বুধবার ২২ নভেম্বর, ২০১৭, সকাল ০৭:৫৩

ইমাম হোসেইনের কালজয়ী সংগ্রামের স্বরূপকাঠির খোঁজে

Published : 2017-09-30 12:36:00,
মাহদি মাহমুদ:কারবালার ময়দানে ১০ মুহররম কি এমন যুদ্ধ হয়েছিলো, যে দীর্ঘ ১৪০০ বছর ধরে মুসলিম উম্মাহ সেই শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে? দ্বন্দ্বটা কি ছিলো ক্ষমতার? যুদ্ধটা কি “রাজায় রাজায় লড়াই চলে, উলুখাগড়ার প্রানান্ত?”

৬০ হিজরির রজব মাসে উমাইয়া বংশীয় খলিফা মুয়াবিয়া মৃত্যুবরণ করার পর মুয়াবিয়ার পরিকল্পনানুসারে তার দুশ্চরিত্র পুত্র ইয়াজিদ খেলাফতের মসনদ জবরদখল করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা)এর দৌহিত্র ইমাম হাসানের সঙ্গে মুয়াবিয়ার চুক্তি ছিলো যে, মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইমাম হোসেইন মুসলিম উম্মাহর খলিফা হবেন। আর, ইমাম হোসেইনই ছিলেন এক্ষেত্রে সবচেয়ে যোগ্য।

ইয়াজিদ ক্ষমতায় বশেই, মদিনার গভর্নরের কাছে নির্দেশ পাঠায়, “হয় হোসেইনের কাছ থেকে আমার খিলাফতের সমর্থন/বায়াত আদায় করো নয়তো তাকে শিরচ্ছেদ করে তার মাথা আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।”

একথা শোনার পরই রজব মাসের শেষদিকে ইমাম হোসেইন মদিনা ত্যাগ করেন প্রকাশ্য-পাপাচারী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের উদ্দেশ্যে। তিনি তার দেড়মাসের শিশুসন্তান থেকে শুরু করে পরিবারের সকল নারীকেও তার এই সংগ্রামের সঙ্গী করেন। অতপর তিনি মক্কায় যান হজপালন করতে। সেখানে থাকতে তিনি ইরাকের কুফাবাসীদের নিকট থেকে হাজার হাজার চিঠি পেতে থাকেন যেগুলোতে ইমাম হোসেইন কে অনুরোধ জানানো হয়, তিনি যেন কুফাবাসীর ইয়াজিদবিরোধী বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

অপরদিকে মক্কায় অবস্থানরত ইমামের আত্মীয়স্বজন ইমামকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইমাম তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। কেননা রাসুলে পাক(সা) তাঁর দৌহিত্র ইমাম হোসেইনকে কারবালার মুসিবতের ভবিষ্যতবাণী করে গিয়েছিলেন এবং এই সময় তাকে দৃঢ় থাকার উপদেশ দিয়ে গিয়েছেন।

ইমাম হোসেইন হজ অসমাপ্ত রেখেই মক্কা ছাড়লেন। কেননা তিনি জানতে পেরেছিলেন, হজের সময় পবিত্র কাবা ঘরের প্রাঙ্গণে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কাবা ঘরের প্রাঙ্গণে একটা সামান্য মশা মারাও নিষিদ্ধ, তাই তিনি চাইলেন না তাঁর রক্তপাতের মাধ্যমে কাবার পবিত্রতার বিধান ভুলুন্ঠিত হোক।

প্রায় একই সময়ে তিনি কুফার উদ্দেশ্যে তাঁর ভাই মুসলিম বিন আকিলকে পাঠান, কুফার বাস্তব অবস্থা বুঝে ইমামের পক্ষে জনসাধারনকে প্রস্তুত করার জন্যে।

মক্কা ছেড়ে কুফার উদ্দেশ্যে চলতে চলতে ইমামের কাফেলা পথ হারিয়ে ফেলে এবং ইমাম জানতে পারেন যে তিনি কারবালা নামক করাল মৃত প্রান্তরে এসে পৌছেছেন। তার মনে পড়ে যায় নানা মুহাম্মদ (সা) এর ভবিষ্যতবানী এবং বুঝতে পারেন তার মৃত্যু অত্যাসন্ন। একইসময় জানতে পারেন যে, মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় ইয়াজিদী গভর্নর প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ করে হত্যা করেছে, কিন্তু কুফার জনগণ তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।

