মঙ্গলবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, সকাল ০৭:৫৭

শুভ জন্মদিন: মুক্তিযোদ্ধা, বিদ্যানুরাগী মুহম্মদ নুরুল ইসলাম

Published : 2017-09-12 22:20:00, Count : 1700
সারওয়ার আলম: চট্টগ্রামে নুরুল ইসলাম নামের বেশ কয়েকজন গুণী ও খ্যাতিমান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে বিদ্যানুরাগী, মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশে জাপানের অনারারি কনসাল জেনারেল সর্বোপরি উন্নততর বাংলাদেশ গঠনের মানসে তরুণ সমাজকে উত্সাহদানকারী ও কর্মনিষ্ঠ মুহম্মদ নুরুল ইসলাম অন্যতম। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ওসমান গনি ও আমেনা খাতুন দম্পতির এই সুযোগ্য সন্তান ১৯৪৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। আজ আমাদের শ্রদ্ধেয় ইসলাম স্যার আর চট্টগ্রামের সকলের ‘বড়দা’র শুভ জন্মদিনে তার হাজারো শুভাকাঙ্ক্ষীর একজন হয়ে এই সত্যিকারের গুণী মানুষটি সম্পর্কে অনুপ্রেরণাদায়ী কিছু কথা সকলের সঙ্গে ভাগাভাগি করাই আমার এ লেখার উদ্দেশ্য।
আমরা, নুরুল ইসলামের গুণমুগ্ধরা আক্ষরিক অর্থেই তার নানা গুণে মুগ্ধ। তিনি তার দাদার প্রতিষ্ঠিত তালেবিয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়েই জ্ঞানার্জনের পথ থেকে সরে যাননি। যেমন তিনি আইন পড়েছেন চট্টগ্রাম ল কলেজে, পারিবারিক ব্যবসায়ের কারণে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও জাপানি ভাষার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বিখ্যাত টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে। অঙঞঝ-এর কল্যাণে জাপানে করেছেন করপোরেট একজিকিউটিভ ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং প্রোগ্রাম। এছাড়াও ওয়ার্ল্ড ফিউচারিস্ট ট্রেনিং প্রোগ্রাম করেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
ছাত্রাবস্থা থেকেই পারিবারিক ব্যবসায়ের সূত্রে নুরুল ইসলামের জাপান যোগসূত্রের সূচনা। পরবর্তীকালে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনযাত্রা, উত্পাদিত পণ্যের গুণগত মান, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য তাকে দেশটির ব্যাপারে আরও গভীরভাবে জানতে আগ্রহী করে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশে জাপানের অনারারি কনসাল এবং ২০০০ সাল থেকে কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০১২ সালে জাপান সরকার কর্তৃক ভূষিত হয়েছেন অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান, গোল্ড রেজ উইথ নেক রিবন সম্মানে। আমরা তাকে জাপান ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের বা সেতুবন্ধনের কাণ্ডারিসম গণ্য করি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে গর্বের বিষয় ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ। অনেকেই জানেন না যে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় নুরুল ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সাহসী সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অনেক পূর্বে কলেজের ছাত্রাবস্থায় বন্ধুদের নিয়ে ক্যাডেট ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য, তত্কালীন আন্তর্জাতিক বিষয়সহ নানা বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা ও বিতর্কের আয়োজন করতেন; যা তাদের চিন্তা, চেতনা ও যুক্তিবোধ শানিত করতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ চলাকালে তাদের আগ্রাবাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হতো। আর্থিকভাবেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের, বিশেষ করে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক গেরিলা গ্রুপসমূহের অপারেশন পরিচালনার জন্য নানাভাবে সহায়তা করতেন, যা সে সময়ের হিসাবে সোয়া লাখ টাকার বেশি ছিল। এ বিপুল অর্থ খরচ করায় তার বাবা একবার বলেছিলেন যে আমাদের পারিবারিক ব্যবসা ডোবাতে অন্য কিছুর দরকার নেই, আমার ছেলেই যথেষ্ট।