মঙ্গলবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, সকাল ০৮:০৫

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রয়োজন আলাদা রাষ্ট্র গঠন

Published : 2017-09-10 22:02:00, Count : 1486
কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলীর জিয়ানগরে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে আসা মিয়ানমারের নাগরিক দিল মোহাম্মদের পাহাড় কেটে তৈরী বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে ২০ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু। (ফাইল ছবি) শারীফ অনির্বাণ: রোহিঙ্গা। মায়ানমারের আরাকান (বর্তমানের রাখাইন) এলাকায় বসতি গড়ে তোলা একটি সংখ্যালঘু জাতি। জাতিসংঘের বিবেচনায় পৃথিবীর সর্বাধিক নির্যাতিত জাতির তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। সাম্প্রতিককালে মায়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সম্প্রদায় কর্তৃক রোহিঙ্গাদের উপর দফায় দফায় যে অমানবিক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে তা বিশ্বব্যাপী একটি ঘৃণিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

১.
রোহিঙ্গা ধর্মীয় বিশ্বাসে মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেই কোনো নাগরিকত্ব। ফলে তারা রাষ্ট্রহীন, অনাকাঙ্খিত। যদিও অষ্টম শতাব্দী থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে তাদের পূর্বপুরুষদের বসবাসের ইতিহাসের খোঁজ পাওয়া যায়। তারপরও তারা নাগরিকত্বহীন। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে ক’টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তথা বর্তমান রাখাইন প্রদেশ তার অন্যতম। বর্তমান রোহিঙ্গারা সেই আরকানি মুসলমানদের বংশধর। এক সময় আরাকান স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র ছিল। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন ২শ’ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা সান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোগল শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে।

মুসলামনদের উপর নির্যাতনের তখন থেকেই শুরু। এই সময় থেকেই মূলত বিরতি দিয়ে দিয়ে চলছে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন। ১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেয়। তিনিও ছিলেন ঘোর সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলমানদের হত্যা করেন। ১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজ দখলে গেলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মার স্বায়ত্তশাসন লাভের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং অন্তত ৩০ লাখ মুসলমান মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু মুসলমানদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীন দেশের সরকার আজ পর্যন্ত তাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার দেয়নি। অত্যাচার নির্যাতন ও বিতাড়নের মুখে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহুদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। তারা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক। ১৯৮২ সালে সে দেশের সরকার যে নাগরিকত্ব আইন করেছে, তাতে তিন ধরনের নাগরিকের কথা বলা হয়েছে। এর কোনোটির মধ্যেই রোহিঙ্গারা নেই। সরকারিভাবে তাদের সে দেশে বসবাসকারী বা ‘জবংরফবহঃং’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সাংবিধানিক ও আর্থসামাজিক অধিকার নেই। একার্থে বন্দী তারা । কারণ মিয়ানমারের অন্য স্থানে তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যে আরাকান মুসলিমপ্রধান ছিল, এখন সেখানে রাখাইন বসতি বাড়িয়ে তাদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়েছে।

২.
জাতিসংঘের বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের অর্থ হলো নৌকার মানুষ, যারা সমুদ্রজলে নৌকা ভাসিয়ে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে জীবিকা অর্জন করে। এই একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর আর কোথাও কি এমন কোন জনগোষ্ঠী আছে যারা অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে পারে না, আর হাসপাতালে গেলেও তাদের চিকিৎসা দেয়া হয় না। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না। এমনকি তরুণ-তরুণীদের বিয়ে ও সন্তান ধারণে বাধা দেয়া হয়। শত শত বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাস করলেও তাদের নাগরিকত্ব নেই। এত অত্যাচার-নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেও বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করেছেন। বিভিন্ন সময়ে অত্যাচারের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা মায়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৫ লাখ। জাতিসংঘ ও ওআইসি মায়ানমার সরকারকে এই সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানালেও প্রকৃতপক্ষে সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে এবং তাদের নেতৃত্বেই চলছে হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ। প্রাণ বাঁচাতে ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধরা ছোট ছোট নৌকায় করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোও অতিরিক্ত জনসংখ্যা সহ নানা জটিলতার কারণে তাদের সাদরে গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। মায়ানমার ইতিহাসকে অস্বীকার করে বলছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী। মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম এবং সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্ম ধরে চলে আসা দ্বন্দ্ব আর অবিশ্বাস সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ।

