শনিবার ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ভোর ০৫:৪২

নায়করাজ রাজ্জাকের প্রয়াণ: কাজের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন

Published : 2017-08-23 00:07:00
নায়করাজ রাজ্জাকের জীবনাবসান ঘটেছে (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। রাজ্জাক চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে তো বটেই; পরিচালক, প্রযোজক হিসেবেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিপুল অবদান রেখে গেছেন। তাঁর রোমান্টিক নায়কের ইমেজ ছিল পর্বতপ্রমাণ। এ ছাড়া বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সৃজনশীলতার স্বাক্ষরও রেখে গেছেন। রাজ্জাক-কবরী জুটি চলচ্চিত্র দর্শকদের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। বাংলা-উর্দু মিলিয়ে তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা শতাধিক।
চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে রাজ্জাক অতুলনীয়। তারপরও তাঁর জীবন-সংগ্রাম যেকোনো মানুষের জন্যই অনুপ্রেরণা। সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম, নিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষ যে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছতে পারে, নায়ক রাজ্জাক এর অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে আছেন। রুপালি পর্দার উজ্জ্বল নায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে তাঁকে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর রাজ্জাক কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। ভাগ্যান্বেষণের এই যাত্রাপথে তিনি ছিলেন মূলতই একজন উদ্বাস্তু। কী করবেন, কোথায় থাকবেন, কিছুই তাঁর জানা ছিল না। শুধু জেনে রেখেছিলেন, চলচ্চিত্রের অভিনেতা হিসেবেই তাঁকে প্রতিষ্ঠালাভ করতে হবে। কিন্তু মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই ইচ্ছা পূরণ করবেন কীভাবে! চলচ্চিত্রপাড়ায় ঘোরাঘুরির সুবাদে পরিচালকের সহকারী এবং কোনো কোনো চলচ্চিত্রে গুরুত্বহীন ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করা সুযোগ জুটেছিল। কিন্তু এতে কি আর তৃপ্তি মেলে! তিনি হাল ছাড়লেন না। এর মধ্যে ঘটনাচক্রে দেখা হল জহির রায়হানের সঙ্গে। তিনি তাঁর পরবর্তী ছবি হাজার বছর ধরেতে নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে নেওয়ার কথা বললেন। শেষ পর্যন্ত সেই ছবি আর হল না। কিন্তু জহির রায়হানের হাতেই রাজ্জাকের ভাগ্যের দরজা খুলে গেল। জহির রায়হান তার বেহুলা ছবিতে সুচন্দার বিপরীতে রাজ্জাককে নায়ক করলেন। সেই সময় বেহুলা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করল, রাজ্জাক হয়ে উঠলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নন্দিত অনিবার্য নায়ক। এরপর আর তাঁকে পেছনে তাকাতে হয়নি।
ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্র যখন একটা ঘূর্ণিপাকের মধ্যে আবির্ভূত হচ্ছিল, রাজ্জাকের আগমন বাংলা চলচ্চিত্রকে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। চলচ্চিত্রের বাঁক বদলের অনেক উল্লেখযোগ্য ছবিতেও রাজ্জাক অভিনয় করেছেন। বেহুলা, আনোয়ারা, ছুটির ঘণ্টা, অগ্নিশিখা, অশিক্ষিত ইত্যাদি ছবিতে রাজ্জাক তাঁর অভিনয় নৈপুণ্যের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। এ ছাড়াও সত্তর সালে জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া ছবিটি এদেশের মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক আকাঙ্ক্ষার এক দলিল হিসেবে চিহ্নিত হল। রাজ্জাকের রংবাজ বাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
চলচ্চিত্রের ভাষা সহজবোধ্য হওয়ায় এর সাফল্যও অনেক। রাজ্জাক তাঁর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং ব্যতিক্রমী অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে অগণিত দর্শকের মনে একটি ভালোবাসার আসন গড়তে পেরেছেন। এই শক্তিমান অভিনেতা তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।