সোমবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৬:৩৬

তথ্যপ্রযুক্তির অলিম্পিয়াডে অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ [পর্ব-১]

Published : 2017-08-25 23:46:00
ফজলুস সাত্তার: প্রোগ্রামিংয়ের যুগ : বর্তমান যুগকে বলা হয় এরা অব ইনফরমেশন টেকনোলজি বা তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। আর তথ্যপ্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি বা প্রাণভোমরা হচ্ছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং। তাই অনেকে অবশ্য একে প্রোগ্রামিং এরা বা প্রোগ্রামিং যুগও বলে থাকে। এই যুগের জ্ঞান, প্রযুক্তি, আবিষ্কার, উদ্ভাবন, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিসেবা, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামরিক কমান্ড, গোয়েন্দা তত্পরতা, সমর কৌশল, সামাজিক যোগাযোগ, সম্পর্ক, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, গণমাধ্যম, শাসন পরিচালন সব কিছুরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং।
অর্থাত্ আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম ই-মেইল, তথ্য অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহূত সার্চ ইঞ্জিন, ভয়েস বা ভিডিও কনভারসেশন, অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ভার্চুয়াল এডুকেশন, ই-লাইব্রেরি, ই-বিজ্ঞাপন, অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া তো প্রোগ্রামিংয়েরই অবদান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, জৈবপ্রযুক্তি, চিকিত্সাসহ বিজ্ঞানের নানা গুরুত্বপূর্ণ শাখার গবেষণা, মিলিটারি ওয়ারফেয়ার, রাষ্ট্রীয়, আন্তঃরাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্যের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় কোষাগারসহ ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা ও সর্বাধুনিক শিল্প উত্পাদনের মতো বিষয়গুলো।
ব্যাটেল অব জিনিয়াস : অনূর্ধ্ব-২০ বছর বয়সের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা হল জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্স (আইওআই)। ১৯৮৯ সালে বুলগেরিয়ায় প্রাভেজে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় আইওআইয়ের, যা চলতি মাসে ২৯তম বছর পূর্ণ করল। এই প্রতিযোগিতাকে অবশ্য অনেকেই বিশ্বের সেরা জুনিয়র কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের লড়াই হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। সে কারণেই আইওআইয়ের ফলের দিকে নজর রাখে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ইউনিভার্সিটিগুলো।
আইওআই ২০১৭ : গত ২৮ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্সের (আইওআই) ২৯তম আসর। মোট ৮৪টি দেশের দল এবারের এই অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। গতবারের মতো এবারও প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নেয় স্কুলছাত্র রুহান হাবীব, সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান, তাসমীম রেজা ও কলেজছাত্র জুবায়ের রহমান নির্ঝর। বাংলাদেশের দলনেতা হিসেবে ছিলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ।
পদক সংখ্যায় শীর্ষ ১৭ : তেহরানে অনুষ্ঠিত এবারের আইওআইয়ে মাত্র ১৭টি দলের সব প্রতিযোগীই পদক পেয়েছে। বাংলাদেশ আইওআই টিম এই ১৭টির অন্যতম। এবারের আইওআইয়ে বাংলাদেশ দলের চার সদস্য রুহান হাবীব, সৈয়দ রুবাব রেদওয়ান, তাসমীম রেজা ও জুবায়ের রহমান নির্ঝর ব্রোঞ্জপদক পাওয়ার গৌরব অর্জন করে। বাংলাদেশ ছাড়াও যেসব দেশের চারজন করে প্রতিযোগী পদক পেয়েছে তা হল জাপান, চীন, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, ইরান, রাশিয়া, তাইওয়ান, চেক রিপাবলিক, যুক্তরাজ্য, বুলগেরিয়া, ইতালি, বেলারুশ, সুইডেন, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড ও সার্বিয়া। আর পদকের মান বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে থেকেও চারজনের কম প্রতিযোগী বিজয়ী হওয়ায় পদক সংখ্যায় বাংলাদেশ পেছনে ফেলে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন, হাঙ্গেরি, জার্মানি, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, ক্রোয়েশিয়া, হংকং, জর্জিয়া, ফ্রান্স, এস্তোনিয়া, ম্যাকাও, মলদোভা, ফিলিপাইন, সাইপ্রাস ও তুরস্কের মতো দেশকে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই সেরা : পদক সংখ্যা ও মানের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানই শীর্ষে। আমাদের বৃহত্ প্রতিবেশী ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে বছরে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়। গত অর্থবছরে শুধু সফটওয়্যার রফতানি থেকেই তাদের আয় ছিল ১০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ বছর তা ১২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এত বড় বিশাল তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও বিপুল প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় প্রতিযোগীরা এ বছরের আইওআইয়ে তিনটি ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে। অথচ মাত্র ১৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সফটওয়্যার রফতানিকারী বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা কোনো ধরনের প্রণোদনা ও উল্লেখযোগ্য সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই কৈশোরের উদ্দমতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছে চারটি ব্রোঞ্জপদক।
পেছন ফিরে দেখা : ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে আইওআইয়ের পথচলা শুরু হলেও কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের এই মর্যাদাপূর্ণ আসরে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার শুভ সূচনা ২০০৫ সাল থেকে। সিটি কলেজের ছাত্র আবিরুল ইসলামের ২০০৯ সালের রৌপপদক বাংলাদেশের প্রথম প্রাপ্তি। ২০১০ ও ২০১১ সালে পরপর দুই বছর শূন্য হাতে ফেরার পর ফের সাফল্য আসে ২০১২ সালে। ওই বছর ধনঞ্জয় বিশ্বাস ও বৃষ্টি শিকদার ব্রোঞ্জপদক পায়। ২০১৩ সালে ধনঞ্জয় পুনরায় ব্রোঞ্জপদক অর্জন করে। ২০১৩ সালের পর ফের দুই বছর পদকখরা। [চলবে]
লেখক : মানবাধিকার বিষয়ক গবেষক ও বাংলাদেশ আইওআই টিমের সদস্য রুহান হাবীবের বাবা। যোগাযোগ : fazloussatter@yahoo.com