এদিকে বৌদ্ধ বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সরকারের সশস্ত্র সহায়তা এবং সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বারবার কঠোর অভিযান সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। বর্তমানে রাখাইন সমস্যা সমাধানে গঠিত এক কমিশনের প্রধান তিনি। অং সান সু চি’র সরকার আর এখনো নিরাপত্তাসহ প্রধান খাতগুলোতে ক্ষমতায় থাকা সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে বলেও জানান কফি আনানসহ আরও অনেক বিশেষজ্ঞ।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে সাধারণ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুদের গায়ে গুলির ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০১৪ ও ২০১৫ সালের স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, গ্রামের পর গ্রাম মাটিতে মিশে গেছে। বেশ কিছু এলাকায় সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন রোহিঙ্গা নারীরা। তবে এই অভিযোগের সবগুলোই অস্বীকার করেছে সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে সরকারের ওপর অভিযোগ আনছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী। যদিও সেখানকার বেশিরভাগই বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে।

৩.
তথ্যমতে, রাখাইন রাজ্যে আনুমানিক ১০ লাখ রোহিঙ্গার বাস। জাতিসংঘের ভাষায় এরা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। বিশ্ব সবচেয়ে নির্যাতিত গোষ্ঠী স্বীকার করছে, কিন্তু এ নির্যাতন বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মায়ানমার সরকার বংশ পরম্পরায় হাজার বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পর্যন্ত প্রদান করে না। এটা বার্মানীতি! মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত ব্যবহার করতে রাজি নয়।

এদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্কট সমাধানে দেশটির নেত্রী অং সান সুচির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সামান্থা পাওয়ার। এ সঙ্কট যেভাবে মোকাবিলা করছে সুচির সরকার তাতে দেশে দেশে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, মিসর, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ। ১৯৭০ সাল থেকে বহু রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং ২০১২ সালের দাঙ্গার পর আবার নতুন করে অনুপ্রবেশ বাড়ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, অর্ধশতাব্দীর সামরিক স্বৈরশাসনের পর যখন মিয়ানমারে গণতন্ত্রায়নের সুবাতাস বইছে, গণতন্ত্রের সংগ্রামে নির্বাচিত দেশটির জনপ্রিয় নেত্রী অং সান সু চির দল নির্বাচনে জয়ী হয়েছে, সে সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বদলে আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।

যদিও মানবতাবাদী গৌতম বুদ্ধের অনুসারী ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ কিংবা ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ বলে যতই ধর্মবোধে লালিত হোক, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘ক্লিন রোহিঙ্গা অপারেশন’-এর নামে রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সেনা, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বর্বরতা সহ্য করার মতো নয়। হত্যা, ধরপাকড়, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওসহ এমন কোনো ঘটনা নেই, যা ঘটছে না। মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ তারা দিনের পর দিন ঘটিয়ে চলেছে সেই ১৯৭৮ সাল থেকে। বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি না দিয়ে আন্তর্জাতিক সব আইন-কানুন লঙ্ঘন করে চলছে সে দেশের সেনাবাহিনী। ২০১৫ সালের নির্বাচনে নোবেল শান্তিজয়ী নেত্রী অং সান সু চি ও তার দল ক্ষমতায় আসার পরও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার ঘটনায় জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে সব সম্প্রদায়ের সহিংসতা পরিহারের কথা বলেছেন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, সাম্প্রতিক এই গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও যেমন নিশ্চুপ, তেমনি ওআইসি পর্যন্ত মুখ খুলছে না। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও কেউ কিছু বলছে না। বরং জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়ে এমন পরামর্শও দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। আর মায়ানমারকে সহিংসতা বন্ধের কোনো চাপ না দিয়ে বলছে, মায়ানমার সরকার যেন সেখানে মানুষদের নিয়মানুযায়ী রক্ষা করে। যদিও সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ওপরে মায়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল তিন সদস্যের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন গঠন করেছে। মানবাধিকার কাউন্সিলের ৩২তম সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মিয়ানমারে এবং বিশেষ করে রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমারের মিলিটারি ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের যে অভিযোগ উঠেছে, সে সম্পর্কে তথ্য এবং ঘটনাবলী জানার জন্য একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পাঠানো হবে। এ মিশনের সদস্যদের মায়ানমার মিলিটারি ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ, ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন নির্যাতন, আইন-বহির্ভূত হত্যা, অপহরণ, গুম এবং সম্পদের ক্ষতি সাধনের বিষয়ে তদন্ত করার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

