বুধবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর ১১:৫৯

লাশ দাফনের ৪দিন পর তদন্ত: চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর হত্যা

Published : 2017-08-29 19:53:00, Updated : 2017-08-29 22:10:42
অনলাইন ডেস্ক: টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় এক তরুণীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করার পর তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। জানা গেছে, চার দিন আগে গত শুক্রবার রাতে চলন্ত বাসে দলবেঁধে ধর্ষণের পর ওই কলেজছাত্রীকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এর আগে গত শনিবার পরিচয় না মেলায় ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ হিসেবেই ওই তরুণীর লাশ টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করে মধুপুর থানা পুলিশ। তবে গতকাল সোমবার ছবি দেখে লাশ শনাক্ত করেন নিহতের বড় ভাই মো. হাফিজুর রহমান। 

এরপর মেয়েটির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের মৃত জেলহক প্রামাণিকের মেয়ে। নাম মোছা. জাকিয়া সুলতানা রুপা (২৭)। পরিবারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন রাতেই মধুপর থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় পাঁচজন। অভিযুক্তরা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে- চলন্তবাসে গণধর্ষণের পর ঘাড় ভেঙে হত্যা করা হয় রুপাকে।
 
নিহতের বড় ভাই জানান, পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে মোছা. জাকিয়া সুলতানা (রুপা) ঢাকার আইডিয়াল ল' কলেজে এলএলবিতে শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত ছিল। পড়ালেখার পাশাপাশি শেরপুর জেলায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রমোশনাল ডিভিশনে চাকরি করছিল। 

এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে তিন বাস শ্রমিক মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা সকলেই চলন্ত বাসে ‘ল’ কলেজের ছাত্রী রুপা প্রামানিককে ধর্ষন ও হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মধুপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আসামীরা পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ওই দিন রুপা ছাড়াও মাত্র পাঁচ/ছয়জন যাত্রী বাসে ছিল। রুপা ছাড়া অন্য সব যাত্রীরা সিরাজগঞ্জ মোড় এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নেমে যায়। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার সময় রুপা একাই বাসে ছিলেন। বাসটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কাছাকাছি এলে বাসের হেলপার শামীম রুপাকে জোর করে বাসের পেছনের আসনে নিয়ে যায়। 

এ সময় রুপা তার কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা ও মুঠোফোন শামীমকে দিয়ে তাকে ধর্ষন না করতে অনুরোধ করে। কিন্তু শামীম জোরপূর্বক প্রথমে রুপাকে ধর্ষণ করে। পরে অপর হেলপার আকরাম ও জাহাঙ্গীর তাকে ধর্ষণ করে। বাসটি ঘাটাইল উপজেলা এলাকা অতিক্রম করার সময় তাদের ধর্ষন শেষ হয়। এসময় রুপা কান্নাকাটি ও চিত্কার করা শুরু করলে তারা তিনজন মুখ চেপে ধরে। এক পর্যায়ে ঘার মটকে রুপাকে হত্যা করা হয়। পরে মধুপুর উপজেলা সদর অতিক্রম করে বন এলাকা শুরু হলে পঁচিশ মাইল নামকস্থানে রাস্তার পাশে লাশ ফেলে রেখে চলে যায়। 

শুক্রবার রাতেই পুলিশ খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। শনিবার টাঙ্গাইল মর্গে ময়না তদন্ত শেষে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে অজ্ঞাত পরিচয় লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরদিন পুলিশ বাদি হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করে একটি হত্যা মামলা মধুপুর থানায় দায়ের করে।

রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত রুপার সাথে তার বড় ভাই হাফিজুর রহমান প্রামানিকের মুঠোফোনে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তার পর থেকেই রুপার ফোন বন্ধ পাওয়া যায় বলে জানান হাফিজুর রহমান। পরদিন শনিবার কোন খোঁজখবর না পেয়ে হাফিজুর ময়মনসিংহ যায় এবং ময়মনসিংহ কোতয়ালি থানায় এ ব্যাপারে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে মধুপুর বনাঞ্চলে একজন তরুণীর লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে হাফিজুর সোমবার রাতে মধুপুর থানায় যান। থানায় সংরক্ষিত লাশের ছবি দেখে রুপার লাশ বলে সনাক্ত করেন।

পরে পুলিশ সোমবার রাতেই বগুড়া থেকে ময়মনসিংহগামী ছোঁয়া পরিবহন বাসটি মধুপুর অতিক্রম করার সময় এর চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তারা রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে। পরে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়।

বিকেল চারটার দিকে গ্রেপ্তারকৃত বাসের হেলপার শামীম (২৬), আকরাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীরকে (১৯) টাঙ্গাইল বিচারিক হাকিম আদালতে নেয়া হয়। আকরাম ও জাহাঙ্গীরের বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। শামীমের বাড়ি মুক্তাগাছার নন্দিবাড়ি।
টাঙ্গাইলের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম গোলাম কিবরিয়া আসামী আকরামের, আমিনুল ইসলাম আসামী শামীমের এবং শামছুল হক আসামী জাহাঙ্গীরের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। পরে তাদের টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

গ্রেপ্তারকৃত বাসের চালক হাবিব (৪৫) এবং সুপরভাইজার সফর আলীকে (৫৫) আজ বুধবার আদালতে হাজির করা হবে। তাদের দু’জনের বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলা মির্জাপুর গ্রামে।

মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সফিকুল ইসলাম জানান, চালক ও সুপারভাইজার ধর্ষনে অংশ না নিলেও তাদের সামনেই ধর্ষন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এবং তারা লাশ ফেলতে সহায়তা করেছে। 

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মোঃ মাহবুব আলম জানান, মেয়েটির লাশ উদ্ধারের পর থেকেই পুলিশ মাঠে নামে। পরে পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত সকল আসামীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।