বুধবার ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮, রাত ০৯:১০

ত্যাগের মহিমায় সিক্ত হোক বাঙালির ঈদুল আযহা

Published : 2017-08-29 19:01:00
শারীফ অনির্বাণ: প্রতিটি জাতি বা গোষ্ঠীরই নিজস্ব কিছু রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব-সংস্কৃতি থাকে। এই উৎসব সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ভিত্তি বা প্রথাকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে এবং কাল পরিক্রমায় তা প্রচলিত রুপ নেয়। তেমনি মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদ। বছরের দুটি সময়ে সারা বিশ্বে অত্যন্ত আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয় এই দুটি ঈদ।

আমাদের দেশে এ দুটি ঈদ সাধারণত রোযার ঈদ এবং কুরবানির ঈদ নামে পরিচিত। মুসলমানরা এক মাস সিয়াম সাধনার পর পালন করে ঈদুল ফিতর বা রোযার ঈদ এবং তার দুই মাস ১০ দিন পরে অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ। বাংলাদেশে এটি কোরবানির ঈদ নামে পরিচিত।

মূলত ঈদ এর অর্থ উৎসব বা আনন্দ। আযহার অর্থ কোরবানি বা উৎসর্গ করা। পারিভাষিক অর্থে ‘কোরবানি’ ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল­াহর নৈকট্য হাসিল হয়। প্রচলিত অর্থে ঈদুল আযহার দিন আল­াহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরঈ তরীকায় যে পশু জবাই করা হয়, তাকে ‘কোরবানি’ বলা হয়। সকালে রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কোরবানি’ করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে। কোরবানি মুসলমানদের জন্য একটি ধর্মীয় ইবাদত। জিলহজ্জ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে এই ইবাদত পালন করতে হয়। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্যই কোরবানি আবশ্যকীয়।

আমাদের উপর যে কোরবানির নিয়ম নির্ধারিত তা মূলত ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক শিশু পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে আল­াহর রাহে কুরবানি দেওয়ার অনুসরণে ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ হিসাবে চালু হয়েছে। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল­াহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইব্রাহীম ও ইসমাঈল আল­াহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অতুলনীয় ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, বর্ষপরম্পরায় তারই স্মৃতিচারণ হচ্ছে ‘ঈদুল আযহা’ বা কুরবানির ঈদ। আল­াহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রকৃষ্ট নমুনা এই কোরবানিতে প্রতীয়মান। তবে ইতিহাস ঘেটে যতদূর জানা যায়, কোরবানি প্রথার গোড়াপত্তন হয়েছিল তারও আগে। আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের দেওয়া কোরবানি থেকেই ত্যাগের এই মাধ্যমের সূচনা। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপর এটা জারি ছিল।

ঈদুল আযহা উদযাপনরে ইতিহাস
বাঙালির এই ঈদ উৎসব উদযাপনের বিশদ ইতিহাস খুব একটা জানা যায় না। এমন কোনো রচনাগ্রন্থও পাওয়া যায় না, যাতে এর একটি পরিপূর্ণ ইতিহাস রক্ষিত আছে। তবে নানা ইতিহাসগ্রন্থ ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে বাংলাদেশের রোজা পালন ও ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহা পালনের তথ্য পাওয়া যায় যে, ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশে মুসলিম অধিকারে এলে এদেশে নামাজ, রোজা ও ঈদ অনুষ্ঠানের প্রচলন হয়েছে তার বেশ কিছু আগে থেকে। কারণ বঙ্গদেশ যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে মুসলিম অধিকারে আসার বহু আগ থেকেই মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলিম সুফি, দরবেশ, সাধকরা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারত হয়ে পূর্ব বাংলায় আস্তানা গড়েন।

অন্যদিকে আরবীয় ও অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে বণিকরা চট্টগ্রামের বন্দর হয়ে বাংলার সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি করেন এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য প্রচার করেন। সেই থেকে পূর্ব বাংলার ওপর একটি মুসলিম সংস্কৃতি তথা ধর্মীয় প্রভাব পড়ে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর বাঙালির ‘ঈদ’ উৎসবের সূচনাও ঠিক এভাবেই হয়েছে বলে ধারণা করা হয় এবং সময়ের পরিক্রমায় অনেক মুসলিম অনুষ্ঠানের মধ্য থেকে ‘ঈদ’ পরিণত হয় এক বৃহত্তর ধর্মীয় উৎসবে।

ঈদুল আযহা বা কোরবানি ঈদে বিভিন্ন দেশে মুসলমানরা সাধারণত উট, দুম্বা, ভেড়া, বকরি বা ছাগল, মহিষ, গরু ইত্যাদি কোরবানি দিয়ে থাকনে। তবে আদিকালে আমাদের দেশে কোরবানির জন্য ছাগল বেশি জনপ্রিয় ছিল, কেননা তখন গরু কোরবানি করা খুব একটা সহজ ব্যাপার ছিলনা। এর কারণ হিসেবে একটি তথ্যে দেখা যায়, ১০০-১৫০ বছর আগে বাংলাদশেে গরু কোরবানি দেয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। কোরবানি যদি কেউ দিতে চাইত তাহলে খাসি বা ছাগলই দিত। তৎকালীন বিখ্যাত সাহিত্যিক-রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ তার আত্মজীবনীতে সে সময় ঈদুল আযহা সর্ম্পকে র্বণনা দিয়েছেনে, ‘বকরা ঈদে কেউ গরু কোরবানি করিত না। সে আমলে পরাক্রমশালী জমিদারদের তরফ থেকে গরু কোরবানি কড়াকড়ভিাবে সর্বত্রই নিষিদ্ধ ছিল। শুধু বকরি কোরবানি করা চলত। মোগল যুগে বাংলাদেশে ঈদুল আযহা কিভাবে উদযাপন করা হতো তা জানা যায়নি। এমনকি উনিশ শতকের শুরুতে ঈদুল আযহার তেমন কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি।