৪.
মায়ানমারে রোহিঙ্গা সংকট নতুন নয়। মিয়ানমারের এ পরিকল্পনা সফল হতে দিলে বাংলাদেশের সমূহ ক্ষতির কারণ হবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি মানবিক এবং দেওয়াও উচিত, বাংলাদেশ আশ্রয় দিচ্ছেও। আর এ সুযোগটিই নিচ্ছে মায়ানমার সরকার। এইচআরডব্লিউ বলছে, বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণ করা ও তাদের সুরক্ষা দেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ভেতর মায়ানমার থেকে পালানো রোহিঙ্গাদের ঢল যে হারে অব্যাহত রয়েছে তাতে এদের আশ্রয় বা খাবার জোগাড়ে প্রশাসন রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে। এই রোহিঙ্গাদের বড় অংশই রাস্তার ধারে বা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। রোহিঙ্গাদের এই শরণার্থী সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গাদের আসার ধারা পর্যালোচনা করে জাতিসংঘ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং রেড ক্রসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আশংকা প্রকাশ করেছে যে, এই দফায় শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তবে চিন্তার বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থাগুলোর তথ্যমতে এখন পর্যন্ত আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি’কে বর্ণনা করা হচ্ছে উশৃংখল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসেবে। তাদের কাছে রয়েছে ছুরি, লাঠি ও কিছু বিস্ফোরক পদার্থ। অন্যদিকে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী ও বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধ। বলা হচ্ছে, মিয়ানমারের ভিতরে যেসব উগ্রপন্থি বা জঙ্গি সৃষ্টি হচ্ছে বলে আশঙ্কা রয়েছে তাকে আরো জটিল করে তুলতে পারে এ ঘটনা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, তারা আন্তর্জাতিক জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন পেয়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে ইয়েমেনের আল কায়েদার অনুসারীরা মিয়ানমারের এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবানরা মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে কাজ করছে এমন একটি মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ ফোরটিফাই রাইটসের পরিচালক ম্যাথিউ স্মিথ বলেছেন, এমন ঘটনার বিস্তার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, নিশ্চিত করে বলা যায়, আন্তর্জাতিক যেসব উগ্র সংগঠন আছে তারা রাখাইনের এই পরিস্থিতিতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবে। তখন সংকট আরও চরমে পৌঁছবে।

৫.
এ সংকট নিরসনে বিশ্বসংস্থা ও নেতাদের শুধুমাত্র বিবৃতি, সহযোগিতার আশ্বাস কিংবা সহিংসতা বন্ধের আহবান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবেনা বরং সারাবিশ্বকে একসঙ্গে আওয়াজ তুলতে হবে, প্রতিবাদ নয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মানুষ হত্যার নীতি, মানব নির্যাতন নীতির বিরুদ্ধে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা ‘সবার ওপর মানুষ সত্য তাহার ওপর নাই।’ তবে এ অবস্থা উত্তরণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পরামর্শ, মিয়ানমারের প্রভাবমুক্ত করে রাখাইনকে আবার স্বাধীন আরাকানে পরিণত করতে পারলেই শুধু এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। জাতিসংঘ, ওআইসি, মুসলিম বিশ্ব ও বিশ্বের সকল মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হলে এবং এ ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলেই নির্যাতনের অবসান সম্ভব। নারী-শিশুসহ মায়ানমারের সকল নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রাণে বাঁচাতে হলে এখনই জাগ্রত করতে হবে বিশ্ব বিবেক, রক্ষা করতে হবে বিশ্ব মানবতা।

লেখক : সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।