এদিকে ইমাম শিবিরের পথরোধ করে হুর নামক ইয়াজিদের সেনাবাহিণীর এক প্রধান। ফোরাত নদীর কুল বন্ধ করে দেয়া হয় ইয়াজিদের নির্দেশে, যাতে ইমামের পরিবার পানি না পান করতে পারে।

একে একে প্রায় ত্রিশ হাজার ইয়াজিদী সৈন্য চারদিক থেকে ইমামের কাফেলাকে ঘিরে ফেলে। বিপরীতে ইমামের সাথে ছিলেন স্ত্রী-সন্তান, সহযোগীসহ বাহাত্তর, মতান্তরে ১১০ জন। ইয়াজিদের সেনাপ্লাটূনের ওই প্রধান “হুর ইবনে ইয়াজিদ” তার ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে ইমামের কাফেলার যোগ দেয়। এবং ইমামের পক্ষে প্রথম যোদ্ধা হিসেবে শহীদ হয়। একে একে ইমামের সহযোগী এবং পুরুষ পরিজনরা প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত অবস্থায় বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হন। মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে যাওয়ায় ইমাম তার ছয় মাস বয়সী শিশুপুত্রকে ইয়াজিদী বাহিনির কাছে নিয়ে গিয়ে সামান্য পানি ভিক্ষা চান তাদের কাছে। বদলে ইয়াজিদী বাহিনী ইমামের শিশু বাচ্চাটির গলায় তীর মেরে শিরচ্ছেদ করে। সবশেষে ইমাম যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন, যুদ্ধ করতে করতে যখন তার শরীরে আর একটাও তীর বিদ্ধ হওয়ার জায়গা থাকলো না তখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। ৬১ হিজরির ১০ই মুহররম শিমর নামক পাপাত্মা তাঁর বুকে চেপে বসে তাঁকে শহীদ করলো।

এরপর ইমাম হোসেইনের বিপ্লবের পতাকা ইমামের বোন বিবি জয়নাবের হাতে আসলো । কারবালা থেকে কুফা হয়ে সিরিয়ার বাজারে বাজারে যখন তিনিসহ নবী মুহাম্মদ(সা)এর বংশের অন্যান্য নারীদেরকে বেপর্দা করে ঘোরানো হচ্ছিল এবং যখন তাকে কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ এবং সিরিয়ায় ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে আসা হয়, প্রতি সময় তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠে একের পর এক ভাষণ দিয়েছিলেন। তার খুতবায় সিরিয়ায় ইয়াজিদের দরবারে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছিলো প্রায়।

 

এই হলো অতি সংক্ষেপে কারবালার ইতিহাস, যার ফলে মুহররমের ১০ তারিখ দিনটির অন্যসব ঘটনা ছাপিয়ে দুটি নাম লেখা হলো: হোসেইন!কারবালা!

 

সেদিনের কারবালা ইমাম হোসেইন আর ইয়াজিদের কোন নারীঘটিত যুদ্ধ ঘটেনি যেমন দ্বন্দ্বের কথা বলা হয়েছে বিষাদসিন্ধু নামক অতিকাল্পনিক উপন্যাসটিতে।কিংবা গোষ্ঠিগত কোন বিবাদ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রুপ লাভ করেনি।

কারবালার ময়দানে সেদিন কোন যুদ্ধ হয়নি। হয়েছিলো মানব ইতিহাসের উজ্জ্বলতম সংগ্রামটি। যেখানে ইমাম হোসেইন তার ছয় মাস বয়সী শিশু সন্তান আলি আজগার, ভাই আব্বাস, ভাতিজা কাসেমসহ বাহাত্তর জনকে সঙ্গে নিয়ে শহীদ হন। তার এই সংগ্রামে সাথি হয়েছিলেন স্ত্রী, কন্যা, বোনসহ নিকটতম আত্মীয়গন। ইমামের শাহাদাতের পর যাদের প্রত্যেকে ইয়াজিদি সৈন্যদের অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন।

প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স বলেছিলেন, “যদি হোসেইন তার পার্থিব কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করতেই যুদ্ধ করে থাকেন, তবে আমার বোধগম্য হয় না কেন তিনি তাঁর স্ত্রী, ভগ্নি এবং শিশুদেরকে সাথে নিয়েছিলেন। যুক্তিভিত্তিকভাবে চিন্তা করলে এই সিদ্ধান্তেই আসা যায় যে, আল হোসেইন কেবলমাত্র ইসলামের স্বার্থেই সংগ্রাম করেছিলেন। ”

