রবিবার ২১ জানুয়ারি, ২০১৮, সন্ধ্যা ০৬:৩৭

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষের ভূমিকা

Published : 2017-08-23 00:06:00
নুরউদ্দিন আহসান: পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা শত সৃষ্টির মাঝে দুই শ্রেণির সৃষ্টিজীবকে বিবেকশক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যার মাধ্যমে তারা ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায় এবং অন্যায়কে পার্থক্য করতে পারে। যাদেরকে লিঙ্গান্তের ভাষায় দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। সমাজে যাদের নারী এবং পুরুষ নামে অবহিত করা হয়েছে। এই সৃষ্টিজীব একে অপরের জন্য সম্পূরক।
তবে পুরুষ জাতি নারীদের তুলনায় একটু শক্তিশালী। তার মানে এই নয় যে, তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। যখন ইচ্ছা অবলা নারীর ওপর হাত তুলতে পারবে। নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করতে পারবে। নারীর শক্তির বাইরে কোনো কাজ করার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করতে পারবে। যদি করা হয় তবে তা হবে অন্যায়ের শামিল। ক্ষমতার অপব্যবহার। যা ধর্ম বলি আর সামাজিক দৃষ্টিকোণ বলি যেটাই বলি না কেন, সকল ক্ষেত্রেই তা গর্হিত কাজ বলে গণ্য হবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বর্তমান সমাজে যা বিরাজমান আমরা কি এই পেশিশক্তি প্রয়োগ করা থেকে বিরত রয়েছি? আমরা কি নারীর প্রতি সদাচরণ করছি? পুরুষ জাতি যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেদের এই প্রশ্নগুলো করে তাহলে বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিবেক হল বড় আদালত। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনার বিশেষ এই আদালতে সত্যতা যাচাই করা যায়। কিন্তু আমরা যারা পুরুষ রয়েছি তারা কি নারীর ব্যাপারে স্রষ্টার দেওয়া বড় নিয়ামত বিবেকের আদালতে সম্পূর্ণ নির্দোষ নাকি অপরাধী?
নির্দোষ খুব কমই পাওয়া যাবে বলে মনে হয়। কারণ বর্তমান সমাজে নারী ও শিশুর প্রতি পুরুষদের যে হিংসাত্মক মনোভাব, নির্যাতন, ধর্ষণ, মানসিক নির্যাতন, পেশিশক্তি প্রয়োগ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে আমরা ঊর্ধ্বমুখী। কোথাও নিরাপদ নেই আমাদের এই নারীসমাজ? নিজের ঘর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে নারীরা আজ লাঞ্ছিত অপমানিত। কিছু পুরুষের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে অপমানের বোঝা বহন করে এই সভ্য সমাজে বসবাস করতে হচ্ছে। সকল জায়গায় নারীরা আজ অনিরাপত্তার চাদরে আবৃত। নিচের চিত্রটি যা সত্যতা প্রমাণ করে। গত ২০ মে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ নিরাপদ নগরী দিবস উপলক্ষে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে রাজধানীর ৫৬ শতাংশ নারী ভালো পরিবহনের ব্যবস্থা নেই বলে ঘরের বাইরে যেতে চান না। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পরিবহনে উঠতে পারেন না ৫৮ শতাংশ নারী। বাস সহকারী, চালক অথবা সহযোগীদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন ৫ শতাংশ নারী। অথচ সকল ক্ষেত্রে নারীদের নিরাপদ থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমরা যা করছি তা কোনো সময় কারও কাছে কাম্য নয়। আবার পারিবারিক ব্যবস্থাপনায় বিয়ের পর স্বামী হল নারীর কাছে সবচেয়ে আপনজন। যার কাছে মনের সকল দুঃখ-সুখের কথাগুলো অবলীলায় বলা যায়।
রাসুল (সা) বলেছেন, যদি মানুষের মাঝে সিজদাহ করার অনুমতি থাকত তাহলে আমি নারীদেরকে তার স্বামীদের প্রতি সিজদাহ করার অনুমতি করতাম। কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, সারাজীবনের জীবন সঙ্গিনীর কাছেও এই নারী জাতি নির্যাতিত, অবহেলিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের পরিমাণটা আমাদের বিবেকশক্তিকে বিশ্বাস করতে অপারগ করে তোলে। তবুও বাস্তবতাকে বিশ্বাস করতে হয়। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিসিএস) প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র যেখানে বলা হয়েছে। দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত হয়। ৬৫ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতন ভোগ করছে। ৩৬ শতাংশ বলেছে তারা যৌন নির্যাতনের শিকার। ৮২ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনের শিকার। অথচ পৃথিবীর সৌন্দর্য বর্ধনের মূল হাতিয়ার হল নারী। যাদেরকে আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছি। আমরা কি একটু চিন্তা করে দেখেছি যাদেরকে আমরা অত্যাচার করছি যাদেরকে নিজেদের পুরুষত্ব দেখানোর জন্য অমানুষিক নির্যাতন করছি, যাদের ওপর অযথা পেশিশক্তি প্রয়োগ করছি, যাদেরকে সমাজের ভোগ্য পণ্য হিসেবে মনে করে উপভোগ করছি, একদিন এই শ্রেণির প্রাণীর দয়ায় আমরা পৃথিবী নামক গ্রহের আলোর মুখ দেখেছি। তাদের ভালোবাসায় আমরা বড় হয়েছি। তাদের বিশেষ যত্নের কারণে আজ আমরা এই সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী হয়েছি।  