আরকেটি গুরুত্বর্পূণ সত্য হলো, ১০০-১৫০ বছর আগে ঈদ মুসলমানদরে প্রধান উত্সব হসিবেে তমেনভাবে উদযাপতি না হওয়ার মূল কারণ ছলি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়া। এছাড়াও বত্তিহীদরে দরদ্র্যিতার কারণে মানুষরে স্বতঃর্স্ফূত আশা-আকাঙ্ক্ষার স্ফুরণ না ঘটা। এছাড়াও সকোলে বশিুদ্ধ ইসলাম সর্ম্পকে অজ্ঞ ছলি সাধারণ মানুষ। যদওি এ অবস্থার পরর্বিতন এনেছিল ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৫ খ্রি.)।

উনশি শতকরে গোড়ায় যখন রাজনতৈকিভাবে মুসলিম স্বাতন্ত্রবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তখন থকেইে গুরুত্ব পেয়েছে ঈদ। তবে খানকিটা জাঁকজমকরে সঙ্গে দুটি ঈদ উদযাপনের মধ্যে আছে বিত্তের সর্ম্পক। স্বাভাবকিভাবেই শহর, মফস্বলে ও গ্রামাঞ্চলে যারা ধনী, বিত্তবান তাদের ঈদ আর সাধারণ মানুষের ঈদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। ইসলাম প্রচারের শুরুতে র্অথাৎ আদিতে বাঙালি মুসলমানরা কিভাবে ঈদ উদযাপন করতেন তা জানা আজ অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। তবে এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়, অতীতে মুসলমানদরে ঈদুল ফিতর যেমন বাংলাদেশে বড় কোনো র্ধমীয় উৎসব হিসবে উদযাপতি হয়নি, তেমনি উদযাপতি হয়নি ঈদুল আযহাও। আজকে আমরা স্বতঃর্স্ফূতভাবে আনন্দ ও ধুমধামের সঙ্গে ঈদুল আযহা উদযাপন করি তা মাত্র ৬০-৭০ বছররে ঐতহ্যি।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুসলমানদের ন্যায় বাংলাদেশের মুসলমানেরাও যথাযথ ধর্মীয় ভাবাম্ভীর্য বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঈদুল আযহা পালন করে থাকেন। এ ঈদে স্রষ্টার উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি দেওয়া নিয়েও থাকে এক ধরনের বিশেষ ব্যস্ততা। এছাড়াও এ সময় ছোট থেকে বড় সবাই নতুন পোশাক পরে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশিদের বাড়িতে সাক্ষাৎ করতে যায় এবং কুশল বিনিময় করে।

ঈদের সময় প্রত্যেক বাড়িতেই সাধারণ খাবারের পাশাপাশি উন্নতমানের খাবার প্রস্তুত হয়। শুধু মুসলমান ই নয় অন্য ধর্মাবলম্বীরা বন্ধু-বান্ধবদেরও নিমন্ত্রিত হয়ে এ উৎসবে যোগ দিতে দেখা যায়। দেশের সকল স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সহ সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঈদ উপলক্ষে কয়েকদিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রবাসীদের অধিকাংশই নিজ নিজ গ্রামের বাড়ি গিয়ে আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ঈদ উদযাপন করে। বিভিন্ন মসজিদ-ময়দানে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রেডিও-টেলিভিশনগুলো সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে এবং পত্র-পত্রিকাসমূহ ঈদুল আযহার তাৎপর্য তুলে ধরে মূল্যবান বিশেষ নিবন্ধাদি প্রকাশ করে।

ঈদুল আযহার লক্ষ্য হচ্ছে সকলের সাথে সদ্ভাব, আন্তরিকতা এবং বিনয়-নম্র আচরণ করা। মুসলমানদের জীবনে এই সুযোগ সৃষ্টি হয় বছরে মাত্র দু’বার। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে পায়ে পা এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই রাকাত নামায আদায়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যায়। পরস্পরে কুশল বিনিময় করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং আন্তরিক মহানুভবতায় পরিপূর্ণ করে।

মূলত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে দৈন্য, হতাশা তা দূরীকরণের জন্য ঈদুল আযহার সৃষ্টি হয়েছে। যারা অসুখী এবং দরিদ্র তাদের জীবনে সুখের প্রলেপ দেওয়া এবং দারিদ্রের কষাঘাত দূর করা প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানদেরই কর্তব্য। সকলেরই সেসব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, ‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’। ঈদের পবিত্রতম মহিমায় ও ত্যাগের শিক্ষায় পরিশুদ্ধ হোক প্রতিটি প্রাণ।
ঈদ মুবারাক।