মঙ্গলবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, সকাল ০৭:৫৭

আট বছরে জলজট নিরসনে ব্যয় ২০০০ কোটি টাকা: জলজট নিরসনের উদ্যোগ ডুবেছে জলেই

Published : 2017-09-13 22:44:00, Count : 123
রেজা করিম: রাজধানী ঢাকার সড়ক-অলিগলি-ফুটপাত তালিয়ে যেতে এখন আর টানা বর্ষণের দরকার হয় না। ১৫-২০ মিনিটের বৃষ্টিতেও যাচ্ছেতাই অবস্থায় পতিত হয় ঢাকার পথঘাট। সৃষ্টি হয় জলজট। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে নগরবাসী। এ চিত্র এখন প্রায় নিত্যকার। শুধু বর্ষা নয়, শরত্সহ অন্যান্য ঋতুতেও ‘নগর বন্যায়’ যখন-তখন তলিয়ে যায় এ শহর। চেনা এ দুর্ভোগ এড়াতে বিভিন্ন সংস্থা বছরের পর বছর ধরে নানা উদ্যোগ নিয়েছে, খরচ হয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। জলজট নিরসনে উন্নয়ন-সংস্কারের টাকা অবশেষে জলেই নিমজ্জিত হয়েছে।
সূত্র মতে, রাজধানীর জলজট নিরসনে বিগত আট বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে বিভিন্ন সেবা সংস্থা। বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা কীভাবে নিরসন করা যায় সে ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে নিয়ে দফায় দফায় সভা করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি এবং হচ্ছেও না। ফলে পরিণতি যা হওয়ার তাই হচ্ছে। শরতের বৃষ্টিতেও রাজধানীতে জলজটের দুর্ভোগে নাকাল হতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
দু’দিন টানা বর্ষণ ও দুর্ভোগের পর মাঝে মঙ্গলবার রোদে ঝলমলিয়ে উঠেছিল রাজধানী। ধারণা করা হচ্ছিল, বৃষ্টির দুর্ভোগ শেষ হল বুঝি। কিন্তু সেটা আর হল না। মাত্র এক দিনের বিরতি দিয়ে সূর্য মামাকে হটিয়ে গতকাল সকালে ঢাকার আকাশটা দখলে নেয় কালোমেঘের দল। তাই সকাল থেকেই আকাশের মন ছিল খারাপ। অবশেষে দুপুরের পর শুরু হয় অবিরাম বর্ষণ। অল্প সময়ের বৃষ্টি হলেও অতিশয় ভারি বর্ষণ মুহূর্তে ভাসিয়ে দিয়ে যায় ঢাকা, ডুবে যায় পথঘাট। এর ফলে ফের চিরচেনা সেই দুর্ভোগে পতিত হয় নগরবাসী। বিশেষ করে শেষ বিকেলে অফিস ফেরত কর্মজীবী মানুষরা বিপাকে পড়েছেন জলজট ও যানজটের কারণে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ঢাকা ওয়াসা পানি নিষ্কাশন কাজে ব্যয় করেছে ৬১৮ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে ৩৭০ কিলোমিটার গভীর ড্রেন লাইন, ৮০ কিলোমিটার খাল ও ১৫ কিলোমিটার বক্স কালভার্টের উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ করেছে সংস্থাটি। আর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (গভীর ও অগভীর) ড্রেন লাইন সংস্কার ও উন্নয়নে ১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা খরচ করেছে। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিগত আট বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশন লাইন মেরামত ও উন্নয়নে ব্যয় করেছে ১০৮ কোটি টাকা।
এসবের মধ্যে বিগত অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মিরপুর দক্ষিণ পাইকপাড়াসহ আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কানের গভীর-অগভীর ড্রেন পরিষ্কারে ৬৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। এলাকাবাসী এবারের বর্ষায় কিছুটা সুফল পাওয়ার আশা করলেও হয়েছে উল্টো ফল। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন-গতবারের বর্ষায় এ এলাকায় কোনো জলাবদ্ধতা হতো না, এবার এ এলাকার ড্রেনেজ লাইনের উন্নয়ন কাজ হয়েছে। আর এবারের বর্ষায়ই পুরো এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। পানি নিষ্কাশন লাইনের উন্নয়ন ও সংস্কার করলেই যদি সমস্যা বেড়ে যায়; তাহলে আমরা এ ধরনের উন্নয়ন চাই না। একই অবস্থা রাজধানীর অনেক এলাকায়।
মগবাজারের বিভিন্ন সড়কে সামান্য বৃষ্টিতে জল জমে যাওয়ার ঘটনা নতুন না হলেও এখন এর প্রবণতা বেড়েছে আগের চেয়ে। অথচ এসব সড়কে পানি নিষ্কাশনে গেল বছর ও চলতি বছর বেশ জোরেশোরে কাজ চলেছে। কাজ চলাকালীন খোঁড়াখুঁড়িতে মাসের পর মাস ব্যবহার অনুপযোগী থেকেছে রাস্তাগুলো। এরপরও মানুষ ভোগান্তি সহ্য করেছে এই ভেবে যে, সামনে সুফল পাওয়া যাবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। উন্নয়ন-সংস্কারের পরে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। যে সড়কে আগে একটু-আধটু পানি জমত, সেখানে এখন হাঁটুসমান পানিতে ডুবে থাকে।  
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের পথগুলো দখল, ভরাটের কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিচু স্থান ও জলাশয়ে গড়ে উঠছে আবাসন। আর তাই, শত শত কোটি টাকা খরচ করেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। আসলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের সমাধান এসব প্রতিষ্ঠানের কেউ জানে না।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত ১২৭.৬৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম সরাসরি পরিচালনা করছে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ লাইন রয়েছে দুই হাজার কিলোমিটার। আর ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ লাইন ৩৭০ কিলোমিটার। ঢাকা জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন ২৬টি খাল রয়েছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। দখল-ভরাটে এসব খালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এর মধ্যে মাণ্ডা, হাজারীবাগ, কসাইবাড়ী, সাংবাদিক কলোনি ও বাইশটেকি খাল দখলের মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে। এগুলো দখলমুক্ত করতে পারছে না জেলা প্রশাসন, ঢাকা ওয়াসা এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা শহরের জলাধার ও নিচু এলাকা ভরাট করে ফেলা হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঢাকা শহর একটি বালতির আকার ধারণ করেছে। এখন পানি সেচে বের করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা ওয়াসা নিজের সামর্থ্যের আলোকে চেষ্টা করছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহুল ইসলাম বলেন, নালাগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিগত দুই বছরে আমরা ড্রেনেজ লাইন তৈরি ও সংস্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসনে বেশ কিছু সাফল্য পেয়েছি। এ ধারা অব্যাহত রেখে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করলে আগামী বর্ষায় জলাবদ্ধতার পরিমাণ আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে জলাবদ্ধতা একেবারেই নিরসন করা খুবই কঠিন কাজ। এটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। নগরবাসীকেও এক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যাপারে সমন্বয় সাধন করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির প্রতিবেদনের পর নানা বিদ্যমান জটিলতা দূর করে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তখন হয়তো সুফল পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা তার।