মনে রাখতে হবে যে শক্তি প্রয়োগ করে আমরা তাদের কষ্ট দিচ্ছি এই শক্তির মূল উত্স হল নারী জাতি। এই শক্তিশালী সুঠাম দেহ পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে দিতে অভুক্ত থাকতে হয়েছে এই নারী জাতিকে শত রাত। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে দিনের পর দিন। বিষয়গুলো আমাদের অজানা নয়। এত কিছু জানার পরও আমরা পুরুষ জাতি মায়ের জাতিকে নির্যাতন করতে ভুল করি না। একটু ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতে চাই না। ভুল কেন হল, প্রশ্নের বেড়াজালে আটকে রাখি। যেন আমরা মনে করি তাদের কোনো ভুল থাকতে নেই। কেন তারা ভুল করবে। আমাদের মনে রাখা উচিত কোনো মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। মানুষ মাত্রই ভুল হবে, এটাই স্বাভাবিক। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক ভুল হয়ে যায়। আমরা পুরুষ জাতি এই বাস্তব সত্যটাকে মানতে নারাজ। তাদের প্রতি দয়ার দৃষ্টি দেখানোটা যেন বর্তমান সমাজের পুরুষরা ভুলেই গেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মধ্যযুগে নারী নির্যাতনের তীব্রতাকেও হার মানিয়েছে। সমাজের বিবেকবান মানুষগুলোকে স্তব্ধ করেছে। প্রশ্ন জেগেছে আমরা কোন সমাজে বাস করছি। যেখানে সত্ বাবার কাছে মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়। ধর্ষণের বিচার চাইতে গেলে অপমানিত হতে হয়। সমাজের ঘৃণা থেকে বাঁচতে বাবা মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে আত্মহত্যা করতে হয়। হোটেলে নারীদের গণধর্ষণের শিকার হতে হয়। সভ্যতা আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
বগুড়ার বিষয়টা সকলের জানা। ক্ষমতার দাপটে শ্রমিকনেতা ভালো কলেজে ভর্তি করানোর প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ করে। বিষয়টা ধামাচাপা দিতে কিশোরী ও তার মাকে বাড়ি থেকে এনে পিটিয়ে আহত করে মাথা ন্যাড়া করে দেয়। কতটুকু বর্বর হলে মানুষগুলো এ রকম অমানুষিক কাজ করতে পারে। কতটুকু হীনম্মন্য হলে মানুষগুলো এমন কাজে লিপ্ত হতে পারে। আর এভাবে প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো জায়গায় ঘটে যাচ্ছে ধর্ষণ নামক লোমহর্ষক ঘটনা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে শুধু জুলাই মাসেই ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সংখ্যা ১৬৮। এর মধ্যে ধর্ষণ ৯৭টি, গণধর্ষণ ১৫টি, ধর্ষণের পর হত্যা ১৮টি। তথ্যে আরও বলা হয় দৈনিক গড়ে ৬টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।
কেন এমন বর্বরোচিত চিত্র প্রত্যক্ষ করছে এই বিংশ শতাব্দীর মানুষ? বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক অবক্ষয়, ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত, বিচারের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, সামাজিক ও প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা, পরিবার সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক শিক্ষার অভাব এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা। আবার কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই বলেই এই ধর্ষণ নামক মহামারী থেকে মুক্ত হতে পারছে না সমাজ। যদি সংবিধানের কার্যবিধি সঠিকভাবে কাজে লাগল যেত তাহলে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকত আমাদের এই সমাজ। কেননা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তাহলে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। একই ধারায় ৯ (২) এ বলা হয়েছে, ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। একই সঙ্গে জরিমানা। এত আইন থাকার পরও ক্ষমতার দাপট আর অর্থের কাছে ধর্ষকরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরের মামলায় সাজা ও খালাসের নথি থেকে গত ছয় মাসের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। নারী নির্যাতন মামলায় খালাস পায় ৯৫ শতাংশ আসামি। এছাড়া ধর্ষণ মামলায় পায় ৮৮ শতাংশ, যা সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার এটাও একটা বড় কারণ। যেখানে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে সেখানে ধর্ষকরা ধর্ষণ করাকে উপভোগ্য হিসেবে ধরে নিয়েছে। আইনের এই দুর্বলতা ধর্ষককে যেন আরও বেশি উত্সাহ দিচ্ছে।
সর্বোপরি কথা হল ধর্মীয় অনুশাসন না থাকার কারণেই আমাদের সমাজের অধঃপতন হয়েছে। শুধু ইসলাম নয়, সকল ধর্মেই ধর্ষণের মতো জঘন্যতম কাজকে বর্জনের কথা বলা হয়েছে। আসলে বিষয়টা একেবারেই ব্যক্তিগত যদি আমরা নিজ অবস্থান থেকে ধর্ষণকে সমাজের সর্বনিম্ন গর্হিত কাজ হিসেবে চিন্তা করি এবং যাদের সঙ্গে আমরা এই ঘৃণ্যতম কাজটা করছি সে জায়গায় যদি আমার মা-বোন থাকত তাহলে কী করতাম? বিষয়টা মনে নিতে পারতাম? বিবেকের কাছে এমন প্রশ্নগুলো রাখলে অব্যশ্যই এর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সঙ্গে সঙ্গে সরকারের এই বিষয়ে আইনের সঠিক প্রয়োগ দেখানোর মাধ্যমে সমাজকে কলুষমুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করি।
nuruddinahsaniu@gmail.com