকে অস্বীকার করা যায় না। মানুষকে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে জীবন বিসর্জন দেওয়া বীর সদস্যদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রইল। জঙ্গিবিরোধী কৌশলকে বহুমুখী ও সমন্বিত রূপ দিতে হবে এবং আরও বেশি জনসম্পৃক্ত করতে পারলে সফলতা আরও গতি পাবে।  
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক; ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিসের (আই ক্লাডস) নির্বাহী পরিচালক