বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, সকাল ০৯:৫৬

নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা

Published : 2017-09-12 22:21:00
সাঈদ নিশান: নগরবাসী গ্রামবাসীর চেয়ে সব দিক থেকে এগিয়ে থাকলে.ও একটি দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। আর তা হল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। দেশে দ্রুত নগরায়ণ হলেও নগরবাসী এদিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবলের অভাবে নগরবাসী এ ক্ষেত্রে একপ্রকার বঞ্চিত হচ্ছে। এজন্য তারা দিন দিন ফার্মেসির (ওষুধের দোকান) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এছাড়া শহরে গড়ে উঠছে বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। সেসব প্রতিষ্ঠান মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মানুষকে সেবা দিচ্ছে। এতে শহরের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে সবসময় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। গ্রামীণ অবকাঠামো অনুযায়ী একজন স্বাস্থ্যকর্মী মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগব্যাধি ও রোগীর খোঁজখবর নেন। কিন্তু শহরে এ রকম কোনো ব্যবস্থা নেই। শহরাঞ্চলে এটি পরিচালিত হয় কিছু এনজিওর মাধ্যমে। তাদের কার্যক্রম আবার মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে শহরের বেশির ভাগ মানুষ এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রধান ভরসা ফার্মেসি। বাস্তবিক অর্থেও ঠিক তাই। সাধারণত বেশির ভাগ নগরবাসী, বিশেষ করে স্বল্প আয়ের বা স্বাস্থ্যসচেতন নয়, এমন লোকজনের মধ্যে অতিমাত্রায় ফার্মেসি-নির্ভর হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেকোনো রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অথবা সর্দি, জ্বর, কাশি, মাথাব্যথার মতো ছোটখাটো অসুখ-বিসুখে এই জাতীয় লোকজন চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয় না। এ ক্ষেত্রে তারা ওষুধের দোকানের সেলসম্যানের পরামর্শকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও প্রথম পর্যায়ে নিকটস্থ কোনো ফার্মেসির দ্বারস্থ হতে দেখা যায়। এছাড়া শিশুদের শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রেও চিকিত্সকের বিকল্প হিসেবে ওই ওষুধের দোকানের সেলসম্যানের কাছেই সমাধানের পথ খোঁজে। অথচ শিশুদের যেকোনো অসুখ-বিসুখে চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করাটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা কম থাকার সুযোগে শহরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এর ৮০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে। স্বাধীনতার পর নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন জরিপ চালানো হয়েছে। প্রতিটি জরিপেই নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্যের দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। আমাদের দেশে গ্রামের তুলনায় নগরে, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি।
টারশিয়ারি (তৃতীয় গঠনসংক্রান্ত) পর্যায়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নামমাত্র স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকলেও প্রকৃত অর্থে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের নীতিমালা অনুযায়ী বেসরকারি পর্যায়ে উন্নত চিকিত্সাসেবা দেওয়ার আগে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ নীতিমালা দেশে কতটা কার্যকর এ প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকার এখনও এর নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, এ পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবাও জোটে না। ফার্মেসি-নির্ভর হয়ে যে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায় না, তা বলার অবকাশ রাখে না। অধিকাংশ ফার্মেসি অদক্ষ লোক দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় সঠিক সেবা মিলছে না। কারণ প্রকৃত অর্থে ওষুধের দোকানের সেলসম্যানের দায়িত্ব আগত রোগীর রোগ নির্ণয় নয়, ওষুধ বিক্রি করাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। যেহেতু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে নগরবাসীর চাহিদামতো সেবা দিতে পারছে না সেহেতু এক্ষেত্রে সরকারের বিকল্প চিন্তা করা উচিত। যাতে করে শহরাঞ্চলের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়।
asayeedbd90@gmail.com
লেখক : সাংবাদিক