কিসের জন্য ইমামের এই আত্মত্যাগ? যেখানে সেয়ানে সেয়ানে যুদ্ধ করেও আজকের যুগের পরাশক্তিগুলো কেউ কাউকে টেক্কা দিতে পারছেনা সেখানে কোন শক্তির বলে ত্রিশ হাজার ইয়াজিদি দক্ষ সৈন্যের বিপরীতে মাত্র ১১০ জন সাধারণ মানুষ-যাদের অধিকাংশই বৃদ্ধ, কিংবা কিশোর আর দাস, তাদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন ইমাম হোসেইন আর সেই যুদ্ধের ১৪০০ বছর পর আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইমাম হোসেইন কি সুস্পস্টভাবেই না জয়ী হয়েছিলেন। বস্তুবাদীদের সকল ধারনা ভুল প্রমানিত করে আপাতদৃস্টে এবং বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে সুস্পস্ট পরাজিত একটা শক্তির পক্ষে আজ ইতিহাস লেখা হয়েছে। তাই আজ আইএসের হামলা, কাপুরুষোচিত বোমাবাজির পরেও ইরাকের নাজাফ থেকে কারবালার রাস্তায় আশুরার দশদিন এবং আর আশুরার চল্লিশতম দিনে পৃথিবীর বৃহত্তম গনজমায়েত হয়ে থাকে।

কারবালার সংগ্রামের উদ্দেশ্য ছিলো দুইটি। উমাইয়া বংশীয়দের জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা আর আদর্শহীন এবং উদাসীন জনসাধারনের ঘুম ভাঙ্গানো।

জুলুম এমন একটি বিচিত্র অপরাধ যার ক্ষমা আল্লাহ ততক্ষণ করবেন না, যতক্ষণ না যার প্রতি জুলুম করা হয়েছে সে ক্ষমা করে। জুলুম মানে কারো প্রতি অন্যায় করা। নির্যাতননিপিড়ন করা। কারো নামে গিবত দেয়া-অপবাদ দেয়া। যে কোন শারিরিক মানসিক ক্ষতি কিংবা কারো আওতাধীন সম্পত্তির জবরদখল।আমানতের খেয়ানত।

ইমাম হোসেইন বলেছিলেন, “যদি তুমি কোনো ধর্মে বিশ্বাসী  না’ও হও,তবুও অন্তত জুলুম-অত্যাচার করা থেকে বিরত থাকো।”

শাসকশ্রেনীর জুলুম নির্যাতন হচ্ছে সবচেয়ে নেক্কারজনক সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা,যার বিরুদ্ধে চোখ বুজে থাকা ইসলামে গর্হিততম অপরাধগুলোর একটি।একবার সমাজে যদি শাসকশ্রেনীর স্বেচ্ছাচারিতা, জুলুম নির্যাতন ,রাজতন্ত্র সহজাত হয়ে যায়, তার অর্থ এটাই যে শাসনযন্ত্রের ভেতর থেকে পচন ধরা শুরু হয়েছে।অচিরেই উদাসীন জনসাধারণকেই এই অবস্থার মাসুল দিতে হবে চরমভাবে। ইয়াজিদের আমলে শাসনযন্ত্র জুলুমের চুড়ান্ত সীমায় পৌছে যায়।

 

হুর ইবনে ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর সামনে দাড়িয়ে ইমাম খুৎবা দেন, “হে লোকসকল! রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যদি কেউ কোন অত্যাচারী ও স্বৈরাচারি সরকারকে দেখে যে হালালকে হারাম করে, হারামকে হালাল করে, বাইতুলমালকে নিজের ব্যাক্তিগত খাতে খরচ করে, আল্লাহর বিধি বিধানকে পদদলিত করে, মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষা না করে, এরপর যদি সে নিশ্চুপ থাকে তাহলে আল্লাহ তাকে ঐ জালেমদের সাথে একই শাস্তি প্রদান করবেন।”

তিনি সেই খুৎবাতেই বলেন, “এ জাতির ক্ষমতাধরেরা শয়তানের আনুগত্যকে অপরিহার্য জ্ঞান করেছে, করুনাময়ের(আল্লাহর) আনুগত্যকে ত্যাগ করেছে।প্রকাশ্যে তার বিধানকে লংঘন করেছে ও তার নির্ধারিত আইন ও বিধিকে অকার্যকর করেছে। বাইতুল মাল ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে আত্মসাৎ করেছে,আল্লাহর অবৈধ বিষয়কে বৈধ ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় আমি এরুপ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অধিকারপ্রাপ্ত।”

