মঙ্গলবার ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭, রাত ০২:০৬

প্রিয় নগরী ঢাকা

Published : 2017-03-28 21:56:00
মো. আসাদুল্লাহ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নগর তো বটেই, এখন পর্যন্ত মানুষের নাগরিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকও বলা যায় এই নগরকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সুযোগ, চিকিত্সাসেবা, উন্নত জীবনযাপন বা অধিকতর নাগরিক সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশা যেভাবেই বলা হোক না কেন, যেকোনো প্রয়োজনে ঢাকা এখনও মানুষের হূদয়ে ঢেউ তোলে; সেটা ঢাকায় বসে হোক বা ঢাকা থেকে বহুদূরের গ্রামে বসেই হোক। অনেকের ধারণা, যারা একবার ঢাকায় যেতে পারেন জীবনটা তাদেরই বর্তে যায়, যারা যেতে পারেন না তারা একধরনের হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে দিনাতিপাত করেন আর মাঝে মাঝে হাহাকার করেন।
যদিও ঢাকা এখন আর দূরের কোনো শহর নয়। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কারণে এখন মানুষের ঢাকায় আসার জন্য বিশদ পরিকল্পনার দরকার হয় না, যেটা একসময় দরকার হতো। সে হিসেবে ঢাকা মানুষের এখন অনেক কাছের শহর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঢাকাকে আমরা যতই বসবাসের অযোগ্য বলি না কেন, যতই সমস্যাকবলিত নগর বলে আখ্যায়িত করি না কেন, আসলেই ঢাকার কোনো বিকল্প নেই। অনেকের কাছেই ঢাকা স্বপ্ন পূরণের স্থান। প্রয়োজন হোক বা না হোক, ঢাকা মানুষের হূদয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে। মানুষ ঢাকাকেই সমস্যা সমাধানের স্থান হিসেবে বিবেচনা করে আসছে বা করছে। যদিও এক্ষেত্রে মানুষকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। প্রশাসনিকভাবে ঢাকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষের ঢাকায় না এসেও উপায় নেই। ঢাকা মানুষকে যা দিতে পেরেছে বা দিতে পারে, অন্য কোনো নগর বা শহর মানুষের সেই চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। বাংলাদেশের প্রধান ও সবচেয়ে উন্নত শহর হলেও এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকা। এই শহরে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বসবাস করে। কেউ প্রয়োজনের তাগিদে ঢাকায় এসে কর্ম সম্পাদনের পরে চলে যায়, কেউবা থেকে যায়।
যারা ঢাকায় থাকেন, তারা সবাই যে আরাম-আয়েশে দিনাতিপাত করেন, ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয়। কারও কারও জন্য ঢাকা পরম আরাধ্য হলেও কারও কারও জন্য তা নয়। এখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। যাদের অনেকেই জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে ঢাকাকেই জীবনধারণের শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগেরই জায়গা হয় পথের ধারে, রেললাইনের পাশে গড়ে ওঠা বস্তিতে। এক হিসাব অনুযায়ী, ৪০ লাখ মানুষ বাস করে বস্তিতে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অভিলাষ চরিতার্থে নিশ্চয়ই তারা কেউ বস্তিবাসী হননি। অনেকে আবার এই বস্তিতে জায়গা না পেয়ে রেলস্টেশন, ফুটপাত বা খোলা জায়গায় বসবাস করেন। জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে এভাবেই দিন গুজরান করছেন। এভাবে বেঁচে থাকাটাও সহজ নয়। সেখানে পরিবারের সদস্যদের কোনো না কোনোভাবে উপার্জন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। এক্ষেত্রে বাদ পড়ে না পরিবারের কনিষ্ঠ অবুঝ সদস্যটিও। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়াই যেখানে নিয়তি সেখানে সন্তানের কর্মযজ্ঞ অব্যাহত না থাকলে এই স্বপ্নের শহরে একটু শ্বাস নেওয়া মুশকিল। ফলাফল, শ্রমে নিয়োজিত শিশুর পরিসংখ্যান বৃদ্ধির রসদে পরিণত হওয়া। যারা পোশাক শিল্পে কাজ করেন তারা কথিত উন্নত জীবনের অধিকারী হওয়ার জন্যই নগরে আসেন নাকি জীবনধারণের ন্যূনতম সংস্থান নিশ্চিত করার জন্যই তাদের এই অপ্রত্যাশিত (!) আগমন। তাদের জীবনে দরকার নেই লাল নীল সবুজ বাতির আলোকসজ্জা। জীবনযুদ্ধে পরাজিত না হওয়ার দীপ্ত প্রত্যয় শুধু তাদের চোখে। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আয়-ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পার্থক্য, বাড়িভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও নানাবিধ শোষণ বঞ্চনার উপস্থিতি তাদের জীবনের স্বপ্নকে ক্রমান্বয়ে ফিকে করে দেয়। ফলাফল, দারিদ্র্যের দুর্বিপাকেই জীবনের জয়গান!
ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষের সিংহভাগই বিভিন্ন উত্সবে গ্রামের বাড়ি বা অন্যত্র যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। বাস, ট্রেন, লঞ্চ কোথাও তিল ধারণের জায়গা থাকে না। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাস, লঞ্চ বা ট্রেনের ছাদে করে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উত্সবের আনন্দে শামিল হওয়ার এই যজ্ঞে আইন-কানুন, বিধিনিষেধ সবই যেন নস্যি। যারা শত চেষ্টা করেও যেতে পারেন না, তারা বাধ্য হয়ে ঢাকায় পড়ে থাকেন। মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হিমশিম খেতে হয় রাষ্ট্রকে। কিন্তু কেন এমন হয়? কেন মানুষ তার স্বপ্নের শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতেই যেতে চায়? ঢাকা কি তাহলে তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম সংস্থান কিছুটা নিশ্চিত করতে পারলেও বিষয়টিতে একেবারে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে? অথবা মানুষ কেন ঢাকাকে নিজের মনে করতে পারছে না? উপরিউক্ত জিজ্ঞাসার একটিরও উত্তর সম্পর্কে যদি নিশ্চিত হওয়া যেত, তাহলে অন্তত উত্সবকেন্দ্রিক অনেক বিড়ম্বনা এড়ানো যেত।
হিসাব করলে দেখা যাবে, এই শহরে মানুষ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা হিসেবে প্রাপ্য অনেক অধিকার থেকে রীতিমতো বঞ্চিত হয়েছে কিংবা এখনও হচ্ছে। নগর জীবনের মানুষগুলোর হেঁটে চলার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সৃষ্ট ফুটপাত আজ পথিকের দখলে নেই। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ফুটপাত উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। গণপরিবহনের অপ্রতুলতা দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অফিসে যাওয়া এবং আসার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পালা শেষ করে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে কী করে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের অবদান রাখা যায়, সেটা অবশ্য একটা প্রশ্নের বিষয়। ঢাকা শহরে অফিসগামী মানুষের প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বিড়ম্বনা চরমে ওঠে, যা নাগরিকদের বিব্রতকর। নগর উন্নয়নের বিশদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতিসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। এছাড়া নগর জীবনের কর্মব্যস্ততা থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিনোদনকেন্দ্রের অপ্রতুলতা মানুষের বিনোদনের অধিকারকে সঙ্কুুচিত করেছে। মানুষের প্রাত্যহিক কর্মযজ্ঞে নানাবিধ দায়িত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা সতেজ হওয়ার তীব্র বাসনার পাশাপাশি শিশুদের মনোদৈহিক বিকাশ নিশ্চিতে সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রাসঙ্গিক বিনোদনের যে বিকল্প নেই, এটা নাগরিকমাত্রই স্বীকার করবেন। এখন প্রশ্ন হল, বিনোদনের ক্ষেত্র কতটুকু আছে বা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু আছে কি না? নগরে বিনোদনের ক্ষেত্র একেবারেই যে নেই, তা নয়। কিন্তু সেসব ক্ষেত্র কতটুকু নাগরিক চাহিদা পূরণ করছে বা করতে পারছে, সেটা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু বিনোদন ক্ষেত্র গড়ে উঠলেও তার সব যে অব্যবস্থাপনা ও সমস্যামুক্ত, সেটা জোর দিয়ে বলা অসম্ভব।
অনেক সময় বিনোদন পাওয়ার পরিবর্তে অপদস্থ হওয়ার আশঙ্কায় মন আনন্দিত হওয়ার চেয়ে বিক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি জাগে। রাজধানীতে অবস্থিত পার্কগুলোর অবস্থা শোচনীয়। শঙ্কার চাদরে মোড়ানো পার্কগুলোয় অবকাশ যাপন বা বৈকালিক অবসর কাটানো মুশকিলই বটে। নানা ধরনের উত্পাতে ভ্রমণের উত্সাহে ভাটা পড়তে বাধ্য। অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাব, মাত্রাতিরিক্ত কর্মব্যস্ততা, অসহনীয় যানজট থেকে মুক্ত হয়ে অবকাশ যাপনের ইচ্ছে থাকলেও নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনাসহ নানাবিধ কারণে বিনোদনের ক্ষেত্র সঙ্কুুচিত হচ্ছে। আমরা কি শহুরে সভ্যতার অপরিহার্য উপাদান হয়ে গেছি যে মুক্ত বাতাসে একটু শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। প্রকৃতির সান্নিধ্য আজ বহু দূরে। মানসিক বিকাশ থমকে আছে। আধুনিকতার ছোঁয়া হয়তো পাওয়া যাচ্ছে কিছুটা কিন্তু মাটির গন্ধ পাওয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছি। আগামী প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে তাদের প্রাপ্য থেকে। খেলাধুলার মাঠ, পার্ক কিংবা উদ্যানের স্বল্পতা ও শহরে প্রকৃতির অনুপস্থিতি ক্রমেই মানুষকে গৃহকেন্দ্রিক কিংবা টেলিভিশন-নির্ভর করে তুলেছে।
শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ায় টেলিভিশন, কম্পিউটার আর ভিডিও গেম তাদের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে বেড়ে ওঠায় তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আমরা যত মাতামাতি করি বাস্তবিক তাদের মনোগত বিকাশ বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ততটা মাথা ঘামাই না। পরীক্ষার ফলাফলটাকেই সাফল্য মনে করি। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। সর্বপ্রথম একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাটা জরুরি। কাজেই নাগরিক বিনোদন নিশ্চিতকল্পে বহুমুখী উদ্যোগের বিকল্প নেই। ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠলেও সেগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। আশা করছি, কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে নজর দেবে। নাগরিক জীবনে উদ্ভূত বিড়ম্বনা এড়িয়ে সুষ্ঠু স্বাভাবিক নগরী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তবেই সবার স্বপ্নের ঢাকা গড়ে উঠবে।
লেখক : শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ashadullah.bd@gmail.com