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নুরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘চট্টগ্রাম বাহিনী কল্যাণ সমিতি’, যাতে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস বিক্রি করে অর্জিত লাভ থেকে চট্টগ্রামের শহীদ গেরিলা যোদ্ধাদের পরিবারকে মাসিক ১০০ টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে শত্রু পরিত্যক্ত ও বন্ধ শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠিত হলে চট্টগ্রামের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব বর্তেছিল তার ওপর।
সত্যিকারের বিদ্যানুরাগী হিসেবে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্বায়নের এই যুগে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করতে পারেন বলেই তিনি তরুণদের বিশেষত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বাংলা এবং ইংরেজি ভালোভাবে শেখার পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষা শিখতে উত্সাহ দিয়ে থাকেন। তিনি নিজে ইংরেজি ছাড়াও জার্মান এবং জাপানি ভাষায় পারদর্শী। এ দেশে জাপানের অনারারি কনসাল জেনারেল হিসেবে জাপানের আর্থিক সহযোগিতায় এ পর্যন্ত ৮১টি বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামে ১৩-১৪টি জাপানি ভাষার স্কুল তার আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। তরুণ বয়সেই আগ্রাবাদ এলাকায় স্থাপন করেছেন বেশ কয়েকটি পাঠাগার। এছাড়াও আগ্রাবাদে তিনি পরিচালনা করছেন ‘নিপ্পন একাডেমী’। যেখানে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের যেমন জাপানি ভাষা শেখান, তেমনি জাপানি ছেলেমেয়েদের জন্য বাংলা ভাষা ও এ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয় পরম নিষ্ঠার সঙ্গে।
এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর আধুনিকায়ন, মহেশখালীতে মত্স্যবন্দর এবং নাবিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে জাপানের আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তিতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ বাড়াতে এবং তার মাধ্যমে এ দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে তিনি সবসময় সচেষ্ট। একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী হিসেবে বাংলাদেশের শিশুদের জন্য জাপানি রূপকথা, জাপানি ভাষাশিক্ষার বইসহ তার অন্যতম প্রিয় বন্ধু ও এ দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘লেলিন ঘুমাবে এবার’ বইয়ের প্রকাশনার দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। তার পড়াশোনার ক্ষেত্র ও বিস্তৃতি যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, গণিত, শিক্ষানীতি, সমুদ্রবিজ্ঞান, ভূমি ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, টেকসই উন্নয়ন, ইতিহাস, ধর্ম, সাহিত্যসহ নানা বিষয়ে অধ্যয়নের একাগ্রতা আমাদের শুধু বিস্মিতই করে না, বরং নানা বিষয়ে জানতে ও পড়তে অনুপ্রেরণাও জোগায়। অনেক অরাজনৈতিক ও পারিবারিক আড্ডা বা আলোচনায় আমাদের রাজনৈতিক অরাজকতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়ম, সামাজিক অবক্ষয়, তরুণদের বই পড়ায় অনাগ্রহ (সবার জন্য প্রযোজ্য নয়) প্রভৃতি বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে তাকে ভীষণভাবে পীড়িত ও ব্যথিত হতে দেখি। তারপরও কাজপাগল এই মানুষটাকে কখনও হাল ছাড়তে দেখিনি। সেইসঙ্গে তরুণদেরও ইতিবাচক চিন্তা ও কাজে উত্সাহ ও সঠিক পরামর্শ দেওয়ার কাজটিও করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।
আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, মুহম্মদ নুরুল ইসলাম স্যারের শুভ জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। স্যার আপনি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর আমাদের আদর্শ হয়ে, ভালো কাজের অনুপ্রেরণা আর জ্ঞানের বাতিঘর হয়ে বেঁচে থাকুন আরও অনেকদিন।

লেখক : ঢাকাস্থ বিদেশী দূতাবাসে কর্মরত