অন্যান্য উমাইয়া শাসকের সাথে ইয়াজিদের পার্থক্য ছিলো এখানে যে,সে তার সকল কুকর্ম প্রকাশ্যে দম্ভের সাথেই করতো। রাসুলে পাকের মিম্বরে বসে সে  ব্যাভিচার,পাপাচার, জুয়া, মদ, নাচ, গান, কুকুর এবং বানর নিয়ে খেলা করতো। উমাইয়া আমলে শ্রেণীবৈষম্য প্রকট রুপ লাভ করে। ধণী, দাসমালিকেরা আরো ধনী হতে লাগলো, স্বর্ণের চাঁই বানাতে লাগলো, পরিবারতন্ত্র পাকাপোক্ত রুপ লাভ করলো আর সিরিয়ায় উমাইয়া খলিফাদের সবুজ প্রাসাদের  মদের উল্লাসের নিচে চাপা পড়ে যেত দাস, দরিদ্র-শ্রমিক আর কারাগারে বন্দি ভিন্ন মতাবলম্বিদের হাহাকার।(বনি উমাইয়া এবং ইয়াজিদের দুশাসন সম্পর্কে উপরিউক্ত তথ্য এবং আরো বিস্তারিত জানতে মিশরের বিখ্যাত বিপ্লবি আলেম,আহলে সুন্নাহর বিশিষ্ট মুফাসসির সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের “আল আদালাতুল ইজতেমাইয়া ফিল ইসলাম” বা বাংলায় অনুদিত “ইসলামে সামাজিক সুবিচার”(অনুবাদক-মাওলানা কারামত আলী নিযামী,এএইচপি প্রকাশনী) বইটি বিশেষভাবে দ্রস্টব্য। বিশেষ করে,বাংলা অনুবাদের ৩৮৩-৩৮৮ পৃষ্ঠা দ্রস্টব্য  )

ইয়াজিদ মিম্বরে বসে ঘোষনা দিল, “বনি হাশেম(রাসুল(সা)এর গোত্র) ক্ষমতা নিয়ে খেলা করছে।আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সংবাদ আসেনি এবং কোণ ঐশী বানীও নাজিল হয়নি।”( তারিখে তাবারী,আরবি খন্ড ১৩,পৃষ্ঠা-২১৭৪।তাজকিরাতুল খাওয়াস-সিবতে ইবনে আল জাওযি ,পৃষ্ঠা-২৬১)

এইক্ষনে আখেরি নবীর একটি হাদিসে পাক মনে পড়ে যায়, “কাফেরের হাতেও দেশ টিকে থাকতে পারে কিন্তু যে রাজ্যে জুলুম-অত্যাচার চলে তা কখনো টিকে থকতে পারেনা।”

তাই রাসুলে পাকের প্রানপ্রিয় দৌহিত্র হুসাইন সংগ্রামের পথ বেছে নেন। মুসলিম বিন আকিল কে ইমাম তার পক্ষে কুফাবাসীর কাছ থেকে সমর্থন আদায় করতে পাঠান। অচিরেই কুফার ইয়াজিদের নিযুক্ত গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের চক্রান্তে মুসলিম শহীদ হন।সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ইমাম হোসেইন একটি খুৎবা দেন, যার থেকে ইমামের সংগ্রামের উদ্দেশ্য সুস্পস্টভাবে ফুটে ওঠে।

“তোমরা কি দেখতে পাচ্ছোনা যে সত্য অনুসারে আমল হচ্ছেনা, তোমরা কি দেখতে পাচ্ছোনা যে আল্লাহর বিধানসমুহকে পদোদলিত করা হচ্ছে? দেখতে পাচ্ছোনা যে চারদিকে ফেতনা-ফাসাদে ছেয়ে গেছে কিন্তু কেউ এর প্রতিবাদ করছেনা?

এ অবস্থায় একজন মুমিনের উচিত নিজের জীবন উৎসর্গ করে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা । যদি জীবন উৎসর্গ করতে হয় তবে এটিই উৎকৃষ্ট সময়।” হযরত আলি(রা) এর একটি বানীতে আছে, “একটা দেশের জনসাধারন যেমন,তার নেতাও তেমন।”

সমাজে সংস্কার আনতে হলে তাই সেটা শুরু করতে হবে জনসাধারনের মধ্য থেকেই। ইমাম হোসেইন ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হতেন না, যদি সেও তার পুর্বসুরীদের মতই শুধু নিজের উপরই জুলুমে লিপ্ত থাকতো। বরং ইয়াজিদের আমলে মদ ব্যাভিচার সহ সকল অবৈধ-অশ্লীল কাজ জনসাধারনের মধ্যে সহজাত এবং বৈধ ‘এ আর এমন কি’ রুপ লাভ করে। আর,তাই ইমাম “সৎ কাজের নির্দেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ” এর সংগ্রাম শুরু করেন।

