বৃহস্পতিবার ২৩ নভেম্বর, ২০১৭, রাত ১০:৪৫

রোহিঙ্গা শিবিরে ৪৬ দেশের কূটনীতিক: উদ্বেগ জানিয়ে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে তাগিদ

Published : 2017-09-13 23:48:00,
কক্সবাজার প্রতিনিধি: মিয়ানমারের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়ন থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা লাখো রোহিঙ্গার অবস্থা দেখতে গতকাল কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন বাংলাদেশস্থ ৪৬টি দেশের কূটনীতিক ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। পরিদর্শন শেষে তারা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। সাংবাদিকদের সামনে এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে তারা বলেন, একসঙ্গে এত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সত্যিই বাংলাদেশ প্রশংসার দাবি রাখে। আমরা আন্তরিকভাবে এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরব। মিয়ানমার সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাব, এই হামলা বন্ধ করে তারা যেন স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনে ও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়। রোহিঙ্গাদের এই পরিস্থিতিতে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
ব্রিফিংয়ে ব্রিটেন, চীন ও ভারতের কূটনীতিকরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুতুপালং নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছান বিদেশি কূটনীতিকরা। এরপর ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লক ঘুরে দেখেন এবং রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের বর্ণনা শোনেন।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে ৪৬ দেশের রাষ্ট্রদূত, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দল কক্সবাজার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেন। সেখান থেকে সড়ক পথে তারা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসেন। বিদেশি কূটনীতিকরা প্রথমে কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শন করে সেখানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। এই সময়ে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ, শিশুরা কান্নায় ভেঙে পড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কারণ জানান।
কূটনীতিকরা বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অনেকটা স্থান ঘুরে দেখেন। এই সময়ে রোহিঙ্গারা বলে, রাখাইন রাজ্যে আমাদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। তারা আরও বলে, বিদেশের মাটিতে এভাবে চরম কষ্টের মধ্যে আমরা থাকতে চাই না। আমরা নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই। মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিদেশি দেশগুলোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে রোহিঙ্গারা।
বিদেশি কূটনীতিকরা বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট সত্যিই ভয়াবহ। তারা নিজ নিজ দেশের কাছে বিষয়টি তুলে ধরবেন।
নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিওনি কুয়িল্যানারি রোহিঙ্গা সমস্যাকে ‘মহাদুর্যোগ’ বলে অবহিত করে বলেন, তার সরকার ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সাহায্য সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন সে দেশের রাষ্ট্রদূত। থাইল্যান্ড দূতাবাসের ডেপুটি চার্জ দ্য মিশন ক্যারাইচুকি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের শুধু আশ্রয় দেয়নি, তাদের জন্য যা করছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চাই।
অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জুলিয়া নিবল্যাট বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় মানবিক সহায়তা হিসেবে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও আইওএমের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার জন্য ইতোমধ্যে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় আমরা বাংলাদেশের পাশে রয়েছি।
মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জুয়েল রিফম্যান বলেছেন, এখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। রোহিঙ্গারা মানবেতর অবস্থায় রয়েছে। আমি আমার সরকারকে বিষয়টি জানাব।
এ সময় বাংলাদেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মোহাম্মদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, এতদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি জেনেছেন কূটনীতিকরা। কিন্তু আজ (বুধবার) পরিদর্শনে এসে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছেন তারা। পলিথিনের ঝুপড়িতে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট কাদাময় পরিবেশে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপন সবাইকে ব্যথিত করেছে। তাই পরিদর্শনরত বিদেশি কূটনীতিকরা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যেতে নিজ নিজ দেশের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের দুর্বিষহ জীবনাচার সম্পর্কে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন।
বিদেশি কূটনীতিক প্রতিনিধি দলে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, নরওয়ে, ইইউ, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, স্পেন, নেপাল, কাতার, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, সুইজারল্যান্ড, জাপান, সৌদি আরব, প্যালেস্টাইন, মিসর, ইতালি, ওমান, কানাডা, আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, ইরান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, চায়না, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক রেডক্রস প্রতিনিধি। প্রতিনিধি দলটি দুপুরে উখিয়ার বালুখালী ও ঘুমধুম ক্যাম্প ঘুরে টেকনাফ সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে। বিকেলে কক্সবাজার হয়ে তারা ঢাকায় ফিরে যান।
গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হামলা শুরু হলে দলে দলে মানুষ বাংলাদেশে আসতে  শুরু করে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত ৩ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

আরও খবর