 

ইমাম বলেন, “আমি মৃত্যুর মধ্যে কল্যান ছাড়া আর কিছুই দেখিনা আর অত্যাচারীদের মাঝে বেঁচে থাকার মাঝে অপমান ছাড়া আর কিছুই দেখিনা।” ইমাম হোসেইন বলেন, “তোমরা দুনিয়ার কাছে নিজেকে বেঁচে দিও না। স্বাধীন ও মুক্ত মানুষ হও। দাসত্বের শৃংখলে নিজেকে বেঁধে ফেলো না।”

ইমাম হোসেইন জনগণকে বার বার করে একটা কথা বলেন, “আমি কোন যশ বা ক্ষমতার লোভে কিংবা কোন ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টির জন্যে বিদ্রোহ করছিনা। আমি শুধুমাত্র আমার নানার উম্মতের মধ্যে সংস্কার করতে চাই। আমি চাই সৎ কাজের নির্দেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে।আর আমার নানা এবং পিতার পথ ধরে চলতে।”

ইরানের বিখ্যাত বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী মোরতাজা মুতাহহারীর একটা উক্তি এই স্থানে বলাই উপযুক্ত।তিনি বলেন, “যদি জনগনদের অজ্ঞতা আর প্রতারনার বলে ধর্ম রাজনীতির হাতিয়ারে পরিনত হয় তাহলে আর দুর্দশার শেষ নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সেদিনের হাত থেকে বাঁচান যেদিন ধর্ম রাজনীতির হাতিয়ারে পরিনত হবে (নাফাসুল মাহমুম।বাংলা-শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস)”

ইমাম হোসেইনের আন্দোলন শুধুমাত্র যে ইয়াজিদের মসনদে কাপন ধরিয়ে দিয়েছিলো তাই নয় । একই সাথে তার শাহাদাতের সাথে সাথে তার বিরুদ্ধবাদী, সরকারের হালুয়ারুটিখোর দাড়ী-টুপিওয়ালা মোল্লাদেরও মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। জনগণের চোখের সামনে থেকে পর্দা দুরিভুত হতে শুধু করে। আর,ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে রাজনীতি করার বৃক্ষ সমুলে উৎপাটিত হয়।

ইমাম হোসেইনের আন্দোলন হয়ত ১০ই মুহররমে তার শেষ পরিনতি দেখে যেতে পারেনি। কিন্তু ইমাম যে আলোকবর্তিকা জ্বেলে গিয়েছিলেন সেই আলোর উৎস থেকেই আলো জ্বালিয়ে  যুগে যুগে জুলুম আর ভন্ডামির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন মজলুম সংগ্রামিরা, ইমাম যে বৃক্ষের বীজ রোপন করেছিলেন, এবং ইমামের শাহাদাতের পর তার বোন বিবি জায়নাব এবং তাদের বংশধরেরা সেই বৃক্ষের হেফাযত করে চলেছেন সেই বৃক্ষই দিন দিন অত্যাচারিতদেরকে ছায়া আর ফলফলাদি দিয়ে সামনে চলার অনুপ্রেরনা যোগাচ্ছ।

মনে পড়ে যায় ইয়াজিদের দরবারে কারবালার নেত্রী হযরত জায়নাব এর উক্তি, “আমার ভাইকে তোমরা মারতে পারবে না। আমার ভাইয়ের জীবন অন্য ধরনের । সে মরেনি,বরং আরো জীবন্ত হয়েছে। সে জীবনের নতুন মাত্রা পেয়েছে।”

রাসুলে পাক যথার্থই বলেছিলেন, “হোসেইন আমার থেকে।এবং আমি হোসাইন থেকে। (সহিহ তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)” অর্থাৎ হোসাইন আমার নসব থেকে এসেছে। এবং সে আমার দ্বীনকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত হেফাযত করে যাবে।

ইমাম হোসেইনের বিপ্লবের প্রতি অবমুল্যায়ন করা হবে যদি আমরা নবী রাসুলগণের নামে এইদিনের কথিত এবং অনির্ভরযোগ্য কিছু কাহিনী সংযুক্ত করে তার নিচে ইমাম হোসেইনের সংগ্রামকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করি ।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট